উপন্যাস: পর্ব সাত তুমি প্রথম তুমি শেষআফছানা খানম অথৈরাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে নিলয়কে নিয়ে ভাবতে শুরু করল পারু। নিলয়ের আবেগমাখা কথাগুলো কিছুতেই তাকে ঘুমাতে দিচ্ছে না। বারবার সেই কথাগুলো স্মৃতির পর্দায় ভেসে উঠছে। মনের অজান্তেই সেসব কথা রোমন্থন করতে করতে কখনো এপাশ, কখনো ওপাশ ফিরছে সে।এভাবেই প্রায় নির্ঘুম একটি রাত কাটল পারুর।ভোরে পিউ ডাকা পাপিয়ার মধুর কণ্ঠে তার ঘুম ভাঙল। নতুন দিনের সূচনা হলো।যথারীতি কলেজের ক্লাস শেষ করে বাড়ি ফিরল পারু। কিন্তু আজ তার মনে অন্যরকম এক অস্থিরতা। নিলয়ের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করতে হবে। এরপর নিলয় চলে যাবে ঢাকায়।পারু তৈরি হতে দেখে মা জিজ্ঞেস করলেন—--- পারু, তুই কি কোথাও যাচ্ছিস?--- জি, মা।--- কোথায় যাচ্ছিস?--- মা, মুক্তাদের বাড়ি যাব।--- কেন? কী প্রয়োজন?--- ওর কাছে আমার একটা বই আছে। বইটার জন্য স্যার আমাকে শাস্তি দিয়েছেন। তাছাড়া সামনে ফাইনাল পরীক্ষা। ভালোভাবে পড়াশোনা করতে হবে। না হলে ভালো ফলাফল করা সম্ভব হবে না।বইয়ের কথা শুনে মা আর নিষেধ করলেন না। তবে মেয়েকে কিছুটা সতর্ক করে বললেন—--- পারু, বই আনতে যাবি ভালো কথা। তবে চলাফেরায় সাবধান থাকিস। আজকাল বখাটে ছেলেদের উপদ্রব যে হারে বেড়েছে, তাতে মেয়েদের একা পথ চলাটাই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বলছি, সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরবি।--- জি, মা। সময়মতোই ফিরে আসব।মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পারু বেরিয়ে পড়ল। তবে মুক্তাদের বাড়ির পথে না গিয়ে সরাসরি চলে গেল রূপালী দীঘির পাড়ে।নিলয় অবশ্য তার আগেই সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছে।পারু চুপিচুপি নিলয়ের পেছনে গিয়ে তার চোখ দুহাত দিয়ে চেপে ধরল।নিলয় মুচকি হেসে বলল—--- ওহ! লাগছে তো! ছাড়ো।--- আগে বলো, কে?--- আমার জান, হৃদয়ের রানী, স্বর্গের অপ্সরা পারু। এবার বলুন ম্যাম, উত্তর সঠিক হয়েছে কি না?পারু চোখ ছেড়ে দিয়ে হেসে বলল—--- ওকে, থ্যাংকস। রাইট, সাহেব।নিলয় আর দেরি করল না। পারুকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে তার চোখে চোখ রাখল।--- জান, এই বুঝি তোমার আসার সময় হলো? আমি সেই কখন থেকে এসে বসে আছি। আর তুমি কিনা বেলা শেষ করে এলে! এত দেরি করলে কেন?পারু একটু অস্থির হয়ে বলল—--- নিলয়, এসবের জবাব দেওয়ার সময় এখন নেই। তুমি কী বলবে, তাড়াতাড়ি বলো। আমি শুনে চলে যাব। তা না হলে বিপদ হতে পারে।নিলয় চমকে উঠল।--- পারু, কী বলছ তুমি? বিপদ? কিসের বিপদ?--- প্লিজ নিলয়, এখন এসব থাক।--- থাকবে কেন? কী হয়েছে, খুলে বলো।পারু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—--- আচ্ছা, বলছি। শোনো, মাতব্বর চাচার ছেলে হারুন ভাইকে তো তুমি চেন?--- হ্যাঁ, চিনি। কিন্তু কী হয়েছে?--- এখনো কিছু হয়নি। তবে হতে পারে।--- মানে?--- হারুন ভাই ভালো মানুষ নয়। তার স্বভাব খুব খারাপ। মেয়েদের নিয়ে তার কুৎসিত কর্মকাণ্ডের কথা তো এলাকায় সবাই জানে। আমি আসার সময় তাকে দেখেছি। সে যেভাবে বাঁকা চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছিল, তাতে ভয়ে আমার শরীর কাঁপছিল। কী বিচ্ছিরি একটা দৃষ্টি!একটু থেমে পারু বলল—--- তাই বলছি, সন্ধ্যার আগেই আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে। না হলে বিপদ হতে পারে।নিলয় এবার গম্ভীর হয়ে গেল।--- ঠিক আছে, জান। আর এসব নিয়ে ভয় পেয়ো না। বিপদ-আপদে ধৈর্য ধরতে হয়। কারণ আল্লাহ ধৈর্যশীলদের পছন্দ করেন এবং বিপদে তাদের সাহায্য করেন। তুমি খুব সাবধানে চলাফেরা করবে। আর হারুন ভাইয়ের চোখে পড়া থেকে যতটা সম্ভব নিজেকে আড়াল করে রাখবে।পারু এবার সরাসরি বলল—--- নিলয়, এবার তোমার জরুরি কথাগুলো বলো।নিলয় কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল—--- পারু, তুমি জানো, তবুও বলছি। আমি কাল ঢাকায় চলে যাচ্ছি।কথাটা শুনে পারুর বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন করে উঠল।নিলয় বলল—--- তোমাকে ছেড়ে থাকতে আমারও কষ্ট হবে। তবুও আমাকে যেতে হবে। কারণ স্বাবলম্বী না হয়ে বিয়ে করলে একজন স্বামীর নিজের স্ত্রীর কাছে মূল্যায়ন থাকে না। বরং সংসারজীবনে তখন নানা ধরনের বাড়তি ঝামেলা তৈরি হয়। নিজের জীবনটাও অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আমি সেই ভুল করতে চাই না।--- তাহলে?--- আমি আগে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। তারপর তোমাকে বিয়ে করব।পারু অবাক হয়ে বলল—--- মানে?নিলয় মৃদু হেসে বলল—--- মানে হলো, আমি ডাক্তার হয়ে তোমার সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হব। এর আগে নয়। এবার বলো, তোমার কোনো আপত্তি আছে?পারু হেসে বলল—--- গুড আইডিয়া। আমিও তোমার সঙ্গে একমত। তবে আরেকটা কথা আছে।--- কী কথা? থামলে কেন? বলো।পারু একটু অভিমানী সুরে বলল—--- অজপাড়া গ্রামের পারু নামের মেয়েটির কথা শেষ পর্যন্ত তোমার হৃদয়ের ডায়েরিতে স্মরণ থাকবে কি না, সেটাই তো চিন্তার বিষয়।নিলয় হেসে উঠল।--- পারু, তুমি যে কী! শুধু অবিশ্বাস আর অবিশ্বাস! জীবনে যদি কোনো নারীকে সামান্যতম ভালোবেসে থাকি, সে তুমি। আর তোমাকে ভুলবই বা কেন? খোদা যেন তোমার বদনে সব সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে দিয়েছেন।কিছুক্ষণ থেমে নিলয় বলল—--- পারু, তুমি কি আমার জন্য অপেক্ষা করবে? নাকি বধূবেশে অন্য পুরুষের ঘরে চলে যাবে?পারু মুচকি হেসে বলল—--- আমি ঠিক ঠিক তোমার জন্য অপেক্ষা করব। তবে সন্দেহ হচ্ছে তোমাকে নিয়ে।--- জান, আবার আমাকে নিয়ে সন্দেহ? কারণটা কী?--- কারণ অনেক। তবে সংক্ষেপে কয়েকটি জরুরি কথা বলছি।পারু একটু নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—--- কবি-সাহিত্যিকেরা গানের সুরে বলেছেন—পুরুষ লোকের মনের কী বাসনা,আমার মায়ের মাও তা জানে না।--- আর আমি তো সামান্য একটা ফুচকি মেয়ে। আমি এত কিছু বুঝব কী করে?নিলয় হেসে বলল—--- আচ্ছা, শুরু হয়েছে তোমার লেকচার!পারু থামল না।--- বাস্তবে তো প্রায়ই দেখি, মেয়ে মানুষ দেখলেই পুরুষেরা উতলা হয়ে যায়। কখনো তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে, কখনো মিষ্টি কণ্ঠে প্রেমের গান শোনায়। আবার সুযোগ বুঝে নিজের স্বার্থেও ব্যবহার করে। এটাই তো তোমাদের মতো পুরুষ মানুষের স্বভাবের প্রধান বৈশিষ্ট্য।নিলয় মজা করে বলল—--- পারু, লেকচার শেষ হয়েছে?--- জি না, সাহেব। এখনো শেষ হয়নি।--- ও জান! বলে কী! তো বলো, আর কী আছে?পারু এবার ধীরে ধীরে বলল—--- একটা প্রবাদ আছে না? কেউ যখন সামনে থাকে, তখন সে মনের মাঝেও থাকে। কিন্তু যখন সামনে থেকে দূরে চলে যায়, তখন ধীরে ধীরে মন থেকেও মুছে যায়।একটু থেমে বলল—--- এখন মোদ্দা কথা হলো, পারু নামের মেয়েটিকে নিলয় নামের পুরুষ কখন ভুলে বসে থাকবে, তা কে জানে?নিলয় চুপ করে শুনছিল।পারু আবার বলল—--- শহরে তো সুন্দরী মেয়ের অভাব নেই। তাদের দেখলে হয়তো পারু নামের মেয়েটির কথা তোমার মনেই থাকবে না। মেডিকেল কলেজে তোমার সঙ্গে কত মেয়ের দেখা হবে। হয়তো তোমার কোনো সহকর্মী কিংবা অন্য কোনো সুন্দরী নারী তখন তোমার সঙ্গী হবে। তখন তুমি আমাকে ভুলে যাবে। ভুলে যাবে আমাদের এই পবিত্র প্রেমকে।পারুর কণ্ঠ ভারী হয়ে এল।--- শৈশবের এই মধুময় স্মৃতিগুলো একদিন তোমার কাছে বিস্মৃতি হয়ে দাঁড়াবে। তখন হয়তো মনে হবে, পারু নামের কোনো মেয়ের সঙ্গে আদৌ তোমার পরিচয় ছিল না। বলো, ঠিক বলিনি?নিলয় এবার পারুর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল—--- জান, তুমি একদমই ঠিক বলোনি। শহরে অনেক সুন্দরী মেয়ে আছে, সেটা সত্যি। কিন্তু তাই বলে ভালোবাসার মানুষকে ভুলে যাব—এমন প্রশ্নই ওঠে না।--- কারণ আমি তোমাকে আমার জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি।নিলয়ের চোখে তখন গভীর আবেগ।--- তুমি যখন আমার পাশে বসো, তখন এক অনির্বচনীয় আনন্দ দোলা দেয় আমার হৃদয়াকাশে। মুহূর্তের জন্য আমি পাগল হয়ে উঠি। তোমাকে একান্ত আপন করে পাওয়ার ব্যাকুলতা অনুভব করি।নিলয় দৃঢ় কণ্ঠে বলল—--- তুমি দেখো, আমি প্রতিষ্ঠিত হয়ে ঠিক তোমার কাছেই ফিরে আসব। শহরের এমন কোনো মেয়ে নেই, যে আমাকে তোমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে। তুমি কোনো চিন্তা করো না। আর সব পুরুষকে এক চোখে দেখো না। এই তোমার গা ছুঁয়ে বলছি।পারু মুচকি হেসে বলল—--- তাহলে কি বিশ্বাস করব?নিলয় বলল—--- এবার বিশ্বাস হলো তো?--- বিশ্বাস-অবিশ্বাস বুঝি না। সময়ই বলে দেবে কার ভালোবাসা কতটা খাঁটি।নিলয় শান্ত কণ্ঠে বলল—--- ঠিক আছে। সময়মতো সবকিছুই প্রমাণ হবে। তবে তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে।--- ওকে। আমি অবশ্যই অপেক্ষা করব।তাদের প্রেমের গল্প আর কথোপকথনের মাঝে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে, তারা টেরই পায়নি।সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ডুবু ডুবু করছে।পারু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল—--- বাড়ি ফিরব কখন?নিলয় মৃদু হেসে বলল—--- জান, বাড়ি তো যাবে। তবে আরেকটু কাছে আসো। তোমাকে ভালো করে দেখি।পারু একটু ইতস্তত করে নিলয়ের কাছে গিয়ে বসল।হঠাৎ নিলয় তাকে কাছে টেনে নিল। আবেগের বশে তার গালে আলতো করে চুমু এঁকে দিল।নিলয়ের স্পর্শে পারুর শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। মুহূর্তের জন্য দুজনেই ভুলে গেল লোকনিন্দা, সমাজের ভয় আর চারপাশের পৃথিবী।কিন্তু পরক্ষণেই পারু চমকে উঠে নিজেকে সরিয়ে নিল।--- নিলয়! তুমি ভারী দুষ্ট হয়েছ! সুযোগ পেলেই রোমান্স!--- ছাড় বলছি।নিলয় হেসে বলল—--- কী করব জান? পাগল মন যে প্রবোধ মানছে না। তাছাড়া তোমার গালে আমার ভালোবাসার একটা চিহ্ন এঁকে দিয়ে গেলাম। এটা তোমাকে প্রতি মুহূর্তে আমার কথা মনে করিয়ে দেবে।পারু মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।--- ওকে, প্রেম সম্পর্কে তোমার অনেক লেকচার শোনা হয়েছে। এবার আর কোনো লেকচার নয়। চলো, এবার ফেরা যাক।দুজনেই উঠে দাঁড়াল।বিদায়ের মুহূর্তটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল।নিলয় ধীর কণ্ঠে বলল—--- জান, শেষ বিদায়বেলায় আমার জন্য দোয়া করবে না?পারুর চোখ ছলছল করে উঠল।--- অবশ্যই করব। আমার দোয়া সবসময় তোমার সঙ্গে থাকবে। আল্লাহ তোমার সব মনোবাসনা পূর্ণ করুন, তোমাকে কামিয়াব করুন। আমিন।নিলয় মৃদু হেসে বলল—--- খোদা হাফেজ।পারু চোখ নামিয়ে বলল—--- বিদায়।দুজন দুদিকে হাঁটতে শুরু করল।কিন্তু কেউই জানত না, এই বিদায় কি সত্যিই কেবল কিছুদিনের জন্য—নাকি তাদের জীবনে অপেক্ষা করছে আরও বড় কোনো বিচ্ছেদ?চলবে...
0 Comments