উপন্যাস পর্ব “পাঁচ” তুমি প্রথম তুমি শেষআফছানা খানম অথৈপারুর বাবার নাম করিম মিয়া। রসুলপুর ইউনিয়নের পূর্বপুরুষের ভিটেবাড়িতেই তার বসবাস। ভিটেবাড়ি ছাড়া সামান্য কিছু চাষযোগ্য জমিজমা আছে তার। এর পাশাপাশি অন্যের কিছু জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন। এভাবেই কোনোমতে চলে তার সংসার।রসুলপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষের পেশাই কৃষিকাজ। তাদের বেশির ভাগই বর্গাচাষি। করিম মিয়া, তোরাব আলী, খালেক ব্যাপারী, ফয়েজ মিয়াসহ আরও অনেকেই বর্গাচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।কিন্তু কৃষিকাজের পাশাপাশি সমাজে আরও একটি ব্যবসা বেশ জমজমাট—চড়া সুদের ব্যবসা।এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ইউনিয়নের মাতব্বর। তার কড়া সুদের শিকার হচ্ছে সমাজের সহজ-সরল কৃষক, দিনমজুর, গরিব-দুঃখী আর নিরীহ মানুষগুলো।কৃষকেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ফসল ফলায়। তাদের একটাই স্বপ্ন—ফসল ঘরে উঠবে, তিনবেলা পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেবে, একটু সুখ-শান্তিতে দিন কাটাবে।কিন্তু সেই স্বপ্ন বারবার দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।ফসল ফলানোর সময় প্রয়োজন হয় টাকা। অথচ তখন কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায় না। বাধ্য হয়ে মাতব্বরের কাছ থেকে চড়া সুদে ধার নিতে হয়। সময়ের সঙ্গে সুদের বোঝা বাড়তে বাড়তে একসময় মূল টাকার চেয়েও কয়েকগুণ হয়ে যায়।এইভাবেই গরিবের ঘাম আর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে মাতব্বর গড়ে তুলেছে গাড়ি-বাড়ি, অট্টালিকা, মিল-ফ্যাক্টরি আর বিপুল সম্পদের পাহাড়।আজ সেই শোষণের জালে আবারও আটকে গেলেন করিম মিয়া।কিছুদিন আগে ফসল রোপণের সময়ই তাকে অনেক টাকা খরচ করতে হয়েছিল। বাধ্য হয়ে মাতব্বরের কাছ থেকে ধারও নিয়েছেন। সেই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই চলছিল সংসার।এর মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তার স্ত্রী সাজেদা বেগম।ঘরে টাকা নেই বললেই চলে।এদিকে সাজেদা বেগম প্রচণ্ড জ্বরে কাঁপছেন। জ্বরের ঘোরে কখনো কীসব প্রলাপ বকছেন, কখনো আবার প্রিয় মানুষদের ডাকছেন।হঠাৎ তিনি কাঁপা কণ্ঠে ডাকলেন,—পারু... তুই কোথায় রে মা? এদিকে আয়।পারু ছুটে এসে মায়ের পাশে বসে বলল,—এই তো মা, আমি এসেছি। কিছু বলবে?—তোর বাবা কোথায়?—কামলা নিয়ে ক্ষেতে গেছে।সাজেদা বেগম মেয়ের হাতটা শক্ত করে ধরে বললেন,—পারু, আমার কেমন জানি লাগছে রে। মনে হয় আর বাঁচব না। তোর বাবাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। তুই তাকে ডেকে নিয়ে আয়।মায়ের মুখে মৃত্যুর কথা শুনে পারু আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না।কাঁদতে কাঁদতে বলল,—মা, এমন অলক্ষুণে কথা বলো না। মানুষ অসুস্থ হয়, আবার ভালোও হয়ে যায়। তুমি মরার কথা মুখে আনবে না। চুপচাপ শুয়ে থাকো। আমি বাবাকে ডেকে আনছি।পারু এক দৌড়ে ক্ষেতে গিয়ে বাবাকে ডেকে নিয়ে এল।করিম মিয়া ঘরে ঢুকেই দেখলেন, তার স্ত্রী জ্বরের ঘোরে অস্বাভাবিক আচরণ করছেন। তিনি স্ত্রীর পাশে বসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,—পারুর মা, এখন কেমন লাগছে?সাজেদা বেগম কাঁপা গলায় বললেন,—ভালো না গো। তুমি একটু আমার পাশে বসো।মায়ের অবস্থা দেখে পারু আর নিজেকে সামলাতে পারল না।—বাবা, আর দেরি করা ঠিক হবে না। মায়ের অবস্থা খুব খারাপ। তাড়াতাড়ি ডাক্তার নিয়ে এসো।করিম মিয়া চুপ করে রইলেন।পারু আবার বলল,—বাবা, দাঁড়িয়ে আছ কেন? ডাক্তার নিয়ে এসো।করিম মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,—মা পারু, ডাক্তার তো ডাকব। কিন্তু টাকা পাব কোথায়?পারু এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল,—মাতব্বর চাচার কাছে যাও। যেমন করেই হোক, তার কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়ে এসো। তা না হলে মাকে বাঁচাতে পারব না।অসুস্থ সাজেদা বেগমও স্বামীর কথা শুনছিলেন। মাতব্বরের কাছ থেকে টাকা ধার নেওয়ার কথা শুনে তিনি দুর্বল কণ্ঠে বলে উঠলেন,—ওগো, আমার জন্য ডাক্তার ডাকতে হবে না। আমার বোধহয় সময় শেষ হয়ে এসেছে। অযথা টাকা নষ্ট করার দরকার নেই। ফসল রোপণের সময় যে টাকা ধার নিয়েছিলে, তার সুদ-আসল দিতেই তো এবার সব ফসল চলে যাবে। আবার ধার করলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে। দোহাই তোমার, আর কর্জ করতে যেও না।কিছুক্ষণ থেমে তিনি বললেন,—আমি মরে গেলে অন্তত মাতব্বরের শোষণ থেকে তোমরা বেঁচে যাবে।স্ত্রীর কথা শুনে করিম মিয়ার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না।হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেলেন মাতব্বরের বাড়ির দিকে।মাতব্বরের বাড়ির অন্দরমহলে ঢোকার মুখেই এক লোক তার পথ আটকে দাঁড়াল। তার হাতে পিস্তল।—এই মিয়া, কথা ছাড়া কই যাইতাছেন? দাঁড়ান। নইলে এক্ষণই কাবু কইরা দিমু।পিস্তল দেখে করিম মিয়ার বুক ধড়ফড় করে উঠল।নরম স্বরে বললেন,—তুমি কে ভাই?লোকটি গম্ভীর গলায় বলল,—আমি মাতব্বর সাহেবের পিএস।—ভাই, আমাকে ক্ষমা করো। এর আগে তোমাকে দেখিনি, তাই চিনতে পারিনি।—আপনে কার কাছে আইছেন, হেইডা কন।—মাতব্বর সাহেবের কাছে এসেছি। খুব জরুরি দরকার। তাড়াতাড়ি তার সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দাও।লোকটি এবার একটু নরম হলো।—আরে, আপনে হেই কথা আগে কইবেন তো! আহেন, আমার লগে আহেন। এই চেয়ারটাতে বসেন।করিম মিয়াকে বসিয়ে রেখে লোকটি মাতব্বরকে ডেকে আনল।করিম মিয়াকে দেখেই মাতব্বর গলা চড়িয়ে বলল,—কী করিম মিয়া! অনেক দিন পর আইলা মনে হয়। তা কী মনে কইরা?করিম মিয়া মাথা নিচু করে বললেন,—মাতব্বর সাহেব, আমরা গরিব মানুষ। কাজকর্ম নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকি। তাই আসা হয় না।—তোমার এত দুঃখের গীত শোনার সময় আমার নাই। এখন ক্যান আইছ, হেইডা কও।—মাতব্বর সাহেব, আমি খুব বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি। আপনি যদি একটু সাহায্য করেন...—আরে মিয়া, মহা মুশকিলের কথাতো! আগে কও বিপদটা কী। তারপর ভাইবা দেখুম কিছু করা যায় কি না।—আমার স্ত্রী খুব অসুস্থ। চিকিৎসা করানো দরকার। কিন্তু হাতে একেবারেই টাকা নেই। তাই...—তা কী কইতে চাও, কও। থামলা ক্যান?করিম মিয়া মাথা নিচু করে বললেন,—আমি কর্জ নিতে এসেছি। টাকার খুব প্রয়োজন।—কত টাকা লাগবে?—দুই হাজার টাকা হলে কোনোভাবে স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে পারব।মাতব্বর সঙ্গে সঙ্গে মুখ কালো করে ফেলল।—কী কও! দুই হাজার টাকা? এতগুলান টাকা একসঙ্গে! তাছাড়া আগের টাকাই তো এখনো শোধ করতে পারো নাই। ওই টাকা সুদে-আসলে দ্বিগুণ হইয়া গেছে। তুমি শোধ করবা কেমনে? যে জমি চাষ করো, তাতে এত টাকা শোধ করতে পারবা বইলা মনে অয়? যাও, আমি টাকা দিতে পারুম না।করিম মিয়া হাতজোড় করে বললেন,—মাতব্বর সাহেব, এত নির্দয় হবেন না। আমি আপনার সব টাকা শোধ করে দেব। আমার প্রতি একটু দয়া করুন।মাতব্বর মনে মনে খুশিতে ফেটে পড়ল।এই মানুষগুলোর কাছ থেকেই তো তার সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠেছে। তবে মুখে সে ভাবটা প্রকাশ করল না।কিছুক্ষণ আমতা-আমতা করে বলল,—করিম মিয়া, এত কইরা যখন কইতাছ, তখন না করি কেমনে? তবে টাকা দিবার পারি এক শর্তে।—কী শর্ত, মাতব্বর সাহেব?—আগের চাইতে সুদের হার একটু বাড়াইতে অইব।করিম মিয়া বুঝতে না পেরে বললেন,—ঠিক বুঝলাম না।—আগে সুদ দিতা শতকরা দশ টাকা। এখন দিবা বিশ টাকা। মাস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদের টাকা শোধ করতে অইব।স্ত্রীর মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল করিম মিয়ার।তিনি আর কোনো হিসাব করলেন না।—ঠিক আছে মাতব্বর সাহেব। আমি রাজি।করিম মিয়ার সম্মতি শুনে মাতব্বরের মুখে শয়তানি হাসি ফুটে উঠল।সে ভেতরের ঘরে গিয়ে দুই হাজার টাকার একটি বান্ডিল এবং একটি স্ট্যাম্প কাগজ এনে বলল,—এইখানে একটা দস্তগত দাও।অসহায় করিম মিয়া স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে টাকা নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।সরাসরি গেলেন ডাক্তারের কাছে।স্ত্রীর অসুস্থতার কথা বলে অনুরোধ করলেন,—ডাক্তার সাহেব, আপনি একবার আমাদের বাড়িতে চলেন। আমার স্ত্রী খুব অসুস্থ।ডাক্তার কিছুটা ইতস্তত করে বললেন,—করিম মিয়া, এমনিতেই তোমার কাছে অনেক টাকা বাকি পড়ে আছে। আবার তোমার বাড়িতে যেতে বলছ?করিম মিয়া এবার শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,—ডাক্তার সাহেব, চিন্তা করবেন না। আমি জানি, রোগীর কাছে রোগ বড় আর ডাক্তারের কাছে টাকা বড়। আজকের খরচ যা হবে, নগদ পরিশোধ করব।ডাক্তার একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন।—আরে, আমি তা বলিনি। একটু ব্যস্ত ছিলাম। তাই বলছিলাম আরকি।—আর একটু পরে গেলে হবে না, ডাক্তার সাহেব?—কেন?—এখনই যেতে হবে। আমার স্ত্রী খুব অসুস্থ।ডাক্তার আর আপত্তি করলেন না।করিম মিয়ার সঙ্গে তার বাড়িতে গেলেন।রোগীর পাশে বসে প্রথমে রক্তচাপ মাপলেন। তারপর থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর মাপলেন।জ্বরের মাত্রা অনেক বেশি।পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তার বললেন,—টাইফয়েড জ্বর হয়েছে। নিয়ম মেনে ওষুধ খাওয়াতে হবে। আর খুব ভালোভাবে সেবা-যত্ন করতে হবে।কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে পারুকে বললেন,—পারু, ঠিকমতো সেবা করবে। সকাল-বিকেল মাথায় পানি দেবে, জলপট্টি দেবে, ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দেবে। জ্বর অনেক বেশি। কোনো সমস্যা হলে আমাকে খবর দেবে।করিম মিয়া মাথা নেড়ে বললেন,—জ্বি ডাক্তার সাহেব।ডাক্তার চলে গেলেন।এর কিছুক্ষণ পর সাজেদা বেগমকে দেখতে কয়েকজন প্রতিবেশী মহিলা এলেন। তাদের সঙ্গে এলেন পারুর দূরসম্পর্কের দাদী ফুলজান বিবিও।পারু তখন মায়ের মাথায় পানি ঢালছিল।সাজেদা বেগম জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছিলেন।তা দেখে কয়েকজন মহিলা ফিসফিস করে বলতে লাগল,—পারুর মারে ভূতে ধরছে।—চল চল, আমরা চইলা যাই। তানা অইলে আমাগোরেও ধরবো!তারা চলে যেতে উদ্যত হলে পারু বলল,—আপনারা চলে যাচ্ছেন কেন? বসবেন না?ফুলজান বিবি বললেন,—ওরা তোর মায়ের কাছে বসব না।পারু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,—কেন দাদু?—তোর মারে ভূতে ধরছে। দেখতাছস না, চোখ-মুখ কেমন লাল অইয়া গেছে? আজেবাজে কথা কইতাছে। এখন ভূত ছাড়াইতে অইবো। তানা অইলে ধারে-কাছে যারা থাকবো, সবাইরে ভূতে ধরবো। তোর বাবারে ডাক। আমি সব বুঝাইয়া কমু।পারু এবার হেসে ফেলল।—দাদু, তোমরা এখনো সেই মান্ধাতার আমলেই পড়ে আছ! মায়ের টাইফয়েড জ্বর হয়েছে। এটা ভূত নয়।ফুলজান বিবি রেগে উঠলেন।—চুপ বেয়াদব মাইয়া! আমার মুখের ওপর কথা কইবার সাহস তোকে কে দিছে? তুই এতটুকুন মাইয়া, তুই আবার এসব বুঝবি?পারু শান্তভাবে বলল,—দাদু, সময় বদলেছে। যুগ বদলেছে। এখন বিজ্ঞান অনেক দূর এগিয়েছে। তোমরা যেটাকে ভূত বলছ, সেটা আসলে রোগের লক্ষণ। ঝাড়ফুঁক দিয়ে রোগ ভালো হয় না। চিকিৎসা করাতে হয়।—চুপ! এত বিজ্ঞান-বিজ্ঞান করিস ক্যান? ডাক্তার-পাক্তাররা টাকা কামানোর লাইগ্যা এসব কথা কয়। তোর বাবারে কও, সোলেমান খনকাররে লইয়া আইতে অইবো। নইলে বিপদ অইবো।পারু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,—বাবা বাজারে গেছে মায়ের ওষুধ আনতে। ফিরতে দেরি হবে। আর মায়ের টাইফয়েড হয়েছে। অযথা ঝাড়ফুঁক করে টাকা নষ্ট করার কোনো দরকার নেই।কিন্তু ফুলজান বিবি নাছোড়বান্দা।কিছুক্ষণ পর করিম মিয়া ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফিরতেই ফুলজান বিবি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন।—করিম, আজ তোর মাইয়ার বিচার তোকে করতেই অইবো। এই গেরামের হগলে আমার কথা হুনে। আর তোর মাইয়া আমার লগে তর্ক করে! মাইয়া মানুষরে বেশি পড়াইলে বাড় বাইরা যায়। সে আমারে বিজ্ঞানের কথা কইয়া অপমান করছে। যা আমাগো চৌদ্দগুষ্টির কেউ কোনোদিন শোনে নাই। তুই বিচার করবি কিনা কও!করিম মিয়া অবাক হয়ে বললেন,—চাচি, পারু মেয়ে মানুষ। বলতে গিয়ে হয়তো কিছু একটা বলে ফেলেছে। তাই বলে আপনি এত রাগ করছেন কেন? কী হয়েছে, আমাকে খুলে বলুন।ফুলজান বিবি গলা নিচু করে ষড়যন্ত্রের সুরে বললেন,—শোন করিম, তোর বউয়ের এখন যেই অবস্থা, আমার মনে অয় দেরি করা ঠিক অইবো না। আমার যা বুঝনের বুইঝা গেছি। তার গায়ে আগলা ছোঁড় লাগছে। ঝাড়ফুঁক করাইতে অইবো। তুই তাড়াতাড়ি সোলেমান খনকাররে লইয়া আয়। সময় বেশি অইয়া গেলে কিন্তু রক্তের লগে মিশা যাইবো!অজ্ঞতার সেই পরামর্শকেই সত্য মনে করলেন করিম মিয়া।তিনি তাড়াতাড়ি গিয়ে সোলেমান খনকারকে ডেকে আনলেন।রোগীর পাশে বসে খনকার চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ কী যেন বিড়বিড় করলেন। তারপর গম্ভীর মুখে বললেন,—করিম ভাই, ভাগ্য ভালো, সময় থাকতে আমারে ডাইকা আনছেন। আর একটু দেরি হইলে কিন্তু বিরাট ক্ষতি অইতো। তবুও ছাড়াইতে কষ্ট অইবো। খুব খারাপ ভূত।করিম মিয়া উৎকণ্ঠিত হয়ে বললেন,—সোলেমান ভাই, আর দেরি করবেন না। কাজ শুরু করেন।—এক গ্লাস পানি, এক শিশি সরিষার তেল, কিছু হলুদ আর মরিচের গুঁড়া নিয়া আসেন।করিম মিয়া সবকিছু এনে দিলেন।খনকার প্রথমে পানি ও তেলে কিছু পড়লেন। তারপর হলুদ ও মরিচের গুঁড়া আগুনের মালসায় পোড়ালেন।এরপর নির্দেশ দিলেন রোগীকে মালসার ওপর উপুড় করে ধরতে।অসুস্থ মানুষটিকে একা ধরে রাখা সম্ভব নয়। কয়েকজন মিলে সাজেদা বেগমকে ধরে রাখল।খনকার চোখ বন্ধ করে ঠোঁট নাড়তে নাড়তে কিছুক্ষণ ফুঁ দিলেন।তারপর বিজয়ীর ভঙ্গিতে বললেন,—ভূত চইলা গেছে!একটি তাবিজ দিয়ে তিনি তার ফি নিয়ে বিদায় হলেন।অথচ সত্যিটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।সাজেদা বেগমের শরীরে কোনো ভূত ছিল না।ছিল টাইফয়েড জ্বর।দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজের অনেক মানুষ এখনো রোগের চিকিৎসার বদলে কুসংস্কারের আশ্রয় নেয়।শিক্ষিত-অশিক্ষিত—সব পরিবারেই কখনো কখনো এমন মানুষ পাওয়া যায়, যারা নিজেদের অজ্ঞতাকে সত্যের চেয়েও বড় মনে করেন।তবে ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস!সাজেদা বেগম শেষ পর্যন্ত ডাক্তারের দেওয়া ওষুধেই ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন।কয়েক দিন পর এক সকালে উঠানে মোড়ায় বসে মিষ্টি রোদ পোহাচ্ছিলেন তিনি।ঠিক তখনই ফুলজান বিবি এসে বললেন,—বউ, এখন কেমন লাগে? শরীরটা ভালো লাগতাছে তো?সাজেদা বেগম মৃদু হেসে বললেন,—জ্বি চাচি, একটু একটু ভালো লাগছে। জ্বরও কমে গেছে। আল্লাহপাক এই গরিবের দিকে মুখ তুলে চেয়েছেন।ফুলজান বিবি এবার একটু কাছে এসে বললেন,—বউ, তোমারে একখান কথা কই। করিমরে বলবা, পারুরে আর কলেজে না পাঠাইতে।সাজেদা বেগম চমকে তাকালেন।—কেন চাচি?—মাইয়াগোরে বেশি পড়াইতে নাই। দেখলা না, হেইদিন আমার লগে কেমন তক্ক করল! আমার কথা যদি না শুনত, আর খনকাররে যদি না আনত, তাইলে তুমি কি বালা অইতা?একটু থেমে আবার বললেন,—এখন আমার কথা হুন। পারুর কলেজ বন্ধ কইরা দাও। তারপর ভালো ঘর দেইখা বিয়া দিয়া দাও।মুরব্বির মুখের ওপর কথা বলা অন্যায়—এই বিশ্বাসে সাজেদা বেগম নীরবে সব কথা হজম করে নিলেন।ঠিক তখনই ভেতর থেকে পারুর ডাক শোনা গেল,—মা, তুমি কোথায়?—এই তো, উঠানে।—তাড়াতাড়ি ভেতরে এসো। ওষুধ খাওয়ার সময় হয়ে গেছে।সাজেদা বেগম উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন,—পারু, আমি তো এখন অনেকটাই সুস্থ। আর ওষুধ না খেলেও হয় না?পারু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,—না মা। এটা টাইফয়েড জ্বর। ডাক্তারের দেওয়া পুরো কোর্স শেষ করতে হবে। মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করলে আবার অসুস্থ হয়ে পড়তে পারো।মায়ের মুখে আর কোনো কথা রইল না।পারু ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী মাকে ওষুধ খাইয়ে দিল।ফুলজান বিবির সব কথা পারু আড়াল থেকে শুনেছিল।মনে মনে প্রচণ্ড প্রতিবাদ জেগেছিল তার।কিন্তু সে কিছু বলল না।কারণ সে জানে—কিছু মানুষের সঙ্গে যুক্তি দিয়ে কথা বললে যুক্তি ফিরে আসে না, ফিরে আসে অপমান, রাগ আর প্রতিশোধ।এই সমাজে এখনো এমন অনেক পরিবার আছে, যেখানে শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত কোনো এক অজ্ঞ মুরব্বির কথাই শেষ কথা। তার ভুল পরামর্শও সবাই মেনে নেয় অন্ধের মতো।পারুর বাবাও আজ সেই ভুলটাই করলেন।সাজেদা বেগমের টাইফয়েড জ্বর হয়েছিল—এই সত্যটা পারু ছাড়া যেন আর কেউ বিশ্বাস করতেই রাজি নয়।সবার ধারণা, পারুর মাকে ভূতে ধরেছিল।আর খনকার ভূত ছাড়িয়ে দেওয়ার পরই সে সুস্থ হয়েছে!এটাই আমাদের সমাজের কিছু মানুষের তথাকথিত কৃষ্টিকালচার মানসিকতার নির্মম চিত্র।কিন্তু পারু জানে, সামনে আরও বড় ঝড় আসছে।আর সেই ঝড় শুধু তার মায়ের অসুস্থতা কিংবা কুসংস্কারেই থেমে থাকবে না।চলবে...
0 Comments