আমি পান্থপথের একটি বিল্ডিং এর দিকে তাকিয়ে আছি। ঢাকা শহরের কিছু কিছু এলাকার নাম একেবারে মন থেকে ভাল লাগার মতোই সুন্দর। আমার প্রিয় নামগুলির মাঝে পান্থপথ একেবারে উপরের দিকে। কোন কারণে বিল্ডিংটা একই থাকলেও নাম টা বদলে গেছে। আমি যে সময়ের কথা বলছি, তখন নাম ছিলো সুন্দরম প্লাজা। এই সুন্দরম প্লাজায় ছিলো আমার অফিস।
সাল ২০০৫। আমি সুন্দরম প্লাজার উল্টোপাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছি। না টং এর দোকানের চা না। উষা বাসা থেকে আমার জন্য চা বানিয়ে এনেছে। উষা গাড়িতে বসে আছে। সমস্যা একটা না, দুইটা। প্রথমটা হলো উষা গাড়ি থেকে নামবে না আর দ্বিতীয়টা হলো আজ ভালোবাসি বলার কথা থাকলেও উষার নাকি আমার সামনে দম বন্ধ লাগছে। আমি চা খাচ্ছি আর উষার দম বন্ধ দূর করার জন্য প্রার্থনা চালিয়ে যাচ্ছি!
আমাকে অবাক করে দিয়ে উষা গাড়ি নিয়ে চলে গেলো। আমি ফোন দিলাম।
-হ্যালো!
-তোমার চা ভাল হয়েছে। রাখি।
-এইজন্য ফোন দিয়েছো?
-হুম।
উষা পড়তো বাংলাদেশ মেডিকেলে। তখন ফেসবুক ছিলোনা। ইয়াহু মেইল আর ইয়াহু মেসেঞ্জারেই কথা হতো। ইয়াহু মেইল আমাদের কাছে চিঠি লেখার মতোই জনপ্রিয় ছিলো। এই মেসেঞ্জারে চ্যাটিং থেকেই পরিচয় শুরু এরপর মোবাইল।
আমি তখন ছাত্র থেকে সদ্য চাকুরীজীবি হয়েছি। কিন্তু আমার সবকিছু ছাপিয়ে দিন দিন উষা একটি মায়াময় স্থান করে নিলো। ভালোবাসা না বলে মায়াময় বলার কারণ আছে। আমার বিষয়ে এতোবেশি কেয়ারিং ছিলো যে আমি তাকে মায়াময় বলতেই পছন্দ করতাম।
আমাদের দেখা হতোনা বললেই চলে। উষার ধারণা আমার সামনে সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। কি অদ্ভুত যুক্তি! এই অদ্ভুত যুক্তিদেয়া মেয়েটি একটি মহা সর্বনাশ করে ফেললো। ফাইনাল প্রফে ফেইল। মেডিকেল কলেজে প্রফে ফেইল করা মহা অন্যায়ের মধ্যেই পড়ে। উষার জীবনে ফেইল করার কোন রেকর্ড নেই।
মেয়ের এই সর্বনাশা রেজাল্ট ওর বাবা মা মেনেই নিতে পারছিলোনা। তারা কারণ খুঁজতে লাগলেন। এদিকে উষা আরও বেশি সিরিয়াস হয়ে গেলো। পড়াশোনায় না, আমার সাথে ফোনে কথা বলা বাড়িয়ে দিলো। আমার সাধ্য ছিলোনা তাকে বোঝানো।
একদিন সিরিয়াস হয়ে উষাকে বোঝাতে গেলাম। উষার কথা ছিলো একটাই। আমাকে ভালোবাসতে দাও! বেশিদিন তোমায় বিরক্ত করবো না! আমি এই কথার মানে কিছুদিন পরে বুঝলাম।
উষা ফাইনাল প্রফ পাস করলো। এর কিছুদিন পরেই ওর মা মারা গেলেন। মারা যাবার আগে বলে গেলেন একজন ডাক্তার ছেলেকে বিয়ে করিস।
বলা যায় আমাদের ভালোবাসার পথ সেখানেই থমকে গেলো। উষার বিয়ের জন্য ডাক্তার ছেলে খোঁজা শুরু হলো। এর কিছুদিন পর জানতে পারলাম ও ওমান চলে গিয়েছে।
সাল: ২০২৩।
স্কয়্যার হাসপাতালে আমার কিছু টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে নীচের ক্যাফেতে বসেছি কফি খেতে।
-এই! আরেকটা কফির অর্ডার দাও!
আমি কি বলবো বুঝতে পারছিনা! উষা আমার পাশের চেয়ারে বসলো। কি?
আমি কথা বলা ভুলে গিয়েছি! নীল শাড়িতে উষাকে চমৎকার লাগছে।
-উষা! তুমি তো আগের মতোই আছো!
উষা হেসে দিলো। তুমি আগে আমাকে ভাল করে দেখেছো? বাদ দাও। একাই কফি খাবে নাকি?
-দেশে কবে এসেছো?
-একমাস হয়ে গেলো। আগামীকাল চলে যাচ্ছি। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো উষা আমার পরের প্রশ্ন জানে।
-আমি এখানে আমার কলেজের এক ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে এসেছিলাম।
-ও!
-তোমার বর কই?
- ও দেশে আসেনি। আমার দুইটা মেয়েও আসেনি এক্সামের জন্য।
-তোমার বাবা কেমন আছে?
-বাবা বেঁচে নেই। আমি এই একমাস ছোট চাচার বাসায় ছিলাম। এই তোমার খবর কি?
-আমি আছি ভাল!
-আমি জানতাম তুমি সুখী হতে পারবেনা জীবনে। আমি লিখেছিলামও তোমার মেইলে! জানি তুমি পড়োনি!
আমি অবাক হয়ে উষার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। কোন মেইলে লিখেছো?
-তোমার ইমেইল এ! আজব!
-আমি তো ইউজই করিনা! তুমি চলে গেলে, এরপর এক বছর ইউজ করেছি। আর করিনি। ইভেন আমার পাসওয়ার্ডও মনে নেই!
-আমি জানি মাসুম! আমিও তোমার মেইল এর পাসওয়ার্ড জানতাম। তুমিই দিয়েছিলে মনে আছে?
-হুম!
আমি স্বযত্নে আমার সব কথা ওখানে লিখে রেখেছি। আমি যাই। তুমি পরে পড়ে নিও।
- পাসওয়ার্ড দিলেনা?
-না! তুমি কাল এয়ারপোর্টে এসো। তুমি এলে দিবো!
আমি এই মুহুর্তে পান্থপথেই দাঁড়িয়ে আছি। মনে পড়ছে আমার হারানো মায়াবতীর কথা।
উষা আমাকে পাসওয়ার্ড দেয়নি। কাল ভালোবাসার দিন। আমার মেসেঞ্জারে পাসওয়ার্ডটি আসার দিন। আমি চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে হাঁটতে লাগলাম।
0 Comments