তৃতীয় গল্প“আবুল হোসেন চৌধুরী মাইনাস লাভলী” প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি আবুল হোসেন চৌধুরী: যে মানুষ গান ছেড়েছিলইউসুফ আলী চৌধুরীর বাড়িতে সন্ধ্যায় প্রায়ই গান হতো।ছোটবেলায় আবুল এটা জানত না এটা বিশেষ কিছু। সন্ধ্যা হলে বাবা গাইতেন — ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, মাঝেমাঝে পুরনো বাংলা গান। গলায় একটা ভাঙা সুর ছিল ইউসুফ আলীর — পরিপূর্ণ নয়, কিন্তু সত্যিকারের। সেই গলায় কষ্ট ছিল, আনন্দ ছিল, আর একটা অদ্ভুত স্বীকারোক্তি ছিল — এই মানুষ জানে জীবন কঠিন এবং তারপরও গাইছে।আবুল পাশে বসে শুনত।সে নিজেও গাইত — গলা ছেড়ে, বেসুরো মাঝেমাঝে, কিন্তু উৎসাহী। ইউসুফ আলী হাসতেন। বলতেন, “গলা আছে। শেখালে হবে।”কিন্তু শেখানো হয়নি।কারণ গ্রামে গান শিখলে গান গাওয়া মানুষ হওয়া যায়, উকিল নয়।ইউসুফ আলী চৌধুরী গান গাইতেন কিন্তু জানতেন গান দিয়ে সংসার চলে না। তাঁর বাবা জমি চাষ করেছিলেন। তিনি নিজে ছোটখাটো ব্যবসা করেছেন। ছেলেকে দিয়ে কিছু একটা বড় করতে চেয়েছেন। বড় মানে প্রতিষ্ঠা, সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো।আবুল সেই স্বপ্নটা বুকে নিল।কিন্তু গানটা বুক থেকে নামিয়ে রাখতে গেলে একটা জায়গা লাগে। কোথায় রাখবে? মাটিতে? পানিতে?আবুল রেখেছিল নিজের ভেতরে — কোনো একটা গভীর জায়গায়, যেখানে আলো পৌঁছায় না। সেখানে গানটা থেকে গেছে। মরেনি। শুধু চুপ করে আছে।আইন পড়তে গেল ঢাকায়।ঢাকা তখন তার কাছে একটা বিশাল শব্দ — গ্রামের ছেলের কাছে এই শহর মানে সম্ভাবনা। সে মেসে থেকে পড়েছে, টিউশনি করেছে, ভোরে উঠে পড়েছে। কারণ একটাই — পিছিয়ে পড়লে চলবে না।আবুল হোসেন চৌধুরীর philosophy ছিল সহজ।জীবনে উপরে উঠতে হলে তাড়াতাড়ি করতে হয়। যে জিনিস যত দেরিতে করা হয় সে জিনিসে তত পিছিয়ে পড়া যায়। বিয়ে তাড়াতাড়ি করো, সংসার তাড়াতাড়ি স্থিতিশীল করো, তারপর কাজে মনোযোগ দাও।আইন পাস করল ১৯৯৩ সালে।বয়স একুশ।বাবা বিয়ের কথা তুললেন।ঘটক রহমত আলী এলো।দুটো নাম।রাহিমা — শ্যামলা, শিক্ষিত, গৃহস্থ।লাভলী — ফর্সা, অশিক্ষিত, একত্রিশ বছর বয়সী।একত্রিশ।একুশ বছরের আবুল হোসেন চৌধুরীর সামনে একত্রিশ বছরের মেয়ে।দশ বছরের ব্যবধান।কিন্তু রহমত আলী বলল গায়ের রঙের কথা।আবুল ভাবল — সুন্দর বউ মানে সমাজে মুখ। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে পাশে একটা উজ্জ্বল মুখ দরকার। লাভলীর বয়স বেশি — এটা সমস্যা নয়, বরং সুবিধা। লাভলীর বাবা মেয়ে বিয়ে দিতে মরিয়া — তাই যৌতুক দিচ্ছে। এক লাখ টাকা আর মোটরসাইকেল।এই হিসাবটা ঠান্ডা মাথায় করেছিল সে।রাহিমার কথা আর উঠল না।বিয়ে হলো।লাভলী এলো চৌধুরী বাড়িতে।প্রথম দিন থেকেই আবুল বুঝল — এই মেয়ে তার হিসাবের মধ্যে আটকাবে না।লাভলী স্বাধীন। তার নিজের মতামত আছে। সে দশ বছরের বড় — এবং এটা সে জানে। আবুলকে সে স্বামী হিসেবে মানে ঠিকই, কিন্তু প্রভু হিসেবে নয়।এটাই সমস্যা।আবুলের narcissism বলে — আমি যা চাই তাই হবে। আমি যা বলব তাই শুনবে। আমার সংসার আমার নিয়মে চলবে।লাভলীর স্বভাব বলে — আমি নিজের মতো থাকব।দুটো একসাথে চলে না।মা জোবেদা খাতুন দেখলেন।সকালে সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় বসতেন। লাভলী তখনো ঘুমাচ্ছে। রান্নাঘর ফাঁকা।জোবেদা খাতুন মানুষ হিসেবে সরল কিন্তু পরিশ্রমী। তিনি জীবনে অনেক করেছেন — শাশুড়ি সামলেছেন, স্বামীর সংসার টেনেছেন, ছেলেদের মানুষ করেছেন। ব্লাউজ পরতে ভালো লাগে না তাঁর — কাজে বাধা। সিগারেট না খেলে মাথা কাজ করে না। এই সরলতাটা তাঁর শক্তি।এই সরল মানুষটা লাভলীকে দেখলেন।আয়নার সামনে দাঁড়ানো।পাশের বাড়িতে গল্প করতে যাওয়া।রান্না না করা।জোবেদা খাতুন একটা কথাই বলতেন লাভলী বাপের বাড়ি থেকে ফিরলে — “খালেদা জিয়া চলে এসেছে।”এই কথাটা আবুল শুনত।হাসত।কারণ মা ঠিকই ধরেছেন।কিন্তু হাসির মধ্যে একটা বিরক্তিও ছিল।সে এই মহিলাকে বিয়ে করেছিল সুন্দর বলে।সুন্দর থাকল।কিন্তু সংসারে সুন্দর শুধু থাকলে হয় না।প্রথম বড় ঝগড়া হলো বিয়ের ছয় মাস পর।লাভলী চলে গেল।সেই রাতে আবুল একা বসে বুঝল নিজের দুর্বলতা কোথায়।সে পাঠাল লিগ্যাল নোটিশ।এই নোটিশ পাঠানোটা কৌশল — কিন্তু কৌশলের পেছনে একটা দুর্বলতা ছিল যেটা সে কাউকে বলেনি।লাভলী ফিরল।সাথে কালাম।সংসার আবার শুরু।তারপর সন্তান।সেই রাতের কথা আবুল কোনোদিন ভুলবে না।হাসপাতালে। একটা নিথর শরীর। ছোট। নিঃশব্দ।চৌধুরী পরিবার বলেছিল স্বাভাবিকভাবে হবে। টাকা খরচ করতে চায়নি। এই সিদ্ধান্তে আবুল কিছু বলেনি — সে তখনো পরিবারের কাঠামোর মধ্যে। বড়রা যা বলেন।কিন্তু সেই রাতে বসে বসে আবুল বুঝল — সে ভুল করেছে। কথা বলা উচিত ছিল।সে কাঁদল।এই কান্নাটা বিরল।আবুল হোসেন চৌধুরী সাধারণত কাঁদে না। সে হিসাব করে। সে কৌশল করে। কিন্তু সেই রাতে ছোট্ট কবরের পাশে সে শুধু একজন মানুষ ছিল।সেই মানুষটা — গান গাওয়া মানুষটা — একটু বের হয়েছিল।তারপর আবার ভেতরে চলে গেছে।আশিক জন্মাল ১৯৯৬ সালে।সেপ্টেম্বরের আট তারিখ।আবুলের বয়স তখন চব্বিশ।ছেলে দেখে তার মনে হলো — এই ছেলে এসেছে। এই ছেলে তার।এবং সত্যিই রোজগার বাড়তে লাগল।মামলা বাড়ল। পরিচিতি বাড়ল। ইউসুফ আলী জমি কিনলেন আলাদা — যৌথ পরিবার থেকে বের হওয়ার সময় হয়েছে।আকাশ এলো ১৯৯৯ সালে।অক্টোবরের চৌদ্দ।দুই ছেলে।নতুন বাড়ি।আর তখন থেকেই সমস্যা অন্য রূপ নিল।কারণ নতুন বাড়িতে লাভলীর ক্ষমতা।জোবেদা খাতুনের চোখ নেই। “খালেদা জিয়া” বলার মানুষ নেই।লাভলী এই ঘরের রানী।আবুল দেখল — লাভলী ছেলেদের মারছে।সে প্রথমে এড়িয়ে গেছে। সে কাজে ব্যস্ত। ফোকাস করলে বাকি সব ভুলে যায় — এটা তার স্বভাব।কিন্তু একদিন আশিকের পিঠে দাগ দেখল।জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”আশিক বলল, “কিছু না।”আবুল বুঝল।কিন্তু বলল না কিছু।কারণ লাভলীকে বললে আরেক ঝগড়া। ঝগড়া হলে সংসার অশান্ত। সংসার অশান্ত হলে কাজে মনোযোগ থাকে না।এই হিসাবটা নিষ্ঠুর। কিন্তু আবুল হোসেন চৌধুরী এইভাবেই সিদ্ধান্ত নেয়।বেলায়েতের বিষয়টা সে কখন জানল — ঠিক বলা কঠিন।হয়তো দেরিতে জেনেছে।হয়তো জানার পরেও এড়িয়ে গেছে — কারণ এটা স্বীকার করলে তার নিজের মুখ কালো হয়।উকিল মানুষ — ঘরে স্ত্রীকে সামলাতে পারেনি, এই কথা জানাজানি হলে সমাজে কী হবে?তাই চুপ।কিন্তু এই চুপটা একটা বিষ হয়ে জমছিল।ইউসুফ আলী চৌধুরী তখন অসুস্থ।আর্থরাইটিস।তিনি এক্সপেরিমেন্টাল ওষুধ নিলেন — জমির বর্গার টাকা খরচ করে।এই সিদ্ধান্তটা আবুল বুঝেছিল তখন কিন্তু থামায়নি।কারণ বাবাকে থামানো কঠিন।ইউসুফ আলী চৌধুরী যে সিদ্ধান্ত নেন সেটা নেন।কিন্তু ওষুধ কাজ করল না।শরীর দুর্বল হলো।ধীরে ধীরে অবশ।বিছানায় পড়লেন।আবুল বাবাকে দেখতে যেত।বাবা শুয়ে আছেন। একসময় যে মানুষ সন্ধ্যায় গান গাইতেন, যার ভাঙা গলায় ভাটিয়ালি বাজত — সে মানুষ এখন বিছানায়।আবুল বসত পাশে।কথা হতো কম।কিন্তু একদিন ইউসুফ আলী বললেন, “গানটা ছেড়ে দিসনি তো?”আবুল বলল, “ছেড়ে দিয়েছি।”ইউসুফ আলী কিছু বললেন না।শুধু একটু চুপ করে থাকলেন।সেই চুপটার মধ্যে অনেক কথা ছিল।আট বছর পর ইউসুফ আলী মারা গেলেন।২০০৬-২০০৭ সালের দিকে।আবুল কবর দিল।ফিরে এলো।জীবন থামে না।মতিঝিলে তার নাম হয়েছে। বড় মামলা আসছে।কিন্তু বাড়িতে লাভলীর সাথে দূরত্ব বাড়ছে।আবুল এখন মধ্যবয়স্ক।যে জীবন সে তৈরি করেছে — টাকা, ক্ষমতা, সমাজে সম্মান — সেটা আছে।কিন্তু একটা জায়গা ফাঁকা।সে বুঝতে পারে না কীসের ফাঁকা।হয়তো সেই গানের জায়গা।হয়তো সেই রাতের কথা যেদিন একটা ছোট্ট কবরের পাশে কেঁদেছিল।মার্চ মাসের এক বিকেলে সে ধানমন্ডি লেকের পাশে বসেছিল।আশিক হাসান এসে বসল।“যেন একজন মেয়েরও বাবা।”চলে গেল।সেইদিনই ফারজানার ফোন।ফারজানা এলো পরদিন।নীল শাড়ি। বাঁধা চুল। স্থির চোখ।আবুল তাকে দেখল।তারপর শুনল।দেনমোহর চাই। বিল্ডিং বানাবে।এই মহিলা নিজের জন্য কিছু চাইছে।নিজের আত্মা।আবুল হঠাৎ বুঝল — সেও একটা আত্মা চাইছিল।কিন্তু সে আত্মা তৈরি করেছে টাকা দিয়ে, মানুষের সাথে সম্পর্ক দিয়ে নয়।ফারজানার সাথে কথা বলতে বলতে একটা উষ্ণতা এলো।এই উষ্ণতা চেনা।এটা সেই গানের মতো — অনেকদিন ছিল না, হঠাৎ ফিরে এসেছে।সম্পর্ক গভীর হলো।তারপর ফারজানা বলল — বাচ্চা হবে না।সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।আবুল চুপ করে রইল।এই চুপটার মধ্যে একটা বেদনা ছিল যেটা সে প্রকাশ করেনি।সেই ছোট্ট কবরটার কথা মনে এলো।কিন্তু সে এগিয়ে গেল।পেছনে না তাকিয়ে।লাভলীকে সরাতে হবে।পরিকল্পনা শুরু হলো।আশিককে ব্যবহার করবে।নিজের ছেলেকে।এই সিদ্ধান্তে কি তার মনে কোনো দ্বিধা ছিল?হ্যাঁ।ছিল।কিন্তু আবুল হোসেন চৌধুরী দ্বিধাকে হিসাবের নিচে চাপা দেয়।হিসাব বলছে — আশিক ইতিমধ্যে মায়ের বিরুদ্ধে। আশিক যা দেখেছে, যা সহ্য করেছে — সে মায়ের পক্ষে নেই। তাকে শুধু একটা দিক দেখাতে হবে।তারপর স্বর্ণের ঘটনা হলো।কালাম-আশাদের সাথে গেল।দেখল তার শালারা কী পারে।কিন্তু স্বর্ণ ফিরল না পুরোটা।ছবির কথা মাথায় রইল।আবুল চুপ করে থাকল।একটা রাতে চেম্বারে একা বসে সে ভাবল।কালাম-আশাদ শক্তি দেখাতে পারে।কিন্তু শক্তি দিয়ে সব হয় না।তার শক্তি — রোজগার। এটাই তার হাতিয়ারর।এবং আশিক।আশিক কালামকে মেরেছে।আশিক বাবার পাশে দাঁড়িয়েছে।এই ছেলে।এই ছেলেই পারবে।আবুল সেই রাতে একটা সিদ্ধান্ত নিল।সে একা নয়।তার পাশে তার ছেলে আছে।আর যে মানুষের পাশে তার ছেলে আছে — সে হারে না।কিন্তু রাতের শেষে, যখন সব চিন্তা থেমে যায়, ঘরে অন্ধকার, বাইরে ঢাকার শব্দ — তখন মাঝেমাঝে একটা সুর আসে।ভাটিয়ালি।বাবার গলায়।সেই ভাঙা, সত্যিকারের গলায়।আবুল চোখ বন্ধ করে।সুরটা একটু শোনে।তারপর ঘুমিয়ে পড়ে। দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি লাভলী: আয়নার সামনে যে মানুষলাভলী জন্মেছিল ১৯৬২ সালের শেষ দিনে।ডিসেম্বরের একত্রিশ।বছরের শেষ দিন।এই তারিখটা তার কাছে সবসময় বিশেষ মনে হয়েছে — যেন সে বছরের সব কিছু শেষ করে এসেছে, নতুন বছরের প্রথম মানুষ হওয়ার একটু আগে।লাভলীর গায়ের রঙ ছিল উজ্জ্বল।ছোটবেলায় সবাই বলত — “এই মেয়ে বড় হলে কত সুন্দর হবে।”সে বড় হলো।সুন্দর হলো।এবং বুঝল — সুন্দর হওয়া একটা মূলধন। এই মূলধন দিয়ে অনেক কিছু করা যায়। মানুষ তার দিকে তাকায়। পুরুষরা সরে যায় পথ থেকে। মহিলারা হিংসা করে।এই মনোযোগটা লাভলীর কাছে একটা উষ্ণতার মতো।সে আয়নার সামনে দাঁড়াত।দেখত।নিজেকে।এটা vanity ছিল? হ্যাঁ। কিন্তু এর পেছনে ভয়ও ছিল — একদিন এই সৌন্দর্য যাবে। সময় নেবে। তখন মানুষ আর তাকাবে না।তাই প্রতিদিন দেখো। প্রতিদিন নিশ্চিত হও — এখনো আছে।এই ভয়টাই লাভলীকে আয়নার সামনে আটকে রেখেছে।কিন্তু বিয়ে হচ্ছিল না।পঁচিশ। ছাব্বিশ। সাতাশ। আটাশ।মেয়েদের জন্য এই বয়সগুলো ছিল সংকটের।লাভলীর বাবা চিন্তিত।কয়েকটা সম্বন্ধ এসেছিল — কেউ রাজি হয়নি পুরোপুরি, কারণ লাভলীকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন বলে নাম রটে গিয়েছিল। সে নিজের মতে চলে। কারো কথা শোনে না।এটা সত্য।লাভলী কারো কথা শুনত না।কারণ সে বুঝেছিল — কথা শুনলে মানুষ দুর্বল মনে করে। দুর্বল মনে করলে সুযোগ নেয়।তাই সে শক্ত থাকে। নিজের মতে চলে।একত্রিশে রহমত আলী ঘটক এলো।একটা ছেলের কথা বলল — একুশ বছরের। সদ্য আইন পাস।দশ বছরের ছোট।লাভলী ভাবল।ছোট মানে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ।এটাই তার হিসাব ছিল।কিন্তু সে ভুল ভেবেছিল।আবুল ছোট কিন্তু জেদী।বিয়ে হলো।চৌধুরী বাড়িতে এলো।শাশুড়ি জোবেদা খাতুন তাকে সকাল থেকেই পছন্দ করলেন না।লাভলী বুঝল।কিন্তু পরোয়া করল না।এই বাড়িতে টিকে থাকতে হবে।টিকে থাকার উপায় — ক্ষমতা দেখানো।সে ক্ষমতা দেখাল।রান্নাঘরে ঢুকল মন হলে। না হলে না।সকালে উঠল দেরিতে।আয়নার সামনে সময় কাটাল।জোবেদা খাতুন বললেন, “খালেদা জিয়া চলে এসেছে।”লাভলী শুনল।মুখে কিছু বলল না।কিন্তু মনে রাখল।এই বাড়িতে থাকা মানে প্রতিদিন যুদ্ধ।তারপর নতুন বাড়ি হলো।আলাদা।লাভলী স্বস্তির শ্বাস নিল।এই বাড়িতে জোবেদা খাতুন নেই।এই বাড়িতে সে রানী।কিন্তু রানী হওয়াটা একটু ভিন্ন অর্থ নিল।ছেলেরা জন্মাল।আশিক ১৯৯৬ সালে। আকাশ ১৯৯৯ সালে।লাভলীর বয়স আশিক জন্মানোর সময় চৌত্রিশ।তাকে মা ডাকছে কেউ।এটা একটা নতুন পরিচয়।কিন্তু মাতৃত্ব লাভলীর কাছে যেভাবে আসার কথা ছিল সেভাবে আসেনি।সে ছেলেদের ভালোবাসে — হ্যাঁ।কিন্তু ভালোবাসার ভাষা সে শেখেনি।তার মা তাকে যেভাবে ভালোবেসেছে — চাওয়া মেটানো, খাওয়ানো, মারা — সেভাবেই সে ভালোবাসতে জানে।মারা মানে শাসন।শাসন মানে সন্তান ঠিক থাকবে।এই যুক্তিটা সে নিজেকে দিত।কিন্তু আসল কারণ অন্য।আবুল বাইরে থাকে। কাজে ডুবে থাকে। বাড়িতে এলে কথা কম বলে। লাভলীর কথা শোনে না।এই অবহেলা লাভলীকে একটা ক্রোধে পরিণত করে।ছেলেরা কাছে আছে।ছেলেরা পালাতে পারে না।তাই তারা এই ক্রোধের উত্তাপ পায়।লাভলী এটা ভুল করছে বুঝত।কিন্তু থামাতে পারত না।কারণ থামার শক্তি কোথা থেকে আসবে? যে মানুষ কখনো তাকে বলেনি “তুমি ভালো” — সে মানুষ কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবে?বেলায়েত আসত।আবুলের ছোট ভাই।বয়সে তরুণ।লাভলী তখন ত্রিশের মাঝামাঝি। আবুলের থেকে বয়সে বড়, কিন্তু সমাজে ছোট — কারণ বউয়ের অবস্থান এই সমাজে সবসময় নিচে।বেলায়েত এলো।লাভলীর সাথে কথা বলল।লাভলী অনুভব করল — এই মানুষ তার কথা শোনে।এখানেই সমস্যা।লাভলীর কাছে মনোযোগই ভালোবাসা।যে মনোযোগ দেয়, তার কাছে লাভলী যায়।বেলায়েত মনোযোগ দিল।লাভলী গেল।একটা সীমা পার হলো।আশিক ছোট ছিল।কিন্তু বাড়ির পরিবেশ বুঝত।একদিন বেলায়েত তাকে সতর্ক করল।লাভলী সেই মুহূর্তে চোখ সরিয়ে নিল।এই চোখ সরানো লাভলীর সবচেয়ে বড় পাপ।সন্তানকে রক্ষা করেনি।এই পাপ সে বহন করে — প্রতিদিন, আয়নার সামনে দাঁড়ালে।আয়নায় যে মুখ দেখে — সেই মুখে এই ভার আছে।কিন্তু সে স্বীকার করে না।কারণ স্বীকার করা মানে ভাঙা।লাভলী ভাঙতে চায় না।সে শক্ত থাকতে চায়।তারপর আবুলের পরকীয়ার কথা জানল।কীভাবে জানল — পাড়ার কেউ বলেছে, হয়তো রিনার কাছ থেকে কোনো ইঙ্গিত।লাভলী জানল।এই জানাটা তার ভেতরে কী করল?কষ্ট।কিন্তু কষ্টের ধরনটা অদ্ভুত।আবুলকে সে কোনোদিন ভালোবাসেনি — সেই অর্থে। কিন্তু আবুল তার সংসার। তার ক্ষমতার কেন্দ্র। তার পরিচয়।এই মানুষ অন্য কারো দিকে গেলে মানে — লাভলীর পরিচয় নষ্ট হচ্ছে।এবং সবচেয়ে বড় কথা —ফারজানা তার চেয়ে কম সুন্দর।এটাই সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লাভলী নিজেকে দেখল।আমি কি কম হয়ে গেছি?এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে গিয়ে সে একটা ভুল করল।রহমান রং মিস্ত্রী।রবিউল।লাভলী বুঝেছিল এটা বিপজ্জনক।কিন্তু সে নিজেকে প্রমাণ করতে চেয়েছিল।আমি এখনো আছি।আমাকে এখনো চাওয়া হয়।সব স্বর্ণ পরল।বোরকার ভেতরে।গেল।রবিউল ছবি তুলল।স্বর্ণ রাখল।লাভলী ফিরে এলো।বোরকার নিচে কিছু নেই।সেই রাতে লাভলী আয়নার সামনে দাঁড়াল না।প্রথমবারের মতো।কারণ আয়নায় কী দেখবে?সব স্বর্ণ গেছে।ছবি আছে কোথাও।সংসার যাচ্ছে।ছেলেরা বাবার দিকে সরে যাচ্ছে।লাভলী বিছানায় বসল।একা।তার ভাই কালাম এলো। আশাদ এলো। আবুলও গেল।রবিউলকে মারল।স্বর্ণ ফিরল না পুরোটা।ছবির কথা কেউ বলল না।লাভলী জানে ছবি আছে।এই ছবিটা এখন তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।সে যা হারিয়েছে — স্বর্ণ, ছেলেদের বিশ্বাস, সংসারের স্থিতি — সেটা কি ফেরে?একদিন লাভলী আবার আয়নার সামনে দাঁড়াল।দেখল।সেই উজ্জ্বল চামড়া এখনো আছে।কিন্তু চোখে এখন একটা ক্লান্তি।সে জানে এই সংসার শেষ হয়ে আসছে।কিন্তু সে যাবে না।এই সংসার তার।এই ছেলেরা তার।লড়াই করবে।কারণ লাভলী শক্ত থাকতে জানে।এটাই তার সবচেয়ে বড় গুণ।এটাই তার সবচেয়ে বড় ক্ষত। তৃতীয় দৃষ্টিভঙ্গি আশিক চৌধুরী: যে শিখেছিল শক্তই থাকতে হয়আশিক জন্মেছিল ১৯৯৬ সালের আট সেপ্টেম্বর।সেপ্টেম্বরে ঢাকায় বর্ষা শেষ হয়।আকাশ পরিষ্কার হতে থাকে।মেঘ সরে যায়।কিন্তু আশিকের জীবনে মেঘ সরেনি।মেঘ জমেছিল।বছরের পর বছর।শৈশবের প্রথম স্মৃতিগুলো হলো — মায়ের হাত। সেই হাত কখনো মাথায় বুলিয়ে দিয়েছে, কখনো খাইয়ে দিয়েছে, কখনো জামা পরিয়ে দিয়েছে।কিন্তু সেই হাত কখনো আচমকা এসে পড়েছে।কারণ ছাড়া।কারণ আছে হয়তো — আশিক বুঝতে পারেনি কারণটা। পড়েনি, খায়নি, শোনেনি। কিন্তু কারণের সাথে মারের অনুপাত কখনো মিলত না।আশিক একটা জিনিস শিখল।মা অনিশ্চিত।মায়ের কাছে নিরাপদ নয়।এই শিক্ষা একটা শিশুর কাছে ভয়ংকর।কারণ মা মানেই হওয়ার কথা নিরাপত্তা।সেটা নেই।তাহলে নিরাপত্তা কোথায়?আশিক খুঁজল।বাবার কাছে পেল একটু — আবুল মারত না। ব্যস্ত থাকত, কথা কম বলত, কিন্তু মারত না।না মারাটাই আশিকের কাছে ভালোবাসার সংজ্ঞা হয়ে গেল।বাবা মারে না মানে বাবা ভালো।এই সরলীকরণ একটা শিশুর যুক্তি।কিন্তু এই যুক্তিই আশিকের পুরো জীবনের আত্মা।বেলায়েত চাচা আসত।আশিক ছোট ছিল।কিন্তু ঘরের পরিবেশ বদলে যেত বেলায়েতের আসলে।মা আলাদা হয়ে যেত।আশিক বুঝতে পারত কিছু একটা ঠিক নেই।একদিন বেলায়েত তার দিকে তাকাল।সেই চোখটা।“কিছু বললে দেখিস।”আশিক মায়ের দিকে তাকাল।মা চোখ সরিয়ে নিল।এই মুহূর্তটা।এই একটা মুহূর্ত আশিকের সবকিছু বদলে দিল।মা রক্ষা করে না।মা নিজেকে বাঁচায়।আশিক একটা বর্ম তৈরি করল।শক্ত, ঠান্ডা।কম কথা বলে।কম অনুভব করে।ব্যথা পেলে মুখ বন্ধ রাখে।কারণ ব্যথা দেখালে দুর্বল মনে হয়।দুর্বল মানুষকে সবাই সুযোগ নেয়।আকাশ ছোট ভাই।আকাশ একটু নরম।আশিক আকাশকে সামলায়।কারণ আকাশকে সামলানো তার দায়িত্ব মনে হয়।মা সামলাবে না।বাবা সময় পাবে না।সে সামলাবে।এই দায়িত্ববোধটা আশিকের বয়সের চেয়ে বড়।স্কুলে আশিক মারামারিতে জড়াত।শিক্ষক বলত ছেলেটা রাগী।কিন্তু আশিক রাগী নয়।আশিক শুধু জানে — ঘুষি মারা মানে বলা “আমাকে ছোট করো না।”ঘরে যে কথা বলতে পারত না, মাঠে বলত।মা একদিন জানল আবুলের পরকীয়ার কথা।আশিক দেখল মায়ের মুখ বদলে গেল।কিন্তু আশিক মায়ের জন্য কাঁদল না।কারণ মা তার জন্য কাঁদেনি কোনোদিন।তারপর রবিউলের ঘটনা।স্বর্ণ গেল।মামারা রবিউলকে মারল।আশিক দেখল।এই মারামারিতে একটা শূন্যতা ছিল।কারণ এই মারামারিতে কেউ সত্যিকারের লড়াই করছে না।কালাম মারছে রাগে।আশাদ মারছে হিসাবে।কেউ মারছে না সত্যের জন্য।আশিক বাইরে দাঁড়িয়ে দেখল।বাবাকে দেখল।বাবা চুপ করে দেখছে।এই চুপটার মধ্যে একটা হিসাব আছে।আশিক বুঝল।বাবা তাকে ব্যবহার করতে চায়।এটা কি ঠিক? ভুল?আশিক এই প্রশ্ন করল না।সে শুধু জানল — বাবার সাথে থাকলে সে নিরাপদ।মায়ের সাথে থাকলে নয়।এটুকুই।আশাদ একদিন এলো।“তোমার বাবা কী করছে জানো?”“জানি।”“তাহলে মায়ের পক্ষে দাঁড়াও।”আশিক তার মামার দিকে তাকাল।এই মানুষটার চোখে কী আছে?উদ্বেগ? নাকি হিসাব?“মামা,” আশিক বলল, “আমার মা আমাকে মেরেছে। আপনি কোন মায়ের পক্ষে বলছেন?”আশাদ কিছু বলতে পারল না।চলে গেল।কালাম এলো।পেছনে মানুষ।বাবার চেম্বারের বাইরে।আশিক সেখানে ছিল।সে বাবাকে ফলো করে এসেছিল — বাবা একা বের হলে সে মাঝেমাঝে দেখে।বাবার কাছে তার দায়িত্ব আছে।কালাম এগিয়ে এলো।আশিক বাবার সামনে দাঁড়াল।তারপর যা করল।সে মারল।বছরের পর বছর জমানো সব কিছু বের হলো।মায়ের মারের উত্তর।বেলায়েতের হুমকির উত্তর।সেই চোখ সরানোর উত্তর।সব।মারামারি শেষে আশিক দাঁড়িয়ে।সামনে কালাম, আশাদ, কয়েকজন।পেছনে বাবা।আশিক বাবার দিকে ফিরল না।সে সামনে তাকিয়ে রইল।বাবা তার পাশে আসল।কিছু বলল না।শুধু পাশে দাঁড়াল।এটুকুই আশিকের যথেষ্ট।আশিকের রোমান্টিসিজম হলো শক্তি।শুধু শক্তি।যে শক্তিশালী সে বেঁচে থাকে।যে দুর্বল সে হারে।তার মা দুর্বল ছিল — ভেতরে।তার বাবা শক্তিশালী — হিসাবে।আশিক শক্তিশালী হতে চায় — অন্যভাবে।সে কীভাবে?এখনো বের করেনি।কিন্তু একটা জিনিস জানে।সে আর মার খাবে না।কাউকে মার খেতে দেবে না।এটুকু। চতুর্থ দৃষ্টিভঙ্গি ফারজানা: যে বিল্ডিং বানাতে চেয়েছিলফারজানার প্রথম বিয়েটা মনে থাকে একটা ঘরের মতো।ঘরে ঢুকেছিল। ঘর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ভেতরে বাতাস ছিল না।স্বামী মানুষ হিসেবে খারাপ ছিল না।কিন্তু তার কাছে ফারজানার মানে ছিল — একটা জিনিস।তার মতামত নেওয়ার দরকার নেই।তার স্বপ্ন শোনার দরকার নেই।শুধু থাকুক।ফারজানা থাকেনি।তালাক হলো।বাচ্চা ছিল না।ভালো হয়েছিল।কারণ সেই ঘরে বাচ্চা হলে বেরোনো আরো কঠিন হতো।তালাকের পর ফারজানা একটা সিদ্ধান্ত নিল।নিজের বিল্ডিং বানাবে।এই বিল্ডিংটা তার কাছে রূপক নয়।আক্ষরিক অর্থে।একটা জমি কিনবে। একটা বিল্ডিং তুলবে। সেই বিল্ডিংয়ের একটা ফ্ল্যাটে থাকবে। বাকিগুলো ভাড়া দেবে।তাহলে কারো কাছে হাত পাততে হবে না।কারো মুখের দিকে তাকাতে হবে না।নিজের জায়গা। নিজের আত্মা।এই স্বপ্নটা তার রোমান্টিসিজম।প্রথম বিয়েতে দেনমোহর পায়নি।মামলা করবে।রিনা আপার কাছ থেকে নাম পেল — আবুল হোসেন চৌধুরী।ভালো উকিল।গেল।চেম্বারে বসল।আবুলকে দেখল।মাঝবয়স্ক। কালো কোট। টেবিলে ফাইল।সে কথা বলল।আবুল শুনল।মনোযোগ দিয়ে।এই মনোযোগটা ফারজানার কাছে অপরিচিত।আগের স্বামী শুনত না।এই উকিল শুনছে।কিন্তু ফারজানা বোকা নয়।সে জানে এটা পেশাদার মনোযোগ।কাজের জন্য শোনা।কিন্তু কাজের মনোযোগও তার কাছে মূল্যবান।মামলা এগোতে লাগল।আসা-যাওয়া হতে লাগল।কথা বাড়ল।একদিন আবুল বলল, “আপনার চোখে ক্লান্তি আছে।”ফারজানা থামল।“দেখলেন কীভাবে?”“দেখি।”এই দেখাটা আলাদা।পেশাদার নয়।এই মুহূর্তে আবুল শুধু উকিল নয়।ফারজানা সাবধান হলো।কিন্তু রিনা আপা একদিন বলল, “তুমি কি আবুল ভাইকে পছন্দ করো?”ফারজানা সরাসরি উত্তর দিল না।কারণ পছন্দ আর প্রয়োজন এই দুটো আলাদা।সে কি আবুলকে পছন্দ করে?হয়তো।সে কি আবুলকে প্রয়োজন?না।কিন্তু আবুলের সাথে যদি একটা ভবিষ্যৎ হয় — তাহলে সেই বিল্ডিংয়ের স্বপ্ন আরো সহজ হয়।এটা হিসাব।ফারজানার রোমান্টিসিজম এবং হিসাব একসাথে চলে।রিনার বাসায় সেই বিকেলে যা হলো।ফারজানা জানত এই পথে গেলে কোথায় যাবে।সে গেল।তারপর একটা সমস্যা।সে সিদ্ধান্ত নিল।বাচ্চা হবে না।আবুল চুপ করে রইল।ফারজানা এই চুপটা বুঝল।আবুলের মনে কিছু একটা আছে — একটা হারানো কিছু। সেই প্রথম মৃত সন্তানের কথা সে কখনো বলেনি কিন্তু ফারজানা অনুভব করেছে।এই মানুষটা ভেতরে কোথাও নরম।কিন্তু বাইরে শক্ত।ফারজানা ভাবল — আমি কি এই মানুষটাকে নরম করতে পারব?হয়তো।কিন্তু আগে নিজের বিল্ডিং।আগে নিজের আত্মা।পরিকল্পনা চলছে।লাভলীকে সরাতে হবে।ফারজানা রিনার সাথে বসে কথা বলে।কিন্তু ফারজানার মনে একটা প্রশ্ন আছে।এই পথে গেলে — লাভলীর ছেলেরা একদিন কী ভাববে?আশিক। আকাশ।এই ছেলে দুটো তার সৎ ছেলে হবে যদি বিয়ে হয়।তারা কি মেনে নেবে?ফারজানা জানে না।কিন্তু অপেক্ষা করছে।তার বিল্ডিংয়ের জন্য।তার নিজের আত্মাের জন্য।পঞ্চম দৃষ্টিভঙ্গিরিনা: যে সংযোগ বানায়রিনার মেয়ে সাদিয়া।সাদিয়াকে দেখলে রিনার বুকে একটা তৃপ্তি আসে।সাদিয়া সুন্দর। মায়ের মতো নয় পুরোপুরি — রিনা সাধারণ দেখতে — কিন্তু বাবার কিছু আছে।রিনার স্বামী মানুষ হিসেবে কথা নেই।কিন্তু রোজগার কম।সাদিয়ার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে।রিনা ভাবে।মেয়ের বিয়ে কোথায় হবে?ভালো পরিবারে।ভালো পরিবার মানে — টাকা, প্রতিষ্ঠা, সমাজে মাথা।চৌধুরী পরিবার।আবুল হোসেন চৌধুরী উকিল। তার বড় ছেলে আশিক।আশিক বড় হচ্ছে। একদিন ব্যারিস্টার হবে — লাভলীর স্বপ্ন।সেই ছেলে যদি সাদিয়ার স্বামী হয়।তাহলে সাদিয়ার জীবন নিশ্চিত।এই স্বপ্নটা রিনার রোমান্টিসিজম।সন্তানের জন্য স্বপ্ন দেখা — এর চেয়ে বড় রোমান্টিসিজম কী আছে?কিন্তু স্বপ্ন পূরণ করতে হলে কৌশল লাগে।রিনার কৌশল হলো সংযোগ।মানুষকে মানুষের সাথে জোড়া দাও।প্রথম সুতো — লাভলীর কাছে কাজের মেয়ে পাঠানো।লাভলী কাজ করতে পছন্দ করে না। কাজের মেয়ে দরকার। রিনার কাছে সাপ্লাই আছে।এটা দিয়ে সম্পর্ক শুরু।সম্পর্ক থাকলে বাড়িতে যাওয়া যায়।বাড়িতে গেলে ছেলেদের দেখা যায়।দেখা হলে পরিচয় হয়।এই পরিকল্পনায় দশ বছর লাগবে।রিনা অপেক্ষা করতে পারে।দ্বিতীয় সুতো — ফারজানাকে আবুলের কাছে পাঠানো।ফারজানা আবুলের কাছে গেলে তাদের মধ্যে কিছু হতে পারে।যদি হয় — তাহলে আবুল তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে।কৃতজ্ঞ মানুষ সাহায্য করে।সাহায্য মানে আশিক-সাদিয়ার বিয়ে সহজ হবে।এই হিসাব সে করেছে।কিন্তু হিসাবের বাইরে একটা জিনিস।রিনা সত্যিই চায় সাদিয়া সুখী হোক।এটা শুধু কৌশল নয়।এটা মায়ের ভালোবাসা।ভালোবাসা আর কৌশল একসাথে চলতে পারে।রিনার ক্ষেত্রে চলে।লাভলীর স্বর্ণ চলে যাওয়ার পর।রবিউলের ঘটনার পর।রিনা বুঝল — পরিস্থিতি জটিল হয়ে যাচ্ছে।আবুল চাপে আছে।লাভলী চাপে আছে।এই সময়ে তাকে সাবধান থাকতে হবে।কারণ ঝামেলায় পড়লে সাদিয়ার ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে পড়বে।সে একটু পিছিয়ে গেল।অপেক্ষা করছে।সব ধুলো বসুক।তারপর আবার সুতো টানবে।রিনার রোমান্টিসিজম ধৈর্যের।ধৈর্য মানে — জানো কী চাও। জানো কীভাবে পাবে। অপেক্ষা করো।সে অপেক্ষা করছে।সাদিয়াও বড় হচ্ছে।একদিন মিলবে।ষষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গিজোবেদা খাতুন: সিগারেটের ধোঁয়ায় জীবনজোবেদা খাতুন সকালে উঠে প্রথম কাজ করেন সিগারেট ধরানো।এটা অভ্যাস।কতদিন ধরে এই অভ্যাস — মনে নেই।কিন্তু সিগারেট না খেলে মাথা কাজ করে না।মানুষ হাসে। বলে “মহিলা সিগারেট খায়।”জোবেদা খাতুন পরোয়া করেন না।তিনি বেঁচে আছেন নিজের মতো।ব্লাউজ পরতে ভালো লাগে না — কাজে বাধা। তাই পরেন না বাড়িতে।কেউ দেখলে দেখুক।এই সরলতাটাই তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ।জোবেদা খাতুন জীবনে অনেক কিছু দেখেছেন।স্বামী ইউসুফ আলী চৌধুরী বিছানায় পড়লেন।আট বছর।নয় বছর।এই আট-নয় বছর তিনি সব সামলেছেন।স্বামীর সেবা। ছেলেদের সংসার। নাতিদের মুখ।সকালে সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় বসতেন।একদিন লাভলী বাপের বাড়ি থেকে ফিরছে দেখলেন।বললেন, “খালেদা জিয়া চলে এসেছে।”এই কথাটার মানে তিনি নিজেও পুরো বুঝতেন না।শুধু মনে হতো — এই মেয়ে শক্ত।কিন্তু শক্ত মানে ভালো নয় সবসময়।শক্ত মানে নিজের জন্য শক্ত।অন্যের জন্য নয়।লাভলী ছেলেদের মারে — এটা জোবেদা খাতুন দেখেছেন।একদিন বললেন, “লাভলী।”লাভলী তাকাল।“ছেলেরা বড় হলে মনে রাখবে। সাবধান।”লাভলী কিছু বলল না।চলে গেল।জোবেদা খাতুন সিগারেটে টান দিলেন।ধোঁয়া ছাড়লেন।ইউসুফ আলী চলে যাওয়ার পর।তিনি একা।ছেলেরা আছে — কিন্তু সবার নিজের সংসার।সকালে সিগারেট ধরান।বারান্দায় বসেন।দেখেন।আশিক মাঝেমাঝে আসে।এই ছেলে তাঁর কাছে আসে।নাতি।আশিক চুপচাপ বসে।জোবেদা খাতুন চুপচাপ থাকেন।দুজনে কথা কম বলে।কিন্তু পাশে থাকে।একদিন আশিক বলল, “দাদিমা, তুমি কীভাবে একা থাকো?”জোবেদা খাতুন বললেন, “একা না। আমার সিগারেট আছে।”আশিক হাসল।বিরল হাসি।জোবেদা খাতুন সেই হাসিটা দেখলেন।বললেন, “তুই তোর বাবার মতো।”“মানে?”“মানে — শক্ত বাইরে। ভেতরে নরম।” তিনি ধোঁয়া ছাড়লেন। “তোর বাবা ছোটবেলায় গান গাইত।”আশিক অবাক হলো।“বাবা?”“হ্যাঁ। ভালো গাইত।”“এখন কেন গায় না?”জোবেদা খাতুন একটু চুপ করে থাকলেন।“কারণ সে মনে করেছে গান গাওয়া মানুষ উপরে উঠতে পারে না।”আশিক কিছু বলল না।জোবেদা খাতুন আবার সিগারেটে টান দিলেন।“তুই কী করবি?”আশিক বলল, “জানি না।”“ভালো। যে জানে না সে খোঁজে। যে মনে করে জানে সে থেমে যায়।”এটাই জোবেদা খাতুনের জ্ঞান।জীবনের অনেকটা দেখে, অনেক সামলে, সকালে সিগারেটের ধোঁয়ায় তৈরি।তিনি এই পরিবারের সবকিছু দেখেছেন।আবুলের উঠে আসা।লাভলীর ক্ষমতা।ছেলেদের কষ্ট।ইউসুফ আলীর ধীরে ধীরে চলে যাওয়া।এই সব দেখেছেন।কিন্তু কাউকে থামাননি।কারণ জোবেদা খাতুন জানেন — মানুষ নিজের পথ নিজে বেছে নেয়।বাইরে থেকে থামানো যায়।কিন্তু থামলে মানুষ শেখে না।নিজে পড়লেই উঠতে শেখে।এটাই তাঁর দর্শন।সিগারেটের ধোঁয়ায় মিলিয়ে যাওয়া দর্শন।সপ্তম দৃষ্টিভঙ্গিইউসুফ আলী চৌধুরী: যে সন্ধ্যায় গাইতইউসুফ আলী চৌধুরীর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল সেই ডাক্তারের কথা বিশ্বাস করা।কিন্তু সে সময়ে সেটা ভুল মনে হয়নি।আর্থরাইটিসের ব্যথা যখন এতটাই বাড়ল যে রাতে ঘুমানো যায় না, হাঁটা যায় না — তখন কেউ এলো বলল নতুন ওষুধ আছে। এক্সপেরিমেন্টাল। ফলাফল দেবে।ইউসুফ আলী বিশ্বাস করলেন।জমির বর্গার টাকা দিলেন।ওষুধ নিলেন।শুরুতে একটু ভালো মনে হলো।তারপর শরীর দুর্বল হতে লাগল।তারপর বিছানা।আট বছর।নয় বছর।বিছানায় শুয়ে ইউসুফ আলী ভাবতেন।তাঁর জীবনের হিসাব।তিনি কী চেয়েছিলেন?ছেলেরা ভালো থাকুক।ছেলেরা ভালো আছে?আবুল উপরে উঠেছে। টাকা আছে। নাম আছে।কিন্তু ছেলেটা গান গায় না আর।এটাই ইউসুফ আলীর সবচেয়ে বড় দুঃখ।তিনি একদিন আবুলকে বলেছিলেন — “গানটা ছেড়ে দিসনি তো?”আবুল বলেছিল, “ছেড়ে দিয়েছি।”সেই মুহূর্তে ইউসুফ আলী চুপ করে থেকেছিলেন।কারণ কী বলবেন?তিনিও তো একই কাজ করেছেন।নিজের গান নিজে বন্ধ করেছেন একসময়।সংসারের জন্য।ছেলেদের জন্য।আবুল সেই পথেই হেঁটেছে।বাবার পথে।এই পথটা কি ঠিক?ইউসুফ আলী জানেন না।বিছানায় শুয়ে শুয়ে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়।জীবনটা দেখা যায় দূর থেকে।দূর থেকে দেখলে বোঝা যায় — কোথায় বাঁক নেওয়া উচিত ছিল।কিন্তু তখন আর বাঁক নেওয়া যায় না।বিছানা থেকে উঠতে পারেন না।একটাই কাজ করতে পারেন।সন্ধ্যায় মনে মনে গাইতে পারেন।শব্দ বের হয় না।কিন্তু সুর আছে মাথায়।ভাটিয়ালি।মুর্শিদি।পুরনো বাংলা গান।মৃত্যুর আগের দিন রাতে জোবেদা খাতুন পাশে ছিলেন।ইউসুফ আলী বললেন, “আশিককে বলো।”“কী বলব?”“বলো — দাদু বলেছে গান শিখতে।”জোবেদা খাতুন বললেন, “বলব।”ইউসুফ আলী চোখ বন্ধ করলেন।পরদিন সকালে আর উঠলেন না।
সারাংশ: আবুল হোসেন চৌধুরী মাইনাস লাভলীএকটি জটিল, বহুমাত্রিক পারিবারিক গল্প যেখানে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতা, প্রতিশোধ এবং দমিত ভালোবাসার ঘূর্ণিঝড় চলে।আবুল হোসেন চৌধুরী — একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী, হিসাবি ও সফল উকিল। ছোটবেলায় গানের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে সে গানকে চিরতরে দমিয়ে রাখে। একুশ বছর বয়সে সে বিয়ে করে লাভলীকে — যে তার চেয়ে দশ বছরের বড়, অসাধারণ সুন্দরী কিন্তু স্বাধীনচেতা ও জেদি। এই বিয়ে ছিল আবুলের হিসাবের বিয়ে — সৌন্দর্য, যৌতুক ও সমাজে মুখ রক্ষার জন্য। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হয়ে দাঁড়ায়।লাভলী — সৌন্দর্যকে নিজের প্রধান সম্পদ মনে করে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে যাচাই করা তার অভ্যাস। সংসারে সে রানীর মতো আচরণ করে, কিন্তু তার ভেতরে গভীর অভাব ও ক্রোধ লুকিয়ে থাকে। ছেলে আশিক ও আকাশের প্রতি তার ভালোবাসা বিকৃত হয়ে যায় শাসন ও মারধরের মাধ্যমে।গল্পটি সাতটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বর্ণিত হয়েছে — আবুল, লাভলী, আশিক, ফারজানা (আবুলের পরকীয়া), রিনা, জোবেদা খাতুন (আবুলের মা) এবং ইউসুফ আলী চৌধুরী (বাবা)। প্রত্যেকের দৃষ্টিতে একই ঘটনা ভিন্ন রূপ নেয়।একদিকে আবুলের উত্থান, মামলায় সাফল্য ও নতুন সম্পর্ক; অন্যদিকে লাভলীর ক্ষমতার লড়াই, স্বর্ণ কেলেঙ্কারি, ছেলেদের সঙ্গে দূরত্ব এবং পারিবারিক বিষাক্ততা। আশিক — যে শৈশবে মায়ের নির্যাতন সহ্য করে বড় হয়েছে — ধীরে ধীরে বাবার পক্ষে চলে যায় এবং এক পর্যায়ে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে।“আবুল হোসেন চৌধুরী মাইনাস লাভলী” একটি কালো, তীক্ষ্ণ ও বাস্তবধর্মী রোমান্টিক গল্প। এখানে রোমান্টিসিজম হলো দমিত গান, হারানো সন্তানের স্মৃতি, ক্ষমতার লোভ এবং ভাঙা সম্পর্কের মধ্যেও টিকে থাকার অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা। গল্পটি দেখায় — কীভাবে হিসাবি সিদ্ধান্ত মানুষকে ধীরে ধীরে নিঃস্ব করে দেয়, আর কীভাবে একটি পরিবারের ভেতরে প্রত্যেকে নিজের যুদ্ধে ব্যস্ত থাকে।
0 Comments