উপন্যাস — পর্ব \"এগারো\"তুমি প্রথম তুমি শেষআফছানা খানম অথৈএর মাঝে কেটে গেল নিলয়ের কলেজজীবনের আরও কিছুটা সময়।আজ শুক্রবার। লতার জন্মদিন। আরিফ খান একজন মেডিকেল অফিসার। তার ওপর একমাত্র মেয়ের জন্মদিন—আয়োজন যে বেশ জাঁকজমকপূর্ণ হবে, তা বলাই বাহুল্য।এক এক করে আমন্ত্রিত অতিথিরা আসতে শুরু করেছে। আরিফ খান নিজে সবাইকে অভ্যর্থনা জানিয়ে গেস্ট রুমে নিয়ে যাচ্ছেন।কিছুক্ষণ পর নিলয়ও সেখানে এসে পৌঁছাল। হাতে একটি উপহার।আজ লতাকে অপূর্ব সুন্দর লাগছে। বড়লোকের একমাত্র মেয়ে, তার ওপর পার্লারের সাজ—সব মিলিয়ে যেন অন্যরকম এক লতা।নিলয়ের চোখ আটকে গেল তার ওপর। পলক পড়ছে না। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে মনে বলল—\"লতা, তুমি সত্যিই খুব সুন্দরী। তোমাকে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। যদি তোমাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতাম, তাহলে হয়তো অনেক সুখী হতাম।\"লতা তখন বান্ধবীদের নিয়ে ব্যস্ত। হঠাৎ নিলয়ের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই এগিয়ে এসে বলল—--- নিলয় ভাইয়া, আপনি কখন এলেন?--- এই তো, কিছুক্ষণ হলো।--- দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ভিতরে আসুন। এক্ষুনি অনুষ্ঠান শুরু হবে।নিলয় গেস্ট রুমে গিয়ে বসল।কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো জন্মদিনের অনুষ্ঠান।লতা কেক কাটতে কাটতে হাসিমুখে বলল—--- হ্যাপি বার্থডে টু ইউ!সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মা ও অতিথিরাও একসঙ্গে তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালেন।লতা প্রথমে বাবা-মাকে কেক খাওয়াল। তারপর তারাও মেয়েকে কেক খাইয়ে দিলেন।এরপর একে একে অতিথিদের কেক খাওয়ানো হলো।নিলয় ছিল লতার বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি। তাই তার জন্য ছিল আলাদা খাতির-যত্ন। খাওয়ানোর পর লতা তাকে নিজের বান্ধবীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল।লতার প্রিয় বান্ধবী শিলা নিলয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল—--- লতা, তোর বয়ফ্রেন্ডকে কিন্তু হেব্বি লাগছে! একেবারে কিউট!লতা একটু নার্ভাস হয়ে বলল—--- দূর ছাই! এসব কী বলছিস? ও আমার বয়ফ্রেন্ড না। আমার বাবার ছোটবেলার বন্ধুর ভাগ্নে। ডাক্তারি পড়ছে। মেডিকেল স্টুডেন্ট। হোস্টেলে থাকে।শিলা চোখ টিপে বলল—--- তার মানে এখনো প্রেমে পড়িসনি?--- না। এখনো এসব নিয়ে ভাবিনি।--- লতা, তুই যা-ই বলিস, নিলয় ছেলেটা কিন্তু খুব ভালো। দেখতে হ্যান্ডসামও। তোর পাশে বেশ মানাবে।কথাগুলো নিলয়ের কানে গেল।তার বুকের ভেতর কেমন যেন একটা ঢেউ উঠল।মনে মনে বলল—\"লতা, তোমাকে আমি আপন করে পেতে চাই। তুমি শুধু একবার তোমার সুকোমল হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দাও। আমি শক্ত করে ধরে রাখব। কখনো ছেড়ে দেব না। তুমি শুধু একবার হ্যাঁ বলো।\"নিলয় তখনও নিজের ভাবনার জগতে ডুবে আছে।এমন সময় লতা পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল—--- নিলয় ভাইয়া, আপনি এখনো দাঁড়িয়ে আছেন কেন?--- কেন?--- সবাই খেতে বসেছে। চলুন, আপনাকেও খেতে হবে।লতা তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল।বিশেষ অতিথির জন্য আলাদা যত্ন। বিরিয়ানি, রোস্ট, মাংস—টেবিল যেন নানা রকম খাবারে ভরা।খাওয়া শেষে নিলয় লতার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হোস্টেলে ফিরে গেল।হোস্টেলে ফিরতেই বন্ধুরা মজা শুরু করল।--- কী রে নিলয়, লতা ডার্লিংয়ের বার্থডে পার্টি কেমন হলো?নিলয় মৃদু হেসে বলল—--- অনেক ভালো।রতন সঙ্গে সঙ্গে বলল—--- বড়লোকের একমাত্র মেয়ের জন্মদিন ভালো হবে না, মন্দ হবে নাকি? তুই যদি লতার মন জয় করতে পারিস, তাহলে রাজকন্যা আর রাজত্ব—দুটোই একসঙ্গে পাবি!নিলয় একটু চুপ থেকে বলল—--- লতা কি আমাকে পছন্দ করবে?রতন হেসে বলল—--- অবশ্যই করবে। তা না হলে তোকে নিজের জন্মদিনে বিশেষভাবে ডাকত না। তোর শালা বরাত ভালো! এই প্রথম তোকে নিজের জন্মদিনে ইনভাইট করেছে।--- সত্যি বলছিস?--- হ্যাঁ, সত্যি। ধরে নে, তোদের প্রেম হয়ে গেল। এখন তোর কাজ হলো কারণে-অকারণে তার সঙ্গে দেখা করা, সুযোগ বুঝে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া। দেখবি, একদিন ঠিক তোর প্রেমে পড়ে যাবে।নিলয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—--- বন্ধু, তোর কথাটা যেন সত্যি হয়। কারণ এরই মধ্যে মেয়েটা আমার মনের সিংহাসন দখল করে ফেলেছে।গ্রামের পারুকে যেন এক মুহূর্তেই ভুলে গেল নিলয়।যে পারুর হাত ধরে সে সারাজীবন পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেই পারুই এখন তার কাছে অতীত।প্রেমের খাতায় পারুর নাম মুছে সেখানে লতার নাম লিখে ফেলেছে সে।হায়রে পুরুষের মন!যেখানে রাত, সেখানেই কাত!প্রতিশ্রুতি ভাঙতেও একটুও সময় লাগল না নিলয়ের।পারু এখন আর তার চোখে সুন্দরী নয়। লতাই যেন পৃথিবীর সেরা সুন্দরী।লতাকে কীভাবে নিজের করে পাওয়া যায়—সেই চিন্তাতেই মগ্ন হয়ে রইল সে।ভালোবাসার প্রস্তাব দেওয়ার অপেক্ষায় সারারাত ভাবতে ভাবতে কেটে গেল।পরদিন নিলয় হোস্টেল থেকে বের হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে বের হলো।এদিকে লতা ভার্সিটি থেকে বের হয়ে স্টেশনে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে।কাকতালীয়ভাবে নিলয়ও সেখানে উপস্থিত।দুজনের চোখে চোখ পড়তেই কুশল বিনিময় হলো।নিলয় বলল—--- লতা, গাড়ি আসতে হয়তো দেরি হবে। চলো, এর মধ্যে এক কাপ চা খেয়ে আসি।লতা আপত্তি করল না।দুজন কাছের একটি কেবিনে গিয়ে চা-নাশতা করল। তারপর লতা নিলয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল।এভাবেই ছোট ছোট দেখা, কথাবার্তা আর আড্ডার মধ্য দিয়ে দুজনের মধ্যে তৈরি হলো এক অদৃশ্য টান।লতা মনে মনে চাইত, নিলয় আগে তাকে প্রস্তাব দিক।অন্যদিকে নিলয় ভাবত, লতাই হয়তো আগে নিজের মনের কথা বলবে।দুজনের হৃদয়ে তখন প্রেমের ঢেউ।অবশেষে একদিন নিলয়ই সাহস করে ভালোবাসার প্রস্তাব দিয়ে ফেলল।লতা মনে মনে ভীষণ খুশি হলো।\"নিলয়, আমিতো এটাই চেয়েছিলাম। তোমার মুখ থেকেই প্রথম কথাটা শুনতে চেয়েছিলাম।\"নিলয় বলল—--- লতা, প্রথম দেখাতেই তোমাকে আমার ভালো লেগেছিল। কিন্তু আজ তোমাকে মনের কথাটা বলেই ফেললাম।লতা চুপ করে রইল।নিলয়ের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।\"সে কি আমাকে প্রত্যাখ্যান করবে? নাকি আমার হাতটা ধরবে?\"কয়েক মুহূর্ত পর নার্ভাস হয়ে বলল—--- লতা, কিছু বলছ না যে! আমাকে তোমার পছন্দ হয়নি?নিলয়ের কথায় লতার ভাবনার ঘোর কাটল।সে মৃদু হেসে বলল—--- না, মানে... ঠিক তা নয়। চলো, ফেরা যাক।নিলয় তার পথ আটকে বলল—--- তোমার মুখের জবাব না শুনে আমি যাব না।--- নিলয়, সব কথা মুখে বলতে হয় না। কিছু কথা বুঝেও নিতে হয়।--- তবুও তোমার মুখে একবার ‘হ্যাঁ’ শুনতে চাই।লতা লজ্জা পেয়ে বলল—--- কীভাবে বলব?নিলয় হেসে বলল—--- যেভাবে সিনেমার নায়ক-নায়িকারা বলে।লতা একটু হেসে বলল—--- ওকে... আই লাভ ইউ।নিলয়ের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।--- আই লাভ ইউ টু!অবশেষে তাদের ভালোবাসার সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো।দুজন দুজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে গেল।হোস্টেলে ফিরে নিলয় দরজা বন্ধ করতে যাবে, এমন সময় বাইরে থেকে কড় কড় শব্দ হলো।নিলয় দরজা খুলে দেখল, মধ্যবয়সী একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। কাঁধে ব্যাগ, চেহারায় ক্লান্তির ছাপ।লোকটি বলল—--- নিলয় নামের কেউ এখানে আছেন?--- জি, আমি নিলয়।লোকটি একটি চিঠি এগিয়ে দিয়ে বলল—--- আপনার চিঠি। এই নিন।চিঠিটা হাতে নিতে নিলয়ের হাত যেন হঠাৎ থেমে গেল।কোনোমতে চিঠিটা হাতে নিল।তারপর ধীরে ধীরে খুলে পড়তে শুরু করল।চিঠির প্রতিটি লাইনে ভালোবাসা।প্রতিটি শব্দে পারুর মায়া।কিন্তু সেই ভালোবাসায়ও নিলয়ের হৃদয় আর নরম হলো না।কারণ তার হৃদয়ের সিংহাসনে তখন লতা।পারু যেন সেখানে অবাঞ্ছিত এক নাম।চিঠিটা পড়তে পড়তে নিলয়ের ভেতরে অদ্ভুত এক অস্বস্তি তৈরি হলো। এত ভালোবাসায় ভরা চিঠি—তবুও কেন জানি আর পড়তে ভালো লাগল না।চিঠিটা পাশে রেখে শুয়ে পড়ল সে।কিছুক্ষণ পর রুমমেট রুপম দরজায় নক করল।নিলয় দরজা খুলে আবার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।রুপম বলল—--- দোস্ত, সকাল সকাল শুয়ে পড়লি যে! মন খারাপ?--- না রে, এমনি।--- তোর চেহারা দেখে তো তা মনে হচ্ছে না। রাজকন্যার কোনো দুঃসংবাদ?নিলয় একটু বিরক্ত হয়ে বলল—--- না, তেমন কিছু না। সে ভালো আছে।--- তাহলে মন খারাপ কেন?--- মন খারাপ না। মাথাটা ধরেছে। পড়তে ইচ্ছে করছে না, তাই শুয়ে পড়েছি। প্লিজ দোস্ত, নো ডিস্টার্ব।রুপম আর কথা বাড়াল না।চুপচাপ পড়ার টেবিলে গিয়ে বসে পড়ল।অন্যদিকে লতার মনটাও সেদিন অস্থির হয়ে ছিল।কেন জানি বারবার নিলয়ের কথা মনে পড়ছে।অবশেষে বাসার টেলিফোন থেকে হোস্টেলে ফোন করল সে।হোস্টেলের টেলিফোন রিসেপশনের দায়িত্বে থাকা অপারেটর টেবিলের ওপর মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিল। টেলিফোনের ক্রিং ক্রিং শব্দে কয়েকবার পর তার ঘুম ভাঙল।ঘুমঘুম চোখে রিসিভার তুলে বলল—--- হ্যালো, কে বলছেন?অপর প্রান্ত থেকে উত্তর এলো—--- আমি লতা বলছি।--- কাকে চান?--- ১২৩ নম্বর হোস্টেলের মেডিকেল স্টুডেন্ট নিলয় রহমানকে।--- ওকে ম্যাম, আপনি লাইনে থাকুন। আমি ডেকে দিচ্ছি।অপারেটর নিলয়কে ডেকে এনে রিসিভার হাতে দিল।নিলয় হ্যালো বলতেই লতা বলল—--- নিলয়, কেমন আছ?--- ভালো। তুমি?--- আমিও ভালো। কী করছ?--- এই তো, তোমার সঙ্গে কথা বলছি।--- দূর ছাই! এতক্ষণ কী করছিলে?নিলয় মুচকি হেসে বলল—--- কী আর করব? তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছিলাম।--- তাই নাকি? কী স্বপ্ন দেখছিলে?--- কবে তোমাকে লাল বেনারসি শাড়ি পরা বউ হিসেবে কাছে পাব। কবে তোমার সঙ্গে মজার মজার রোমান্স করব... আরও কত কী!লতা হেসে বলল—--- ও গড! পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই এত গভীর চিন্তাভাবনা শুরু করে দিয়েছ?--- হ্যাঁ জান।--- তা সাহেব, পড়াশোনা বাদ দিয়ে যদি শুধু স্বপ্নই দেখেন, তাহলে পরীক্ষায় কিন্তু ঘোড়ার ডিম পাবেন!নিলয় হেসে বলল—--- তাহলে তো আরও ভালো। ভেজে খাব দুজনে। প্রেম করার জন্য শরীরে শক্তি-সাহস আরও বেড়ে যাবে!--- ওকে, তোমাকে আর লেকচার দিতে হবে না। তোমরা পুরুষরা না, পারোও বটে!--- তার মানে তোমরা মেয়েরা বোকা?--- না, ঠিক তা নয়।নিলয় মজা করে বলল—--- সত্যি লতা, তুমি আমার কথা ভাবো না?লতা একটু বাড়িয়ে বলল—--- ভাবি না মানে? ভাবতে ভাবতে তো পেশেন্ট হয়ে গেছি!--- তাহলে তো ডাক্তার কল করতে হবে।--- অবশ্যই। তবে বাইরের ডাক্তারের প্রয়োজন নেই। আপাতত ডাক্তার নিলয় রহমান হলেই চলবে।--- আমি তো এখনো ডাক্তার হইনি!--- আমার আপাতত এমন ডাক্তার হলেই চলবে।--- তাহলে আমার কোনো আপত্তি নেই।লতা হেসে বলল—--- নিলয়, তোমার জন্য লাঞ্চের দাওয়াত রইল। সকাল সকাল আসবে কিন্তু।--- ওকে জান। ভালো থেকো। গুড নাইট।ফোন রেখে নিলয়ের মনটা যেন মুহূর্তেই বদলে গেল।কিছুক্ষণ আগের বিষণ্নতা উধাও।মনটা আবার ফুরফুরে হয়ে উঠল।লতার কণ্ঠস্বর যেন তার সমস্ত অস্বস্তি ধুয়ে মুছে দিয়েছে।পরদিন ক্লাস শেষ করেই নিলয় বেরিয়ে পড়ল।রুপম জিজ্ঞেস করল—--- দোস্ত, কোথায় যাচ্ছিস?--- লতাদের বাসায়।--- এই ভরদুপুরে?--- লাঞ্চের দাওয়াত আছে।রুপম মুচকি হেসে বলল—--- তা দোস্ত, প্রেম কতদূর এগোল?নিলয় হেসে বলল—--- মোটামুটি। সবেমাত্র ফার্স্ট পার্ট শেষ করলাম।--- চালিয়ে যা বন্ধু। আগে রাজকন্যার মন জয় কর। তারপর সবকিছু।নিলয় রুপমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রিকশায় উঠল।কয়েক মিনিটের মধ্যেই আরিফ খানের বাসার সামনে এসে পৌঁছাল।ভাড়া দিয়ে নেমে কলিংবেল চাপতেই লতা দরজা খুলে দিল।নিলয়কে দেখে বলল—--- নিলয়, এত দেরি করলে কেন?--- জেরা পরে করো। আগে বসতে দাও। তারপর খেতে দাও। খুব খিদে পেয়েছে।--- ওকে, চলো ভিতরে।ভিতরে ঢুকতেই ড্রয়িংরুমে আরিফ খানের সঙ্গে দেখা হলো।নিলয় বিনয়ের সঙ্গে সালাম দিল।আরিফ খান সালামের জবাব দিয়ে বললেন—--- নিলয়, তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে?--- ভালো, আঙ্কেল।--- হোস্টেলে কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো?--- জি না, আঙ্কেল।--- কোনো কিছু লুকাবে না কিন্তু। সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবে।--- জি, আচ্ছা আঙ্কেল।আরিফ খান লতার দিকে তাকিয়ে বললেন—--- লতা, নিলয়কে খেতে দাও।ডাইনিং টেবিলে খাবার পরিবেশন করা হলো।সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া শেষ করল।খাওয়ার পর আরিফ খান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন—--- নিলয়, আরমান আমার ছোটবেলার বন্ধু। শুধু বন্ধু বললে ভুল হবে, খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। একে অপরকে ছাড়া থাকতে পারতাম না। এক বাড়িতে ভালো রান্না হলে অন্য বাড়িতে খবর যেত। একে অপরকে ডেকে খাওয়াতাম। কত আড্ডা দিয়েছি একসঙ্গে!তিনি কিছুক্ষণ থামলেন।চোখে যেন পুরোনো দিনের স্মৃতি ভেসে উঠল।--- তোমার আম্মু রিতা আপুও খুব ভালো মানুষ ছিলেন। আমাদের খুব যত্ন করতেন। নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াতেন। উনার কথা মনে পড়লে এখনো চোখে পানি চলে আসে। তাই তোমার সব দায়িত্ব আমি নিলাম। টাকার প্রয়োজন হলে নিঃসংকোচে আমাকে বলবে।নিলয় মাথা নিচু করে বলল—--- জি না আঙ্কেল, টাকার কোনো সমস্যা নেই। মামা মাসে মাসে খরচের টাকা পাঠান।আরিফ খান মৃদু হেসে বললেন—--- আচ্ছা। আরেকটা কথা বলব। এটাকে আদেশ নয়, আমার উপদেশ মনে করবে।--- জি, বলুন আঙ্কেল।--- তোমার মা-বাবা নামাজি ও ভালো মানুষ ছিলেন। তুমি তাদের আদর্শে নিজেকে গড়ে তুলবে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, উত্তম চরিত্র, শিষ্টাচার, ভদ্রতা—এসব গুণ নিজের মধ্যে গড়ে তোলার চেষ্টা করবে।নিলয় মাথা নত করে বলল—--- জি আঙ্কেল। আপনার উপদেশ আমার শিরোধার্য।বিকেলে আরিফ খানের প্রাইভেট চেম্বারে বসার সময় হয়ে গেল।তিনি দ্রুত বেরিয়ে গেলেন।আর এই সুযোগে লতা নিলয়কে নিয়ে গাড়ি বের করল। লতা নিজেই গাড়ি চালাতে জানে, তাই ড্রাইভারকে ডাকতে হলো না।প্রথমে তারা মার্কেটে গেল।মুঠোফোন তখনো খুব বেশি মানুষের হাতে পৌঁছায়নি। লতার বাসায় টেলিফোন থাকায় এতদিন তার মোবাইলের প্রয়োজন হয়নি।কিন্তু প্রেমের ক্লাসে উঠতেই যেন মুঠোফোনের প্রয়োজন দেখা দিল।লতা একসঙ্গে দুটি সেট কিনল।তারপর দুজন চলে গেল পার্কে।একটি বেঞ্চে পাশাপাশি বসতেই নিলয়ের চোখে পড়ল দুটি মোবাইল।সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,--- লতা, দুটো সেট কার জন্য?লতা স্বাভাবিকভাবে বলল—--- একটা তোমার, একটা আমার।নিলয় অবাক হয়ে বলল—--- তুমি আমাকে সেট দেবে কেন? আমি মামাকে টাকা পাঠাতে বলেছি। টাকা পেলেই নিজে কিনব। তুমি এটা আন্টিকে দিয়ে দাও।লতা একটু অভিমান করে বলল—--- নিলয়, তুমি কি আমার পর?নিলয় মৃদু হেসে বলল—--- এখনো তো আপন হইনি।লতা মুচকি হেসে বলল—--- আপন হতে আর কত দেরি? আগে ডাক্তারি পাশ করো। তারপর বাপীকে আমাদের ভালোবাসার কথা বলব।নিলয় একটু চিন্তিত হয়ে বলল—--- উনি যদি রাজি না হন?লতা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল—--- অবশ্যই রাজি হবেন। দেখছ না, বাপী তোমার কতটা টেককেয়ার করেন?নিলয় ধীর গলায় বলল—--- সেটার কারণ অন্য কিছু হতে পারে।লতা অবাক হয়ে বলল—--- মানে?--- আঙ্কেল নিজের মুখেই তো আমার মায়ের যত্নের কথা বললেন। হয়তো সেই দায়বদ্ধতা আর ঋণ শোধ করার জন্যই আমার দায়িত্ব নিচ্ছেন।লতা নিলয়ের হাত চেপে ধরে বলল—--- এসব নিয়ে টেনশন করো না। এটা আমার রিয়েল আর ফার্স্ট লাভ। যেভাবেই হোক, আমি এই সম্পর্ক সফল করব। বাপী রাজি হোন আর না হোন।নিলয় অবাক হয়ে বলল—--- সত্যি জান?--- হ্যাঁ। আমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারো।কিছুক্ষণ পর লতা হঠাৎ বলল—--- জান, তুমি না বলেছিলে তোমার জ্বর?--- হ্যাঁ, বলেছিলাম। কিন্তু তুমি তো একবারও জানতে চাওনি।লতা মুচকি হেসে বলল—--- ওকে জান। এবার সরাসরি তোমার জ্বরের মাত্রা দেখব। একটু কাছে আসো।লতা কাছে ঘেঁষে বসতেই নিলয় তাকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল।এক মুহূর্তের আবেগে তাদের মুখ কাছাকাছি চলে এলো।লতার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল।সে নিলয়কে সরিয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে বলল—--- ওরে আমার দুষ্ট ডাক্তার! এই বুঝি জ্বর মাপা?নিলয় হেসে বলল—--- এতে দুষ্টুমির কী দেখলে? ভালোবাসার মধ্যে একটু রোমান্স না থাকলে ভালোবাসা জমবে কী করে?--- বেশ হয়েছে। আর লেকচার দিতে হবে না। চলো, ফেরা যাক।গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে নিলয় বলল—--- জান, যাওয়ার আগে আমার ভালোবাসা চাই।লতা অবাক হয়ে বলল—--- তোমার ভালোবাসা মানে?--- বুঝলে না?--- না তো।নিলয় দুই গাল দেখিয়ে ইশারা করে বলল—--- আমার কিস!লতা হেসে উঠল।--- তোমরা পুরুষরা না, অভিনয়ের বেলায়ও ফিট! কিন্তু আমি বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত এসব করতে পারব না। সাবধান!লতার কথায় নিলয়ের মুখ মুহূর্তেই থেমে গেল।দুজন গাড়িতে উঠে বসল।লতা নিলয়কে হোস্টেলে নামিয়ে দিয়ে নিজে বাসায় ফিরে গেল।কিন্তু নিলয় জানত না—তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলের শুরু হয়ে গেছে।একদিকে পারুর ভালোবাসায় ভরা চিঠি পড়ে আছে তার বিছানার পাশে।অন্যদিকে লতার ভালোবাসায় নতুন স্বপ্ন বুনছে সে।একজনকে কথা দিয়েছিল সারাজীবন ভালোবাসবে।অন্যজনকে দেখে সেই কথাই ভুলে গেল।চলবে...
0 Comments