উপন্যাস পর্ব \"এক\" চুড়ান্ত কপিতুমি প্রথম তুমি শেষআফছানা খানম অথৈআজ বৃহস্পতিবার। রসুলপুর ডিগ্রি কলেজের প্রাঙ্গণজুড়ে উৎসবের আমেজ। কলেজের মিলনায়তনে আয়োজন করা হয়েছে জমজমাট এক বিতর্ক প্রতিযোগিতার।বিতর্কের বিষয়—“শিক্ষার উৎকর্ষতাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত।”পক্ষ দলের হয়ে অংশ নিয়েছে ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষের তিন ছাত্রী—পারু, যোবেদা ও মুক্তা।আর বিপক্ষ দলে ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র—রাফি, কাফি ও মুন্না।দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তি-পাল্টা যুক্তিতে মুখর হয়ে ছিল পুরো মিলনায়তন। কখনো করতালিতে ফেটে পড়েছে দর্শক, কখনো আবার তীক্ষ্ণ যুক্তিতে প্রতিপক্ষকে থামিয়ে দিয়েছে বক্তারা।শেষ পর্যন্ত বিচারকমণ্ডলীর রায় ঘোষণা হলো।পক্ষ দল বিজয়ী।আর শ্রেষ্ঠ বক্তা হিসেবে নির্বাচিত হলো—পারু।মুহূর্তেই পুরো মিলনায়তন করতালিতে মুখর হয়ে উঠল।পারু মঞ্চে দাঁড়িয়ে মৃদু হাসল। চোখেমুখে লাজুক আনন্দের আভা। পুরস্কার হাতে নেওয়ার সময়ও সে ছিল ভীষণ শান্ত। অথচ তার এই শান্ত সৌন্দর্যই যেন মুহূর্তে আরও বেশি মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নিল।অনুষ্ঠান শেষ হলো।ছাত্রছাত্রীরা দল বেঁধে বাড়ির উদ্দেশে বের হতে শুরু করল। কলেজ প্রাঙ্গণ ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসছে। কিন্তু শ্রেষ্ঠ বক্তা পারু এখনো বান্ধবীদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।মুক্তা এসে মুচকি হেসে বলল,—এই যে শ্রেষ্ঠ বক্তা, বাড়ি যাওয়ার কোনো ইচ্ছে আছে, নাকি আজ থেকে কলেজেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিস?পারু হেসে বলল,—যাব তো। একটু দাঁড়া।—কীসের জন্য?—যোবেদাকে ডাকতে হবে।—ও আবার কোথায়?পারু হাতের ইশারায় কলেজ ভবনের বারান্দার দিকে দেখিয়ে বলল,—ওই যে, মুন্না ভাইয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। মনে হয় বাড়ির কথা একেবারে ভুলেই গেছে। তুই দাঁড়া, আমি ডেকে আনি।পারু যোবেদার দিকে এগোতে যাবে, এমন সময় মুক্তা তার হাত টেনে ধরল।—পারু, দাঁড়া!পারু অবাক হয়ে তাকাল।—আবার কী হলো?মুক্তা একটু রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল,—এদিকে আয়। একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।—কী কথা?—আগে আয়। তারপর বলছি।পারু কাছে আসতেই মুক্তা গেটের বাইরে তাকিয়ে মুচকি হাসল।—ঐ ছেলেটাকে দেখেছিস?পারু ভ্রু কুঁচকে বলল,—কোন ছেলেটা?—গেটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকক্ষণ ধরে কিন্তু তোর দিকেই তাকিয়ে আছে।পারু একবার তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল।—তো?—তো মানে? ছেলেটা এমনভাবে তাকিয়ে আছে, মনে হচ্ছে জীবনে কোনোদিন মেয়ে মানুষ দেখেনি!পারু বিরক্ত হয়ে বলল,—মুক্তা, তোর এসব কী শুরু হলো আবার?—আমি কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছি। ছেলেটা শুধু তাকিয়েই নেই, তোর প্রতিটা নড়াচড়ার দিকেও নজর রাখছে।—তাই নাকি?—হ্যাঁ। বল তো, আগে কোথাও দেখেছিস ওকে?—না।—সত্যি?—সত্যি। মিথ্যা বলব কেন?মুক্তা এবার চোখ টিপে বলল,—তাহলে কি ব্যাপারটা অন্যকিছু?—কী ব্যাপার?—ভাব-সাব আছে নাকি?পারু চোখ বড় বড় করে তাকাল।—মানে?—মানে, ছেলেটা তোকে পছন্দ করে কি না, সেটাই বলছি।পারু একটু রেগে বলল,—তার মানে তুই বলতে চাইছিস, আমি ওর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছি?মুক্তা হেসে ফেলল।—আরে না! এত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছিস কেন? আমি তো শুধু বললাম, ছেলেটার আচরণ দেখে মনে হচ্ছে সে তোর প্রেমে পড়েছে।—তুই না একদিন মনোবিজ্ঞানী হবি?—কেন?—মানুষের চোখের দৃষ্টি দেখে প্রেম নির্ণয় করিস!মুক্তা হেসে বলল,—হতে পারে। তবে একটা কথা মনে রাখিস, প্রেম শুরু হয় অনেক সময় মুখের কথা দিয়ে নয়, চোখের ভাষা দিয়ে।পারু মুচকি হেসে বলল,—বাহ! আজ তো বেশ দার্শনিক হয়ে উঠেছিস।—হাসিস না। একদিন দেখবি, আমার কথাই সত্যি হয়েছে।—যেদিন সত্যি হবে, সেদিন তোকে নিজ হাতে মিষ্টি খাওয়াব।—আর যদি ছেলেটার প্রেমে পড়িস?পারু একটু থেমে বলল,—তাহলে?মুক্তা হেসে বলল,—তাহলে আমাকেই আগে জানাবি।—ঠিক আছে। এবার চল। ক্ষুধায় আমার পেটের ভেতর বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে।ঠিক তখনই যোবেদা এসে তাদের সামনে দাঁড়াল।—কী নিয়ে এত হাসাহাসি হচ্ছে?মুক্তা সঙ্গে সঙ্গে বলল,—ঐ যে গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল।যোবেদা গেটের দিকে তাকিয়ে বলল,—কোন ছেলেকে?—ঐ যে।যোবেদা ছেলেটিকে দেখেই হেসে ফেলল।—আরে, ও তো নিলয় ভাই!পারু অবাক হয়ে বলল,—তুই ওকে চিনিস?—চিনি তো! ও খুব ভালো ছাত্র। আর ভীষণ ভদ্রও।মুক্তা বলল,—ভালো ছাত্র হোক আর ভদ্র হোক, আমাদের প্রশ্ন হলো—সে পারুর দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন?যোবেদা এবার পারুর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।—মনে হয় উত্তরটা খুব কঠিন নয়।পারু বিরক্ত হয়ে বলল,—তোরা দুজন মিলে আমাকে নিয়ে আর কতক্ষণ গবেষণা করবি?যোবেদা হেসে বলল,—পারু, তুই যদি নিলয় ভাইয়ের প্রেমে পড়িস, তাহলে কিন্তু তোর জীবন ধন্য!—যোবেদা!—আচ্ছা আচ্ছা, রাগ করিস না। এবার ওর পরিচয়টা শুন।যোবেদা একটু গম্ভীর হয়ে বলল,—নিলয় রহমান। আরমান স্যারের বড় বোনের একমাত্র ছেলে।পারু চুপ করে শুনতে লাগল।—ছোটবেলায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিলয়ের বাবা-মা দুজনেই মারা যান। তারপর থেকে আরমান স্যারই তাকে নিজের সন্তানের মতো মানুষ করেছেন। তাঁর নিজের কোনো সন্তান নেই। তাই নিলয়ই তাঁর কাছে সবকিছু।মুক্তা বলল,—তাহলে ছেলেটা পড়াশোনায় কেমন?—ভীষণ ভালো। এসএসসিতে ভালো ফল করেছে। এবার এইচএসসিতেও ভালো করবে, ইনশাআল্লাহ। আর শুনেছি, ওর ইচ্ছা ডাক্তার হওয়ার।পারু এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার ধীরে ধীরে বলল,—ছেলেটা যদি এত ভালো হয়, তাহলে তোদের এত আগ্রহ কেন?মুক্তা সঙ্গে সঙ্গে বলল,—কারণ আমরা তোকে নিয়ে চিন্তা করি!—আমার চিন্তা তোদের করতে হবে না।যোবেদা হেসে বলল,—ঠিক আছে। তবে একটা কথা বলি?—বল।—নিলয় ভাই যদি সত্যিই তোকে ভালোবেসে থাকে, তাহলে কিন্তু ব্যাপারটা খারাপ না।পারু মুখ ঘুরিয়ে বলল,—কে বলেছে সে আমাকে ভালোবাসে?মুক্তা বলল,—তার চোখ।পারু কিছু বলল না।অজান্তেই একবার গেটের দিকে তাকাল।নিলয় তখনও দাঁড়িয়ে।দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল।নিলয় সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিল।পারুর বুকের ভেতর কেমন যেন অচেনা একটা অনুভূতি হলো।সে দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল।মুক্তা সেই দৃশ্য দেখে মুচকি হাসল।—কী রে? মনোবিজ্ঞানী এবার কার চোখের ভাষা পড়ল?পারু কোনো উত্তর দিল না।শুধু বলল,—চল, বাড়ি যাই।এদিকে রসুলপুরের অন্য প্রান্তে আরমান রহমানের ছোট্ট সংসার।আরমান রহমান স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। প্রতিদিনের মতো স্কুল ছুটি শেষে তিনি বাড়ি ফিরেছেন।বাড়িতে ঢুকেই স্ত্রী শিউলীকে জিজ্ঞেস করলেন,—শিউলী, নিলয় ফিরেছে?—না তো। এখনো ফেরেনি।আরমান ঘড়ির দিকে তাকালেন।—এত দেরি হলো? বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল!শিউলী শান্ত গলায় বলল,—আজ কলেজে অনুষ্ঠান ছিল। হয়তো সেজন্যই দেরি হয়েছে।—তবু একটা ফোন তো করতে পারে! কোনো বিপদ-আপদ হয়নি তো?—আপনি অযথা চিন্তা করছেন। নিলয় ঠিকই ফিরবে।ঠিক তখনই দরজা খুলে নিলয় ঢুকল।মামার চোখে পড়তেই সে একটু থমকে গেল।আরমান কঠিন গলায় বললেন,—নিলয়, কলেজ ছুটি হয়েছে সেই কখন। এতক্ষণ কোথায় ছিলে?—মামা, কলেজে অনুষ্ঠান ছিল। বিতর্ক প্রতিযোগিতা। তাই দেরি হয়ে গেল।আরমানের মুখের কঠোরতা একটু নরম হলো।—আচ্ছা। লেখাপড়া কেমন চলছে?—ভালো, মামা।—তোর মায়ের একটা স্বপ্ন ছিল, জানিস তো?নিলয় চুপ করে গেল।—তোর মা চাইত, তুই ডাক্তার হবি। মানুষের সেবা করবি। তুই কি পারবি তার স্বপ্নটা পূরণ করতে?নিলয়ের চোখে মুহূর্তেই মায়ের মুখ ভেসে উঠল।সে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,—ইনশাআল্লাহ, পারব মামা। আমি ডাক্তার হবই। আমার বাবা-মাকে হারানোর কষ্ট আমি ভুলিনি। আমি চাই, কোনো অসহায় মানুষ যেন চিকিৎসার অভাবে আপনজনকে না হারায়।আরমান আবেগে নিলয়ের মাথায় হাত রাখলেন।—আল্লাহ তোকে সফল করুন। আমার বোনের স্বপ্ন যেন তোর হাতেই পূর্ণ হয়।—আমিন।রাতের খাবার শেষে নিলয় নিজের ঘরে এসে পড়তে বসল।কিন্তু বইয়ের পাতায় চোখ থাকলেও মন যেন অন্য কোথাও।বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে একটি মুখ।পারু।আজ বিতর্কের মঞ্চে দাঁড়িয়ে মেয়েটিকে যেন অন্যরকম লাগছিল।তার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস, কথায় যুক্তি, চোখে স্বপ্ন—আর মুখে এক অদ্ভুত মায়া।নিলয় বই বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল।ঘরের আলো নিভিয়ে চোখ বন্ধ করতেই পারুর মুখ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।সে আপন মনে ফিসফিস করে বলল,—পারু... তুমি জানো না, আজ তোমাকে দেখার পর আমার ভেতরটা কেমন বদলে গেছে।কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার বলল,—তোমাকে প্রথম দেখার পর থেকেই মনে হচ্ছে, আমার চোখ যেন তোমাকেই খুঁজছে।তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল।—আজ তুমি যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলে, মনে হচ্ছিল শুধু তোমার কণ্ঠটাই শুনি। আর যখন শ্রেষ্ঠ বক্তা হিসেবে তোমার নাম ঘোষণা হলো, জানি না কেন, তোমার চেয়েও বেশি খুশি আমি হয়ে গেলাম।নিলয় দীর্ঘশ্বাস ফেলল।—কিন্তু তোমাকে কীভাবে বলব, পারু? কীভাবে বলব যে তোমাকে দেখলেই আমার চারপাশের পৃথিবীটা থেমে যায়?সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর মৃদুস্বরে বলল,—তুমি হয়তো জানোও না, তোমার একবার তাকানো আমার সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি কেড়ে নিতে পারে।নিলয়ের চোখে তখন অদ্ভুত এক স্বপ্ন।—পারু, আমি জানি না এই অনুভূতির নাম প্রেম কি না। তবে এটুকু জানি, তোমাকে দেখার পর অন্য কাউকে আর চোখে পড়ে না।একটু থেমে সে মৃদু হেসে বলল,—আর যদি সত্যিই এটা প্রেম হয়... তাহলে আমি চাই, এই প্রেমের শুরুতে যেমন তুমি থাকবে, শেষেও যেন তুমিই থাকো।নিলয় চোখ বন্ধ করল।কিন্তু ঘুম এল না।মনের পর্দায় শুধু একটি মুখ—পারু।অন্যদিকে, নিজের ঘরে শুয়ে পারুও জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো দেখছিল।মুক্তার কথাগুলো বারবার মনে পড়ছে—“প্রেম শুরু হয় অনেক সময় মুখের কথা দিয়ে নয়, চোখের ভাষা দিয়ে।”পারু নিজেই নিজের অজান্তে মুচকি হেসে ফেলল।তারপর মনে মনে বলল,—ছেলেটা সত্যিই কি আমার দিকে তাকাচ্ছিল?নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিতে গিয়ে লজ্জায় চোখ বন্ধ করল।কিন্তু সে জানত না—আজকের সেই একটুখানি চোখাচোখিই হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ গল্পের প্রথম অধ্যায়।চলবে...
0 Comments