গন্ধ মানুষকে কখনো ভোলে না। চাঁদপুরের ব্যবসায়ী মানিক মিয়ার কাছে শোভার গন্ধ ছিল তার সবচেয়ে পুরনো স্মৃতি। দশকের পর দশক পেরিয়ে, জীবনের নানা মোড়ে, সেই গন্ধ বারবার ফিরে আসে — ভালোবাসার সবচেয়ে অদৃশ্য কিন্তু সবচেয়ে স্থায়ী রূপ।
চতুর্থ গল্পমানিক ও শোভার গন্ধ“মানুষের শরীরেই যেন ভবিষ্যৎ বসবাস করে। একজন মানুষের সাথে আরেকজনের পরিচয় হয় যেন কোনো অজানা ভবিষ্যতের জন্য।” — আশিক হাসানপৃথিবীতে যত ইন্দ্রিয় আছে তার মধ্যে সবচেয়ে পুরনো হলো ঘ্রাণ।চোখ দেখে এবং ভোলে। কান শোনে এবং ভোলে। কিন্তু নাক একবার যা চেনে তা কখনো ভোলে না। বিজ্ঞানীরা বলেন — ঘ্রাণের স্নায়ু সরাসরি মস্তিষ্কের সেই অংশে যায় যেখানে স্মৃতি থাকে, যেখানে আবেগ থাকে। তাই একটা গন্ধ মুহূর্তের মধ্যে বিশ বছর আগে নিয়ে যেতে পারে। একটা গন্ধ মানুষকে কাঁদাতে পারে, হাসাতে পারে, অথবা এমন একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পারে যেখান থেকে সে আর ফিরতে চায় না।মানিকের জীবনে সেই গন্ধ ছিল শোভার।মানিক মিয়া।তার পুরো নাম মানিক মিয়া — কিন্তু পরে যখন ব্যবসায়ী হলো, সবাই ডাকত “মানিক ভাই।” নামের পেছনের পদবিটা সময়ের সাথে কমে গেল, সামনের নামটা বড় হলো।জন্ম ছোট্ট একটা মফস্বল শহরে — চাঁদপুরের কাছে একটা গ্রাম। বাবা ছোট ব্যবসায়ী ছিলেন, কাপড়ের। মা গৃহিণী। দুই ভাই, এক বোন।মানিক ছিল মাঝের ছেলে।মাঝের সন্তান সাধারণত একটু আলাদা হয় — প্রথম সন্তানের মতো সব মনোযোগ পায় না, শেষ সন্তানের মতো আদরে ভাসে না। তাই সে নিজের দুনিয়া তৈরি করে নেয়।মানিকের দুনিয়া ছিল গন্ধে। ছোটবেলা থেকেই সে গন্ধে আলাদা কিছু পেত।মায়ের রান্নাঘর থেকে হলুদ-মশলার গন্ধ আসত — সে বলতে পারত কোন রান্না হচ্ছে শুধু গন্ধে। বর্ষায় মাটি ভেজার গন্ধ তাকে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি দিত। শীতে সকালের কুয়াশায় একটা গন্ধ থাকে — ঠান্ডা, পরিষ্কার, একটু মিষ্টি — সে সেটা আলাদা করে চিনত।মানুষের গন্ধও সে চিনত।বাবার গায়ে থাকত কাপড়ের দোকানের গন্ধ — নতুন কাপড়ের একটা বিশেষ গন্ধ আছে, কিছুটা কৃত্রিম, কিছুটা বাণিজ্যিক। মায়ের গায়ে রান্নার গন্ধ মিশে থাকত সারাদিন।কিন্তু শোভার গন্ধ আলাদা ছিল। সম্পূর্ণ আলাদা।শোভা রায়।তাদের পাশের বাড়ির মেয়ে। হিন্দু পরিবার — শান্তিপ্রিয়, শিক্ষিত। বাবা স্কুলের শিক্ষক, মা সেলাই করতেন। শোভা একমাত্র মেয়ে।মানিক আর শোভা একই স্কুলে পড়েছে ছোটবেলায়। একই পথে যায়, একই পথে ফেরে।মানিক প্রথমবার শোভার গন্ধ পেয়েছিল — মনে নেই ঠিক কোনদিন। হয়তো বর্ষায় একটা দিন, যখন শোভার ভেজা চুল থেকে একটা গন্ধ আসছিল। হয়তো রোদের দিনে, যখন শোভার ত্বকে রোদের সাথে তার নিজের একটা স্বতন্ত্র গন্ধ মিলে যাচ্ছিল।এই গন্ধটা মানিক কখনো বর্ণনা করতে পারেনি। ফুলের মতো নয়। মাটির মতো নয়।এটা শুধু শোভার। একটা মানুষের শরীর থেকে যে গন্ধ বের হয় — সেই গন্ধ তার নিজের। অন্য কেউ এই গন্ধ দিতে পারে না।মানিক সেই গন্ধে আসক্ত হয়ে পড়ল। কিশোর বয়সে এই আসক্তির নাম সে জানত না। শুধু জানত — শোভার কাছে থাকতে ভালো লাগে। শোভার পাশ দিয়ে হাঁটতে ভালো লাগে।শোভার কথা বলার সময় একটু কাছে থাকলে সেই গন্ধ পাওয়া যায়। শোভা এটা বুঝত। কিন্তু এড়িয়ে যেত না।কারণ মানিক অদ্ভুত। সে হাতও ধরত না, বেশি কাছে আসত না। শুধু পাশে থাকত। গন্ধ নিত।শোভার কাছে এটা অস্বস্তিকর ছিল না। বরং একটু অদ্ভুত লাগত, কিন্তু মন্দও না।কারণ মানিকের দৃষ্টিতে একটা বিশুদ্ধতা ছিল — সে কোনো লুকানো উদ্দেশ্যে কাছে আসছে না। সে শুধু সেই গন্ধের কাছে আসছে।এই নিষ্পাপতাটা শোভা অনুভব করত। তারপর বয়স বাড়ল। বিশ বছর হলো। দুজনের। মানিক আর শোভা।কিন্তু বিশ বছরে একটা দেওয়াল স্পষ্ট হয়ে উঠল যেটা আগে অস্পষ্ট ছিল।মানিক মুসলমান। শোভা হিন্দু। বাংলাদেশের ছোট মফস্বলে এই দেওয়াল ভাঙা যায় না। কেউ ভাঙে না।দুই পরিবার জানত। পাড়া জানত। কিন্তু কেউ সরাসরি বলেনি কিছু। শুধু একদিন শোভার মা বললেন, “শোভা, তোর জন্য পাত্র দেখছি।” শোভা বুঝল। সে মানিককে বলল না। কারণ বলার মতো কিছু নেই।তাদের মধ্যে কোনো প্রতিশ্রুতি হয়নি। কোনো কথা হয়নি। মানিক শুধু পাশে থেকেছে, গন্ধ নিয়েছে, দেখেছে।এটুকুই। এটুকু দিয়ে কি কিছু দাবি করা যায়? যায় না। শোভার বিয়ে হলো। অন্য জেলায়। হিন্দু পরিবার। ভালো ছেলে। বিয়ের দিন মানিক দূরে দাঁড়িয়েছিল।শোভার বিয়ের গন্ধ এসেছিল — ফুলের গন্ধ, সন্দেশের গন্ধ, ধূপের গন্ধ।শোভার নিজের গন্ধটা এই সব গন্ধে মিশে গিয়েছিল। মানিক শেষবারের মতো সেই গন্ধটা ধরার চেষ্টা করল। পারল না। শোভা চলে গেল।মানিকের জীবন তারপর একটা অদ্ভুত গতিতে চলল। সে ব্যবসায় নামল।বাবার কাপড়ের ব্যবসা থেকে শুরু। তারপর পাইকারি। তারপর আমদানি-রপ্তানি। ধীরে ধীরে বড় হলো।মানিকের ব্যবসায়িক বুদ্ধি ছিল — সে মানুষ পড়তে পারত। কার কাছে কী চাই, কাকে কী দিলে কাজ হবে — এই বোঝাটা তার প্রায় স্বজ্ঞাত।একসময় ঢাকায় অফিস হলো। গুলশানে একটা ফ্ল্যাট। মানিক মিয়া থেকে মানিক ভাই। কিন্তু বিয়ে করেনি। পরিবার বারবার বলেছে। সে বলেছে, “সময় হলে করব।” সময় হয়নি। আসলে — কোনো গন্ধ আসেনি।মানিক যে মেয়েদের সাথে পরিচিত হয়েছে, দেখেছে, কথা বলেছে — কারো কাছ থেকে সেই গন্ধ আসেনি।শোভার গন্ধ। যে গন্ধ তার কাছে একটা মাপকাঠি হয়ে গিয়েছিল। এই তুলনাটা অন্যায়। মানিক জানে। কিন্তু গন্ধের কোনো যুক্তি নেই। গন্ধ যুক্তি মানে না।ঢাকার গুলশানে একটা ক্লিনিক। ডাক্তার বকুল।মানিকের হাঁটুতে কিছুদিন ধরে সমস্যা — দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি, বয়সের সাথে শরীরের হিসাব। সে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছে।অক্টোবরের এক সকালে। আকাশে পাতলা মেঘ, রোদ আছে কিন্তু তীব্র নয়। মানিক ক্লিনিকে ঢুকল। ওয়েটিং রুমে কয়েকজন বসে। সে নম্বর নিয়ে বসল। তখনই। একটা গন্ধ। মানিকের নাসারন্ধ্র সেই গন্ধ চিনে নিল আগে। মস্তিষ্ক পরে।সে অনুভব করল — কোনো একটা জায়গায় ফিরে যাচ্ছে। একটা গ্রামের পথ। বর্ষার দিন। একটা মেয়ে পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।সে মুখ তুলল। দেখল। দুজন মহিলা।একজন মধ্যবয়স্ক। চুলে কিছু সাদা। মুখে সময়ের ছাপ। কিন্তু সেই মুখের কাঠামো — চোখের আকার, নাকের গড়ন।মানিক চিনল। শোভা। বিশ বছর। বিশ বছর পর।শোভা মাথা নামিয়ে ব্যাগ থেকে কিছু বের করছে। এখনো দেখেনি মানিককে।পাশে যে মেয়েটা বসে আছে — সেই গন্ধ তার কাছ থেকে আসছে। মানিক তাকে দেখল।তরুণী। উনিশ বছর হবে। শোভার মেয়ের মতো দেখতে — একই চোখের আকার, একই মুখের কাঠামো।বর্ষা। এই মেয়েটা বর্ষা।কিন্তু বর্ষার কাছ থেকে যে গন্ধ আসছে — মানিকের মাথা ঘুরে গেল।এটা শোভার গন্ধ। শোভার বিশ বছর আগের গন্ধ। শোভার যৌবনের গন্ধ।যে গন্ধ মানিক বিশ বছর ধরে খুঁজে বেড়িয়েছে — যেটা পায়নি কোথাও — সেটা এই মেয়ের শরীরে।কারণ রক্তের গন্ধ বহন করে। মায়ের কাছ থেকে মেয়ে পায়।কিন্তু সময়ের সাথে মায়ের গন্ধ বদলায় — বয়স নিয়ে যায়। মেয়ে বহন করে সেই পুরনো গন্ধ — তার যৌবনে।বর্ষার কাছে আছে শোভার বিশ বছর আগের গন্ধ। এই সত্যটা মানিকের পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। সে বসে রইল। নড়তে পারল না।শোভা মুখ তুলল। মানিককে দেখল। চিনল। একটা মুহূর্ত। দুজন তাকিয়ে রইল।শোভার মুখে একটা জটিল অনুভূতি — বিশ বছর পুরনো পরিচয়ের উষ্ণতাা, একটু অবাক হওয়া, একটু অস্বস্তি।“মানিক?” শোভা বলল।“শোভা।” মানিক উঠল। এলো। “কতদিন পর।”“হ্যাঁ।” শোভা বলল। “তুমি এখানে?”“হাঁটুর সমস্যা। ডাক্তার দেখাতে।” শোভা বলল, “আমিও। মানে, বর্ষার জন্য।” বর্ষা তাকিয়ে ছিল। মানিক বর্ষার দিকে তাকাল। “তোমার মেয়ে?”“হ্যাঁ।”মানিক হাসল। “বর্ষার মতো দেখতে — তোমার মতো।” শোভা একটু হাসল।কথা হলো কিছুক্ষণ — সাধারণ কথা। কে কোথায় আছে, কী করছে। মানিকের ব্যবসার কথা। শোভার সংসারের কথা।তারপর মানিক বলল, “বাইরে একটা আইসক্রিমের দোকান আছে। বর্ষা কি খাবে?”বর্ষা মায়ের দিকে তাকাল। শোভা বলল, “যাও।” মানিক আর বর্ষা বের হলো।ক্লিনিকের বাইরে ছোট্ট একটা দোকান। শীতের শেষ, আইসক্রিম খাওয়ার মৌসুম নয় বিশেষ, কিন্তু দোকান খোলা।বর্ষা আইসক্রিম নিল। মানিক পাশে দাঁড়াল। বর্ষার কাছ থেকে সেই গন্ধ। মানিকের মাথায় বিশ বছর আগের একটা সকাল। শোভা স্কুলের পথে। ভেজা মাটির গন্ধ। শোভার শরীরের গন্ধ। মানিক বলল, “তুমি কোথায় পড়ো?” বর্ষা বলল, “কলেজে। দ্বিতীয় বর্ষ।”“কী নিয়ে?”“বাংলা।” মানিক অবাক হলো একটু। “বাংলা?” “হ্যাঁ। সাহিত্য ভালো লাগে।” মানিক বলল, “তোমার মা বাংলায় পড়েছিল।” বর্ষা একটু অবাক হলো। “আপনি জানেন?”“পরিচয় অনেক পুরনো।” বর্ষা তার দিকে তাকাল। এই মানুষটা। বর্ষার কাছে মানিক একটু ভিন্ন মনে হলো। কীভাবে ভিন্ন — সে ব্যাখ্যা করতে পারবে না।শুধু মনে হলো — এই মানুষের চোখে একটা গভীরতা আছে। সে যেন অনেক কিছু দেখেছে, অনেক কিছু বহন করছে।বর্ষা জিজ্ঞেস করল, “মা আর আপনি কীভাবে চেনেন?” মানিক একটু হাসল। “একই পাড়ায় বড় হয়েছি।”“আর কিছু?” মানিক তাকাল। বর্ষার চোখে একটা কৌতূহল। “আর কিছু নেই।”কিন্তু বর্ষা বুঝল — “আর কিছু নেই” মানে “আর কিছু আছে।” ভেতরে ভেতরে একটু নাড়া খেল। ভেতরে ভেতরে কিছু একটা।ক্লিনিক থেকে বের হওয়ার সময় মানিক তার নম্বর দিল। শোভাকে। “পুরনো বন্ধু। যোগাযোগ রেখো।” শোভা নিল। মনে মনে জানত — যোগাযোগ রাখবে না। কারণ শোভার স্বামী জানলে ভালো দেখবে না। কিন্তু বর্ষার হাতে নম্বরটা গেল। কীভাবে?শোভার ব্যাগে রেখেছিল। বর্ষা একদিন ব্যাগে খুঁজতে গিয়ে পেল।সে সরিয়ে রাখল। ফোন করল না তখনই। কিন্তু রাখল। কয়েক সপ্তাহ পর। একটা সাহিত্য উৎসব। কলেজের আয়োজন। বর্ষা যাচ্ছিল। পথে একটা দোকানের সামনে — মানিক। দেখা হলো। মানিক বলল, “কোথায় যাচ্ছ?” বর্ষা বলল। মানিক বলল, “আমিও যাব।” “আপনি সাহিত্য উৎসবে?”“তোমার সাথে যাব।” বর্ষা হাসল। এই হাসি শোভার হাসির মতো। মানিকের বুকে কিছু একটা। তারা গেল। সারাদিন। কথা হলো।বর্ষা কথা বলে ভালো — সাহিত্যের কথা, কবিতার কথা, জীবনের কথা। বয়স উনিশ কিন্তু চিন্তায় একটু বড়।মানিক শুনল। এবং গন্ধ নিল। বর্ষার পাশে হাঁটতে হাঁটতে সেই পুরনো গন্ধ মানিককে ঘিরে ধরল।একটা বিশ বছর আগের মফস্বল। একটা স্কুলের পথ। একটা মেয়ে। সে সেখানে ছিল। এখনো আছে।তারপর দেখা হতে লাগল। মাঝেমাঝে। কখনো ক্যাফেতে। কখনো বইয়ের দোকানে। কখনো হাঁটতে হাঁটতে।বর্ষা জানত এটা স্বাভাবিক নয়। মানিকের বয়স তার চেয়ে অনেক বেশি।কিন্তু মানিকের সাথে থাকলে একটা অনুভূতি হয় — যেন এই মানুষ তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তার কথা শুনছে। তার চিন্তাকে সম্মান দিচ্ছে।বর্ষার জীবনে এটা কম পেয়েছে। মানিক জানত সে কী করছে। এই মেয়েটা শোভার মেয়ে। এই গন্ধটা শোভার গন্ধ — বিশ বছর আগের।কিন্তু মানিক এও জানত — বর্ষা আলাদা মানুষ। বর্ষার নিজের একটা পরিচয় আছে, নিজের চিন্তা আছে।সে কি বর্ষাকে ভালোবাসছে? নাকি শোভার গন্ধকে? এই প্রশ্নটার উত্তর সে দেয়নি। কারণ প্রশ্নের উত্তর দিলে থামতে হতো। সে থামল না। একদিন মানিক বর্ষাকে বলল, “আমার সাথে যাবে?” বর্ষা বলল, “কোথায়?” “অনেক দূরে।” বর্ষা তাকাল। “মা জানবে না?”“পরে জানবে।” বর্ষার মনে একটা ঝড়। এই মানুষকে সে বিশ্বাস করে। কেন করে? জানে না। শুধু জানে — এই মানুষ তাকে দেখে। সত্যিকারের দেখে। সে বলল, “যাব।”তারা চলে গেল। ঢাকা থেকে দূরে। সিলেটের দিকে। পাহাড়, চা বাগান। মানিক আগেই ব্যবস্থা করেছিল। একটা রেজিস্ট্রি অফিস। দুজন মানুষ। সাক্ষী দুজন। বিয়ে হলো। মানিক আর বর্ষার।সেই দিন সন্ধ্যায় চা বাগানের পথে হাঁটতে হাঁটতে মানিক বর্ষার কাছে থাকল।সেই গন্ধ। চারদিকে চা পাতার গন্ধ। আর বর্ষার শরীরের সেই গন্ধ। মানিক চোখ বন্ধ করল। সেখানে শোভা আছে — বিশ বছর আগের শোভা। কিন্তু পাশে বর্ষাও আছে — এখনকার। দুটো একসাথে। এটা কি ভালোবাসা? এটা কি পাপ? মানিক জানে না। সে শুধু জানে — এই গন্ধ তার। এই মানুষ তার।শোভা জানল।কীভাবে জানল — টেলিফোনে। তার বোন কল করেছিল। কেউ দেখেছে। কেউ বলেছে।বর্ষা চলে গেছে। মানিকের সাথে। বিয়ে করেছে। শোভা সেই মুহূর্তে ঘরের ভেতরে ছিল। সে বের হলো। দরজা খুলল। বাইরে দাঁড়াল। তারপর পড়ে গেল। মেঝেতে। কথা বলতে পারছে না। নড়তে পারছে না। ভেতরে কী হচ্ছে — কেউ জানে না। সে নিজেও জানে না।শুধু মাথায় একটা ঘূর্ণি — মানিক। বর্ষা। সেই পুরনো পথ। সেই স্কুল।মানিক বলেছিল, “আর কিছু নেই।” কিন্তু ছিল। সব ছিল। সে শুধু দেখতে পায়নি।সেই বিকেলে রাস্তায় আশিক হাসান। শ্রীপুর থেকে ঢাকায়। কোনো কাজে। যাচ্ছিল পথ ধরে। এই পথ দিয়ে সে আগে যায়নি। আজ কোনো কারণে এদিকে এসেছে। সে হাঁটছিল। তারপর থামল। দরজায় একজন মহিলা। মেঝেতে। নড়ছে না। আশিক এগিয়ে গেল। মহিলার মুখের দিকে তাকাল। চোখ খোলা। কিন্তু দূরে তাকিয়ে। আশিক বুঝল — এই মানুষ শারীরিকভাবে এখানে আছে। কিন্তু মন নেই। মন চলে গেছে কোনো দূরে। আশিক বসল পাশে। কিছু বলল না। শুধু পাশে রইল। একটু পরে পাড়ার কেউ এলো। “শোভা দি!” মানুষজন জমল। আশিক উঠল। সরে গেল। চলে যাওয়ার সময় একবার ফিরে তাকাল। শোভা তখনও সেই দূরে তাকিয়ে। আশিক ভাবল। একটা মানুষ। আরেকটা মানুষ। বিশ বছর। একটা গন্ধ। একটা মেয়ে। মানুষের শরীরে কী কী বহন করে? রক্ত বহন করে রোগ। রক্ত বহন করে সৌন্দর্য। রক্ত বহন করে গন্ধ।এই গন্ধ — যা মায়ের ছিল, মেয়ের হলো — এই গন্ধই একজন মানুষকে আরেকজনের কাছে টেনে আনল।দুই প্রজন্ম। একই টান। আশিক হাঁটতে লাগল। মনে মনে বলল — মানুষের শরীরেই যেন ভবিষ্যৎ বসবাস করে। একজন মানুষের সাথে আরেকজনের পরিচয় হয় যেন কোনো অজানা ভবিষ্যতের জন্য। শোভার ভবিষ্যৎ ছিল তার মেয়েতে। মানিকের ভবিষ্যৎ ছিল সেই গন্ধে। আর বর্ষার ভবিষ্যৎ? সে এখন জানছে। ঢাকার রাস্তা। সন্ধ্যা নামছে। আশিক হাঁটছে। পথের দুই পাশে দোকান জ্বলে উঠছে। মানুষ যাচ্ছে আসছে। প্রতিটা মানুষ একটা গন্ধ বহন করছে। প্রতিটা গন্ধ একটা গল্প। প্রতিটা গল্প অজানা ভবিষ্যতের দিকে।ডাক্তার বকুল সেইদিন তার চেম্বারে বসে। সন্ধ্যার শেষ রোগী দেখছে। মানিকের হাঁটুর রিপোর্ট এসেছিল। মানিক নিতে আসেনি। বকুল ফাইলটা রেখে দিল। বাইরে তাকাল। জানালায় ঢাকার সন্ধ্যা।রিপোর্টে কিছু লেখা আছে — হাঁটুতে সমস্যা আছে, কিন্তু বড় নয়।একটু যত্ন নিলে ঠিক হবে। কিন্তু মানিক আর আসেনি। হয়তো অন্য কোথাও চলে গেছে। হয়তো অন্য কোনো ব্যথা তাকে টেনে নিয়ে গেছে। হাঁটুর ব্যথার চেয়ে বড়। বকুল ফাইল বন্ধ করল। পরের রোগী।শোভা সেই রাতে বিছানায় শুয়ে। স্বামী পাশে। তিনি ঘুমাচ্ছেন। শোভা ঘুমাতে পারছে না। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে।মনে পড়ছে — একটা স্কুলের পথ। একটা ছেলে পাশে হাঁটছে। গন্ধ নিচ্ছে। অদ্ভুত ছেলে।শোভা তখন মাইন্ড করত না। কারণ মানিকের কাছে একটা বিশুদ্ধতা ছিল। এখন মনে হচ্ছে — সেই বিশুদ্ধতা কি সত্যিই ছিল? নাকি সে অন্য কিছু দেখছিল? শোভার শরীরে নয়। শোভার গন্ধে। এবং সেই গন্ধ তার মেয়ের কাছে খুঁজে পেল। শোভার চোখ ভিজে এলো। এটা কষ্টের কান্না নয় শুধু। এটা একটা বিস্ময়ের কান্নাও। মানুষ কতটা জটিল। ভালোবাসা কতটা জটিল। গন্ধ কতটা জটিল। বিশ বছর। একটা গন্ধ। দুটো মানুষ। একটা পরিণতি। শোভা চোখ বন্ধ করল।বর্ষা সেই রাতে সিলেটের একটা হোটেলে। জানালার বাইরে চা বাগান। রাতে সেই সবুজ আর দেখা যায় না। শুধু অন্ধকার। মানিক পাশে ঘুমাচ্ছে। বর্ষা জেগে আছে। সে ভাবছে। মা জানবে। মা কী ভাবছে এখন? বর্ষা বুঝতে পারছে — সে হয়তো ভুল করেছে। কিন্তু এখন ফেরার পথ নেই। সে মানিকের মুখের দিকে তাকাল। ঘুমন্ত মুখ। এই মুখে একটা শান্তি আছে। যেন সে যা খুঁজছিল পেয়ে গেছে। বর্ষা বুঝল না কী খুঁজছিল মানিক। হয়তো বুঝবে। হয়তো বুঝবে না। কিন্তু একটা কথা সে জানে। মানিক তার দিকে যেভাবে তাকায় — সেই তাকানো অদ্ভুত। যেন সে বর্ষাকে দেখছে না। যেন দেখছে অন্য কাউকে। কিন্তু কাকে? বাইরে বাতাস। চা বাগানে পাতা নড়ছে। গন্ধ আসছে — চা পাতার গন্ধ, মাটির গন্ধ। আর বর্ষার নিজের গন্ধ। সেই গন্ধ সে কখনো চিনতে পারেনি নিজে। কারণ নিজের গন্ধ নিজে পাওয়া যায় না।মানিকের রোমান্টিসিজম হলো গন্ধ। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো ইন্দ্রিয়। যে ইন্দ্রিয় ভোলে না। যে ইন্দ্রিয় সরাসরি স্মৃতিতে যায়। এই রোমান্টিসিজম সুন্দর। কিন্তু এতে একটা বিপদ আছে। গন্ধ মানুষকে চেনে না — গন্ধ শুধু গন্ধকে চেনে। মানিক শোভাকে ভালোবেসেছিল। নাকি শোভার গন্ধকে?এবং সেই গন্ধ বর্ষার কাছে পেয়ে — বর্ষাকে ভালোবাসছে? নাকি সেই হারানো গন্ধকে? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো মানিক নিজেও দিতে পারবে না।কারণ গন্ধের কোনো ব্যাকরণ নেই। গন্ধ যুক্তি মানে না। গন্ধ শুধু বহন করে। বহন করে স্মৃতি। বহন করে সময়। বহন করে ভবিষ্যৎ। শোভার শরীর থেকে বর্ষার শরীরে। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে। একটা গল্প থেকে আরেকটা গল্পে।আশিক হাসান সেই রাতে একটা ডায়েরিতে লিখল। শ্রীপুরের বাড়িতে ফিরে। ভাওয়াল রাজবাড়ীর কাছে। জানালা দিয়ে বাইরে অন্ধকার। সে লিখল — আজকে একটা মহিলাকে দেখলাম দরজায় পড়ে থাকতে। তার চোখ খোলা ছিল কিন্তু কাউকে দেখছিল না। আমি বুঝলাম — সে অনেক দূরে আছে। হয়তো বিশ বছর আগে। হয়তো একটা স্কুলের পথে। হয়তো একটা গন্ধের কাছে।মানুষের শরীর কতকিছু বহন করে — রক্ত, স্মৃতি, গন্ধ, ভবিষ্যৎ।একটা মানুষ যখন আরেকটা মানুষের কাছে যায়, সে কি জানে সে কী খুঁজছে? নাকি শুধু অনুভব করে — এখানে কিছু একটা আছে। এখানে থাকতে হবে। মানিক হয়তো জানত না সে কী খুঁজছিল। শোভার কাছে। তারপর বর্ষার কাছে। কিন্তু খুঁজেছিল। আর যে খোঁজে, সে পায়। কিন্তু পেলেই কি পাওয়া সম্পূর্ণ? সেটা আরেকটা প্রশ্ন। সেটার উত্তর অন্য কোনো গল্পে। আশিক কলম রাখল। বাইরে রাতের অন্ধকার। ভাওয়াল রাজবাড়ীর দিক থেকে কোনো শব্দ নেই।সেই রাজা — যে মরে গিয়েও ফিরে এসেছিল বলে গল্প আছে — সেও হয়তো কোনো গন্ধ খুঁজেছিল।কোনো পুরনো স্মৃতি। কোনো হারানো জায়গা। মানুষ সবসময় ফেরে। শরীরে না হলেও গল্পে। গল্পে না হলেও গন্ধে।
গন্ধ মানুষকে কখনো ভোলে না। চাঁদপুরের ব্যবসায়ী মানিক মিয়ার কাছে শোভার গন্ধ ছিল তার সবচেয়ে পুরনো স্মৃতি। দশকের পর দশক পেরিয়ে, জীবনের নানা মোড়ে, সেই গন্ধ বারবার ফিরে আসে — ভালোবাসার সবচেয়ে অদৃশ্য কিন্তু সবচেয়ে স্থায়ী রূপ।
0 Comments