উপন্যাস: পর্ব আট তুমি প্রথম তুমি শেষআফছানা খানম অথৈমামা আরমান মাস্টার ইজি চেয়ারে বসে পত্রিকা পড়ছিলেন। এমন সময় নিলয় এসে তার পাশে দাঁড়াল।নিলয়কে দেখেই আরমান মাস্টার পত্রিকা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—--- নিলয়, এতক্ষণ কোথায় ছিলে?--- মামা, আমার এক বন্ধুর বাসায় গিয়েছিলাম। তাই আসতে একটু দেরি হয়ে গেল। মামা, আমার ডাক্তারি পড়ার ব্যাপারে আপনি কি কথা বলেছিলেন?--- হ্যাঁ, বলেছি।--- উনি কী বললেন?--- উনি বলেছেন, তোমাকে পাঠিয়ে দিতে। আমার বন্ধু আরিফ খান একজন মেডিকেল অফিসার। সে তোমার ডাক্তারি পড়ার ব্যাপারে সব ব্যবস্থা করে দেবে। তোমার বিষয়ে যা বলার, আমি তাকে সবই বলে দিয়েছি। তুমি এখন সবকিছু গুছিয়ে রাখো। খুব ভোরে রওনা দিতে হবে।--- জি, আচ্ছা মামা।আরমান মাস্টার এবার স্ত্রীকে ডাকলেন—--- শিউলী, কোথায় গেলে? নিলয়কে খেতে দাও।রান্নাঘর থেকে শিউলী বললেন—--- এই তো, রান্নাঘরেই আছি। টেবিলে খাবার দিয়েছি। তোমরা খেতে এসো।মামা-ভাগ্নে একসঙ্গে বসে রাতের খাবার খেলেন। খাওয়া শেষ করে নিলয় নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিল। তারপর বিছানায় শুয়ে পড়ল।কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই পারুর মুখটা ভেসে উঠছে।পারুকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্টটা যেন বুকের ভেতর ভারী পাথরের মতো চেপে বসেছে। কল্পনার করিডোরে একের পর এক স্মৃতির দরজা খুলে যাচ্ছে। কখনো রূপালী দীঘির পাড়ে পারুর হাসিমাখা মুখ, কখনো তার অভিমানী চোখ, আবার কখনো বিদায়ের মুহূর্তের সেই কণ্ঠ—‘আমি অবশ্যই অপেক্ষা করব।’কিছুতেই প্রিয়তমার স্মৃতিগুলো মন থেকে সরাতে পারছে না নিলয়।এভাবেই কিছুক্ষণ বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে একসময় ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেল সে।পরদিন ভোর হতেই শিউলী নাস্তা তৈরি করে নিলয়কে ডাকলেন—--- নিলয়, টেবিলে নাস্তা দিয়েছি। তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও।--- এই তো মামি, আসছি।নিলয় দ্রুত নাস্তা শেষ করল। তারপর মামা-মামির কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য তাদের সামনে দাঁড়াল।দুজনকেই সালাম করল সে।আরমান মাস্টার ভাগ্নের মাথায় হাত রেখে বললেন—--- ভালোভাবে পড়াশোনা করো। মানুষের মতো মানুষ হও। আর মনে রেখো, জীবনে যত বড়ই হও না কেন, নিজের শিকড়কে কখনো ভুলে যেও না।শিউলীও চোখ মুছে বললেন—--- ভাগ্নে, আল্লাহ যেন তোমার মনের সব বাসনা পূর্ণ করেন। জীবনে অনেক বড় হও—এই দোয়া করি।--- আমার জন্য দোয়া করবেন, মামা। আপনাদের দোয়া নিয়েই আমি পথ চলতে চাই।মামা-মামির দোয়া সঙ্গে নিয়ে নিলয় বেরিয়ে পড়ল।আরমান মাস্টার তাকে স্টেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এলেন।নিলয় ট্রেনে উঠে জানালার পাশে বসে পড়ল।গাড়ি আপন গতিতে ছুটে চলল। জানালার বাইরে দ্রুত পেছনে ছুটে যাচ্ছে পরিচিত দৃশ্যগুলো। নিলয়ের চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে পারুর মুখ।মনে মনে সে বলল—‘পারু, আমি ফিরে আসব। তোমার কাছেই ফিরে আসব।’দীর্ঘ যাত্রার পর অবশেষে গাড়ি গন্তব্যে এসে থামল।নিলয় গাড়ি থেকে নেমে একটি রিকশায় উঠল। রাত তখন প্রায় দশটা।কিছুক্ষণ পর সে এসে পৌঁছাল আরিফ খানের বাসার সামনে।রিকশা থেকে নেমে কলিংবেলে চাপ দিতেই ভেতর থেকে ‘ক্রিং ক্রিং’ শব্দ ভেসে এল।ভেতর থেকে সালমা খান জিজ্ঞেস করলেন—--- লতা, দেখ তো, এত রাতে কে এসেছে? অসময়ে আবার কী ঝামেলা!--- এই তো মা, দেখছি।লতা দরজা খুলে দেখল, একজন তরুণ দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ব্যাগ। চেহারায় ক্লান্তির ছাপ, চোখেমুখে বিষণ্নতা।লতা কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—--- আপনি কে? ঠিক চিনতে পারলাম না।--- আমাকে চিনবেন না। আমি নিলয়। গ্রাম থেকে এসেছি।--- আপনি কাকে চান?--- আমি মেডিকেল অফিসার আরিফ খানের কাছে এসেছি। এটা কি উনার বাসা?--- জি, এটা উনারই বাসা। উনি ভেতরে আছেন। আপনি একটু দাঁড়ান, আমি বাবাকে খবর দিয়ে আসছি।লতা ভেতরে গিয়ে বাবাকে বলল—--- বাবা, গ্রাম থেকে নিলয় নামের এক ছেলে তোমার কাছে এসেছে।আরিফ খান সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন—--- কোথায় সে?--- বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছি।--- মা, লতা! তাড়াতাড়ি তাকে ভেতরে নিয়ে আয়।লতা অবাক হয়ে বলল—--- কিন্তু বাবা, অপরিচিত একটা লোককে এত রাতে বাসায় ঢোকাবে?আরিফ খান হেসে বললেন—--- ও অপরিচিত নয়। আমার ছোটবেলার বন্ধু আরমান রহমানের একমাত্র ভাগ্নে। ছেলেটা খুব মেধাবী। ডাক্তারি পড়বে। ওর পড়াশোনার ব্যাপারে আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। তাড়াতাড়ি তাকে ভেতরে নিয়ে আয়।--- এই তো বাবা, যাচ্ছি।লতা বাইরে গিয়ে নিলয়কে ভেতরে নিয়ে এল।আরিফ খান তখন টেলিভিশনে ইংরেজি সংবাদ দেখছিলেন। নিলয় কাছে গিয়ে সালাম করল।--- আসসালামু আলাইকুম, আংকেল।আরিফ খান সালামের জবাব দিয়ে আন্তরিকভাবে বললেন—--- ওয়ালাইকুম আসসালাম। নিলয়, আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো?--- জি না, আংকেল।--- তোমার মামা-মামি কেমন আছেন?--- জি, ভালো আছেন।আরিফ খান বললেন—--- তুমি আগে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। তারপর খাওয়া-দাওয়া করে বিশ্রাম নাও। অনেক দূরের পথ জার্নি করে এসেছ। সকালে তোমার সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলব।--- জি, আচ্ছা আংকেল।,ভোরে ঘুম থেকে উঠে নিলয় নাস্তা করল। নাস্তা শেষ করতেই আরিফ খান তাকে বললেন—--- নিলয়, তোমার মামা আরমান আমাকে ফোনে সবকিছু বলে দিয়েছেন। তোমার জন্য আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। আগামী সপ্তাহের শুরুতেই ভর্তি পরীক্ষা হবে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তুমি মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে থাকতে পারবে। তার আগ পর্যন্ত তুমি এখানেই থাকবে। আমি লতাকে সব বলে দিয়েছি। তোমার কোনো সমস্যা হবে না।--- জি, আংকেল। আপনার কাছে আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ।--- কৃতজ্ঞ হওয়ার কিছু নেই। মন দিয়ে পড়াশোনা করবে—এটাই চাই।যথাসময়ে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো।নিলয়ও কৃতিত্বের সঙ্গে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলো।ভর্তির আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর তার বুক থেকে যেন বিশাল এক বোঝা নেমে গেল। অবশেষে স্বপ্নের পথে তার যাত্রা শুরু হলো।কিছুদিন পর নিলয় মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে উঠল। সেখানে তার পরিচয় হলো রূপম নামের এক সহপাঠীর সঙ্গে। অল্প সময়ের মধ্যেই দুজনের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠল।ব্যস্ততার দিনগুলো আপাতত শেষ। নতুন পরিবেশ, নতুন বন্ধু আর নতুন জীবনের সঙ্গে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিচ্ছে নিলয়।কিন্তু ব্যস্ততা কমতেই আবার মনে পড়ে গেল সেই একজনের কথা।পারু।হঠাৎ বুকের ভেতরটা কেমন শূন্য হয়ে গেল।টেবিলে বসে নিলয় কলম হাতে নিল।আজ অনেক কথা জমে আছে। মুখে বলা সম্ভব নয়। তাই কাগজের পাতায় লিখেই মনের কথাগুলো জানাবে প্রিয়তমাকে।পারুর কাছে নিলয়ের প্রথম চিঠিওগো আমার হৃদয়ের রানী, স্বর্গের অপ্সরা, প্রাণ পিয়াসী পারু,শরতের শেষ লগ্নে হেমন্তের আগমনী বার্তায় তোমাকে জানাই আমার হৃদয়ের মণিকোঠা থেকে উৎসারিত গভীর ভালোবাসা, প্রেম-প্রীতি আর টিউলিপ ফুলের সৌরভমাখা শুভেচ্ছা।যাক, পারু। তোমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি নিরাপদে ঢাকায় পৌঁছেছি। এই কয়েকটা দিন ভর্তি পরীক্ষার ব্যস্ততায় কেটে গেছে। আজ সেই ব্যস্ততা থেকে কিছুটা মুক্তি পেয়েছি। তাই কাগজের পাতায় কলমের আঁচড়ে তোমার কাছে মনের কিছু কথা ব্যক্ত করতে বসলাম।জান, আল্লাহর মর্জি ছিল বলেই হয়তো আমি মেডিকেলে চান্স পেয়েছি। এখন হোস্টেলে থাকি। এখানে রূপম নামের একজন সহপাঠীর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে। দুজন একসঙ্গে থাকি, গল্প করি, পড়াশোনা করি।কিন্তু জানো, সবকিছুর মাঝেও কোথায় যেন একটা শূন্যতা অনুভব করি।কারণ তুমি নেই।তোমাকে ছেড়ে আসার পর থেকেই আমার সব শান্তি যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। এখনো ঠিকভাবে পড়াশোনায় মন বসাতে পারিনি। বারবার তোমার স্মৃতি আমার মানসপটে ভেসে ওঠে।কারণ তুমি যে আমার হৃদয়ের গহিনে বাসা বেঁধেছ।তাই যতবার চোখ বন্ধ করি, ততবার তোমার প্রতিচ্ছবি চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। তোমার কাছ থেকে এত দূরে এসে বুঝতে পারছি, তুমি আমার কাছে ঠিক কতটা মূল্যবান।তুমি আমার ধ্যান, তুমি আমার জ্ঞান। তুমি আমার ভাবনার প্রতিটি অধ্যায়ের একমাত্র চরিত্র।জান, সেদিন আমার এক সহপাঠী তার প্রিয়াকে নিয়ে গোধূলির বিদায়লগ্নে আনন্দে মেতে উঠেছিল। তাদের পাশাপাশি দেখে আমার ভেতরটা কেমন যেন হয়ে গেল। নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলাম না।তখন শুধু মনে হচ্ছিল, ইশ! তোমাকে যদি কাছে পেতাম!কিন্তু মন চাইলেই তো সবকিছু পাওয়া যায় না। সৃষ্টিকর্তা আমাদের দুজনকে যে দুপ্রান্তে রেখেছেন!কবে আবার তোমার দর্শন পাব, তা একমাত্র খোদাই জানেন।তুমি মন দিয়ে লেখাপড়া করো। এইচএসসি পাস করার পর তোমাকে আমার কাছাকাছি নিয়ে আসব।ইনশাআল্লাহ।জান, আজ পড়ার টেবিলে বসে বইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎ জানালার বাইরে ব্যস্ত টুনটুনির নাচন চোখে পড়ল। অদ্ভুতভাবে তখন তোমাকে কাছে পাওয়ার ব্যাকুলতা আরও বেড়ে গেল।ইচ্ছে করছিল সবকিছু ফেলে তোমার কাছে ছুটে যাই।কিন্তু পারলাম না।কারণ তুমি যে অনেক অনেক দূরে!আর পড়তে ইচ্ছে করল না। বই বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম। তারপর তোমার ছবিটা হাতে নিয়ে কতক্ষণ যে তাকিয়ে ছিলাম, নিজেই জানি না।পারু, জীবনে যদি কোনো নারীকে সামান্যতম ভালোবেসে থাকি, সে তুমি।আর তোমাকে ভালোবাসব না কেন?খোদা যেন নিজ হাতে তোমাকে গড়েছেন। সমস্ত সৌন্দর্যের ডালি যেন তোমার তনুতে সাজিয়ে দিয়েছেন।আমার কিছুই ভালো লাগছে না।শুধু তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে।পুজোর ছুটিতে বাড়ি আসব। তুমি সেই অপেক্ষায় থেকো।আর বেশি কিছু লিখে তোমাকে বিরক্ত করতে চাই না। তবে একটা অনুরোধ আছে—চিঠি পাওয়ামাত্রই উত্তর দেবে। তোমার উত্তর না পেলে যে এই পাগলটা আরও অস্থির হয়ে যাবে!তুমি কি সত্যিই আমার জন্য অপেক্ষা করবে, নাকি একদিন অন্য কারও বউ হয়ে যাবে?কখনো কখনো এই ভয়টা আমাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়। তোমাকে হারানোর ভয়টা যেন কিছুতেই দূর করতে পারি না।আর বিশেষ কী লিখব?আমি ভালো নেই।তোমার কোমল হাতে লেখা একটি আবেগমাখা পত্রই হবে আমার ভালো থাকার সবচেয়ে বড় কারণ।সবশেষে তোমার সুন্দর ভবিষ্যৎ, সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।ভালো থেকো, আমার ভালোবাসা হয়ে থেকো।খোদা হাফেজ।ইতি তোমারই প্রেম পিয়াসী হৃদয়ের রাজানিলয় রহমানচিঠিটা ভাঁজ করে খামে ভরল নিলয়।পরদিন সকালে সেটি পোস্ট করে আবার হোস্টেলে ফিরে এল।চিঠিটা এখন ছুটে চলেছে দূর গ্রামের এক অজপাড়া বাড়ির দিকে—পারুর কাছে।কিন্তু পারু কি সেই চিঠি পাবে?আর চিঠির প্রতিটি শব্দ পড়ে তার হৃদয়ে কী ঝড় উঠবে?নিলয় জানে না।শুধু জানে, দূরত্ব যতই হোক—তার হৃদয়ের ঠিকানায় একমাত্র নামটি লেখা আছে—পারু।চলবে...
0 Comments