পৃথিবীর বুকে এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে দিনের আলোও অন্ধকারকে পুরোপুরি হারাতে পারে না। যেখানে গাছের পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে হাজার বছরের রহস্য, নদীর কালো জলে ভেসে বেড়ায় অজানা আতঙ্ক, আর রাত নামলেই জেগে ওঠে এমন কিছু প্রাণী, যাদের অস্তিত্ব মানুষ আজও বিশ্বাস করতে চায় না।
দক্ষিণ আমেরিকার বিশাল আমাজন অরণ্য তেমনই এক রহস্যময় জগৎ।
ব্রাজিলের মানাউস শহরের একটি পুরোনো হোটেলের ঘরে বসে মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে ছিল বাংলাদেশি অভিযাত্রী আরিফ রহমান। বয়স আটত্রিশ। পেশায় বন্যপ্রাণী গবেষক। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম অরণ্যগুলো ঘুরে দেখা।
তার সঙ্গে ছিল আরও তিনজন।
রাফি—একজন তরুণ ক্যামেরাম্যান, যার নেশা পৃথিবীর বিরলতম প্রাণীদের ছবি তোলা।
ডক্টর এলেনা—ব্রাজিলের একজন অভিজ্ঞ জীববিজ্ঞানী, যিনি প্রায় দশ বছর ধরে আমাজনের প্রাণীদের নিয়ে গবেষণা করছেন।
আর জোয়াও—স্থানীয় মাঝি ও অরণ্যপথের অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক।
তাদের অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল আমাজনের গভীরে অবস্থিত একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাওয়া। কয়েক মাস আগে সেখানকার একটি গবেষণাকেন্দ্র থেকে শেষবারের মতো বার্তা পাঠানো হয়েছিল।
বার্তাটি ছিল মাত্র কয়েকটি শব্দের—
“আমরা যা আবিষ্কার করেছি, তা কোনো প্রাণী নয়। অরণ্য আমাদের চিনে ফেলেছে। ফিরে যাওয়ার পথ বন্ধ।”
এরপর থেকে গবেষণাকেন্দ্রটির সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
আরিফ বার্তাটি পড়ে বলেছিল, “হয়তো কোনো বিপজ্জনক প্রাণী নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তারা বিপদে পড়েছে।”
কিন্তু এলেনা মাথা নেড়ে বলেছিলেন, “সমস্যা হলো, ওই এলাকায় কোনো পরিচিত গবেষণাকেন্দ্র থাকার কথা নয়। অন্তত সরকারি নথিতে তো নেই।”
জোয়াও এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার সে ধীরে ধীরে জানালার কাছে এগিয়ে এল।
“আপনারা কি সত্যিই সেখানে যেতে চান?”
আরিফ হাসল।
“কেন? জায়গাটা কি এতই ভয়ংকর?”
জোয়াও জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “আমার দাদু বলতেন, আমাজনের গভীরে এমন একটা অরণ্য আছে, যেখানে গাছেরাও মানুষের নাম ধরে ডাকে। কেউ একবার সেই ডাকে সাড়া দিলে, অরণ্য তাকে আর সহজে ফিরতে দেয় না।”
রাফি হেসে উঠল।
“দাদুর গল্প দিয়ে আমাদের ভয় দেখাচ্ছেন?”
জোয়াও কোনো উত্তর দিল না।
শুধু যাওয়ার আগে বলল, “কাল সকালে রওনা হব। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন—রাতে জঙ্গলের ভেতর থেকে পরিচিত কারও কণ্ঠ শুনলেও উত্তর দেবেন না।”
কেন, তা আর জিজ্ঞাসা করা হলো না।
কিন্তু সেদিন রাতে আরিফের ঘুম ভাঙল একটা অদ্ভুত শব্দে।
জানালার বাইরে কেউ যেন ফিসফিস করে ডাকছে—
“আরিফ... আরিফ...”
সে উঠে জানালার কাছে গেল।
বাইরে কেউ নেই।
দূরে শহরের আলো, আর তারও ওপারে অন্ধকারের মতো ছড়িয়ে আছে আমাজন অরণ্য।
আরিফ জানালা বন্ধ করতে গিয়ে কাচের ওপরে একটা ভেজা হাতের ছাপ দেখতে পেল।
ছাপটা মানুষের হাতের মতোই।
শুধু আঙুল ছিল ছয়টি।
পরদিন ভোরে তাদের নৌকা রওনা হলো।
আমাজনের নদী যেন এক বিশাল জলসমুদ্র। দুই পাশে গাছের সারি এত ঘন যে কোথাও কোথাও আকাশ দেখা যায় না। বিশাল গাছের শিকড় পানির মধ্যে নেমে গেছে। লতাগুল্ম ঝুলে আছে নদীর ওপর। অচেনা পাখির চিৎকার আর পোকামাকড়ের একটানা শব্দে চারপাশ মুখর।
কখনো গাছের ডালে দেখা যাচ্ছিল লাল-নীল রঙের ম্যাকাও পাখি। কখনো দূরে কোনো ডালে বসে ছিল বানর। পানির ওপর ভেসে উঠছিল গোলাপি নদী-ডলফিনের পিঠ।
কিন্তু যতই তারা গভীরে এগোচ্ছিল, ততই অরণ্যটা অস্বাভাবিক হয়ে উঠছিল।
দুপুরের দিকে রাফি ক্যামেরা হাতে নৌকার সামনের দিকে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ সে চিৎকার করে উঠল—
“ওই দেখুন! পানির মধ্যে কী?”
সবাই তাকাল।
নদীর কালচে পানিতে একটা বিশাল ছায়া নৌকার সমান্তরালে এগিয়ে চলেছে।
প্রথমে মনে হলো, কোনো বড় মাছ।
তারপর ছায়াটা পানির ওপরে উঠে এল।
একটি বিশাল অ্যানাকোন্ডা!
সাপটির শরীর এত মোটা যে দূর থেকে মনে হচ্ছিল পানির মধ্যে একটা গাছের গুঁড়ি ভাসছে। তার গায়ে কালো ও জলপাই রঙের নকশা। মাথাটা ধীরে ধীরে পানির ওপর উঠল।
জোয়াও সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনের গতি বাড়িয়ে দিল।
“কেউ নড়বেন না!” সে চিৎকার করল।
সাপটি নৌকার দিকে এগিয়ে এল না। কিন্তু তার চোখ দুটো স্থির হয়ে রইল আরিফের দিকে।
আরিফের মনে হলো, প্রাণীটি যেন তাকে চিনতে পারছে।
কয়েক মুহূর্ত পর সাপটি পানির নিচে অদৃশ্য হয়ে গেল।
রাফি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “এমন বড় অ্যানাকোন্ডা আমি কখনো দেখিনি!”
এলেনা গম্ভীর মুখে বললেন, “আমাজনে বড় অ্যানাকোন্ডা পাওয়া যায়। কিন্তু ওটার আচরণটা অদ্ভুত ছিল।”
“কেন?” আরিফ জিজ্ঞাসা করল।
“সাধারণত সাপ এভাবে নৌকার দিকে নজর রেখে সমান্তরালে চলে না। তবে আমরা দূর থেকে দেখেছি, তাই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।”
জোয়াও তখনও নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ সে বলল, “ওটা আমাদের অনুসরণ করছে।”
“সাপটা?” রাফি অবাক হলো।
জোয়াও মাথা নাড়ল।
“না। অন্য কেউ।”
“কে?”
জোয়াও উত্তর দিল না।
কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে নৌকার পেছনে পানির মধ্যে কিছু একটা শব্দ করে উঠল।
ছপাৎ!
তারপর আবার নীরবতা।
আরিফ পেছনে তাকিয়ে দেখল, পানির ওপর ভেসে আছে একটি পুরোনো কাঠের মুখোশ।
মুখোশটির চোখের জায়গায় দুটি কালো গর্ত।
আর কপালে খোদাই করা রয়েছে একটি চিহ্ন—ছয়টি আঙুলের মতো দেখতে ছয়টি সরু দাগ।
সন্ধ্যার আগে তারা নদীর পাশে উঁচু একটি স্থানে অস্থায়ী শিবির স্থাপন করল।
জোয়াও বারবার বলছিল, রাত হওয়ার আগেই আগুন জ্বালাতে হবে। কারণ এই অঞ্চলে জাগুয়ার, বিষাক্ত সাপ, বিষাক্ত ব্যাঙ এবং নানা ধরনের বিপজ্জনক প্রাণী রয়েছে।
আরিফ ও এলেনা তাঁবু খাটাচ্ছিলেন। রাফি ক্যামেরার ব্যাটারি পরীক্ষা করছিল।
হঠাৎ জঙ্গল থেকে একটা বিকট গর্জন শোনা গেল।
রাফি থমকে গেল।
“এটা কীসের শব্দ?”
এলেনা বললেন, “জাগুয়ার হতে পারে। তবে শব্দটা বেশ দূর থেকে এসেছে।”
ঠিক তখনই তাদের শিবিরের পাশের ঝোপের মধ্যে কিছু একটা নড়ে উঠল।
এক জোড়া হলুদ চোখ অন্ধকারে জ্বলে উঠল।
তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল একটি জাগুয়ার।
শক্তিশালী শরীর, সোনালি গায়ে কালো ছোপ, আর স্থির দৃষ্টি। প্রাণীটি কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার ঝোপের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
রাফি ফিসফিস করে বলল, “এত কাছে!”
এলেনা বললেন, “জাগুয়ার সাধারণত মানুষকে এড়িয়ে চলে। তবে কাছে আসা মানেই যে নিরাপদ, তা নয়।”
রাত বাড়ল।
জঙ্গলের শব্দ যেন ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। পোকামাকড়ের ডাকের মধ্যে কখনো শোনা যাচ্ছিল চাপা হাসির মতো শব্দ, কখনো শোনা যাচ্ছিল শুকনো পাতার ওপর কারও হাঁটার আওয়াজ।
রাত প্রায় একটা।
আরিফ তাঁবুর বাইরে বসে নোট লিখছিল।
হঠাৎ সে শুনতে পেল—
“আরিফ ভাই...”
সে চমকে উঠল।
কণ্ঠটা রাফির মতো।
“আরিফ ভাই, একটু এদিকে আসুন।”
আরিফ মাথা তুলে তাকাল।
রাফি তো পাশের তাঁবুতে ঘুমাচ্ছে!
সে টর্চ জ্বালিয়ে শব্দের দিকে আলো ফেলল।
কেউ নেই।
আবার ডাক এল।
“আরিফ ভাই... আমি এখানে!”
এবার কণ্ঠটা এলেনার মতো।
আরিফের বুকের ভেতর কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে গেল।
ঠিক তখনই জোয়াও তার পেছনে এসে দাঁড়াল।
“উত্তর দেবেন না,” সে ফিসফিস করে বলল।
“কিন্তু ডাকছে কে?”
জোয়াও আরিফের হাত চেপে ধরে বলল, “আমি জানি না। তবে ওই ডাক মানুষের নয়।”
তারা দুজন তাঁবুর দিকে ফিরতে যাচ্ছিল, এমন সময় টর্চের আলো পড়ল কাছের একটি গাছের গুঁড়িতে।
সেখানে কাদার মধ্যে ভেজা পায়ের ছাপ।
ছাপগুলো মানুষের মতো, কিন্তু প্রতিটি পায়ে ছয়টি আঙুল।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, ছাপগুলো জঙ্গলের ভেতর থেকে আসেনি।
সেগুলো শুরু হয়েছে আরিফের তাঁবুর ঠিক সামনে থেকে।
আর শেষ হয়েছে গাছের গায়ে, প্রায় দশ ফুট উঁচুতে।
যেন কেউ মাটি থেকে উঠে সোজা গাছের কাণ্ড বেয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে!
পরদিন সকালে জোয়াও ঘোষণা করল, তারা আর এক রাতও ওই জায়গায় থাকবে না।
কিন্তু তাদের ফেরার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
রাতের বৃষ্টিতে নদীর একটি সরু শাখায় ভেসে এসেছে বিশাল গাছের গুঁড়ি। নৌকা নিয়ে সেখান দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
তাদের বিকল্প পথ খুঁজতে হলো।
এলেনার মানচিত্রে একটি পুরোনো গবেষণাকেন্দ্রের চিহ্ন ছিল। সেটি এই এলাকা থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার হাঁটার পথ।
তারা নৌকা নিরাপদ জায়গায় বেঁধে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে পড়ল।
ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর রাফি হঠাৎ থেমে গেল।
“ওই গাছটার দিকে তাকান!”
একটি বিশাল গাছের কাণ্ডে লম্বা আঁচড়ের দাগ।
দাগগুলো এত গভীর যে কাঠের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে গেছে।
এলেনা দাগগুলো পরীক্ষা করে বললেন, “কোনো বড় প্রাণীর নখের দাগ হতে পারে।”
ঠিক তখনই মাথার ওপরের ডাল থেকে একটা ভারী শব্দ হলো।
ধপ!
একটি বড় ডাল ভেঙে তাদের সামনে পড়ল।
তারপর ওপর থেকে কিছু একটা নিচে তাকাল।
রাফি প্রথমে বুঝতে পারেনি কী দেখছে।
প্রাণীটির শরীর বানরের মতো, কিন্তু সাধারণ বানরের তুলনায় অনেক বড়। লম্বা হাত-পা, কালচে লোম, আর মুখের গড়ন অস্বাভাবিক। তার চোখ দুটি মানুষের মতো সামনের দিকে স্থির।
সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল তার হাত।
প্রতিটি হাতে ছয়টি লম্বা আঙুল।
প্রাণীটি গাছের ডাল আঁকড়ে ধরে উল্টো হয়ে ঝুলছিল।
তারপর এমনভাবে মাথা কাত করল, যেন মানুষদের পরীক্ষা করছে।
জোয়াও কাঁপা গলায় বলল, “এটা এখানকার কোনো পরিচিত প্রাণী নয়।”
এলেনা ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে বললেন।
কিন্তু রাফি ক্যামেরা তুলতেই প্রাণীটি হঠাৎ বিকট চিৎকার করে উঠল।
সেই চিৎকারে চারপাশের পাখির ঝাঁক একসঙ্গে উড়ে গেল।
প্রাণীটি এক ডাল থেকে আরেক ডালে এমন দ্রুত লাফাতে লাগল যে তার চলাফেরা চোখে অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ল।
তারপর সেটি অদৃশ্য হয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর জঙ্গলের অন্য প্রান্ত থেকে ভেসে এল মানুষের কণ্ঠ—
“রাফি... এদিকে এসো!”
রাফির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
ওটা তার মায়ের কণ্ঠ!
“মা?”
সে এক পা এগোতেই আরিফ তাকে টেনে ধরল।
“থামো! এটা তোমার মা নয়!”
ঠিক তখনই তাদের পেছনের গাছের মাথা থেকে একই কণ্ঠ ভেসে এল—
“রাফি... এদিকে এসো!”
তারপর সামনে, পেছনে, ডানে, বাঁয়ে—একই ডাক চারদিক থেকে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
মনে হচ্ছিল, পুরো অরণ্যটাই তাদের নাম ধরে ডাকছে।
বিকেলের দিকে তারা অবশেষে গবেষণাকেন্দ্রটি খুঁজে পেল।
জায়গাটি দেখতে পরিত্যক্ত সামরিক ঘাঁটির মতো। লোহার গেট ভাঙা, দেয়ালে শ্যাওলা, জানালার কাচ ভাঙা। চারপাশে লতাগুল্ম এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যেন প্রকৃতি বহু বছর আগে ভবনটিকে নিজের দখলে নিয়েছে।
গেটের ওপর মরচে ধরা একটি ফলক।
তাতে লেখা—
AMAZON BIOLOGICAL RESEARCH STATION — PROJECT SIX
ভেতরে ঢুকে তারা দেখতে পেল, মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে ভাঙা যন্ত্রপাতি, কাগজপত্র আর শুকিয়ে যাওয়া রাসায়নিকের বোতল।
একটি কক্ষের দেয়ালে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল—
“ওরা আমাদের অনুকরণ করতে পারে।”
আরেকটি দেয়ালে—
“ওদের চোখের দিকে তাকাবেন না।”
রাফি একটি পুরোনো ক্যামেরার মেমোরি কার্ড খুঁজে পেল। সেটি আরিফের হাতে দিয়ে বলল, “এটা হয়তো কোনো সূত্র দিতে পারে।”
কেন্দ্রের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অচল ছিল। তবে সৌরশক্তিতে চালিত একটি ছোট কম্পিউটার এখনো কাজ করছিল।
এলেনা অনেক চেষ্টা করে কম্পিউটারটি চালু করলেন।
সেখানে একটি ভিডিও ফাইল পাওয়া গেল।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছিল, একজন আতঙ্কিত গবেষক ক্যামেরার সামনে বসে আছেন।
তার মুখে কাদা, চোখে ঘুমহীনতার ছাপ।
তিনি বলছিলেন—
“আমরা ভেবেছিলাম, এখানে একটি অজানা প্রজাতির সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু ভুল করেছিলাম। এরা শুধু বুদ্ধিমান প্রাণী নয়। এরা আমাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে, আমাদের কণ্ঠস্বর অনুকরণ করে, এমনকি আমাদের দলের সদস্যদের চলাফেরাও নকল করতে পারে।”
গবেষকটি বারবার পেছনে তাকাচ্ছিলেন।
“আমরা একটি প্রাণীকে খাঁচায় আটকে রেখেছিলাম। কিন্তু পরদিন খাঁচা খালি ছিল। দরজা বাইরে থেকে বন্ধ ছিল। এরপর থেকে দলের একজন করে নিখোঁজ হতে থাকে।”
ভিডিওতে হঠাৎ আলো নিভে গেল।
কিছুক্ষণ পর আলো জ্বলে উঠতেই গবেষকটি চিৎকার করে উঠলেন।
তার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল সেই ছয় আঙুলওয়ালা প্রাণী।
কিন্তু এবার তার মুখটা অন্য রকম।
তার মুখের গড়ন অনেকটা সেই গবেষকের মতো!
ভিডিও কেঁপে উঠল।
তারপর পর্দায় শুধু একটি বাক্য দেখা গেল—
“ওরা আমাদের মতো হতে শিখছে।”
ভিডিও শেষ হয়ে গেল।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এল।
রাফি ফিসফিস করে বলল, “এটা কি কোনো নতুন প্রজাতি?”
এলেনা মাথা নাড়লেন।
“আমরা ভিডিও দেখে নিশ্চিত হতে পারি না। প্রাণীটি কী, তা জানতে হলে আরও প্রমাণ দরকার।”
আরিফ কম্পিউটারের পাশে পড়ে থাকা একটি ডায়েরি খুলল।
শেষ পাতায় কাঁপা হাতে লেখা—
‘আমরা আজ তিনজন। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম, আমাদের ঘরে চারজন মানুষ। চতুর্থজন আমাদেরই একজনের মতো দেখতে। সে শুধু হাসছে। কেউ বুঝতে পারছে না, আসল মানুষটি কে।’
আরিফ ডায়েরি বন্ধ করে দিল।
ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে এলেনার কণ্ঠ শোনা গেল
“আরিফ, তাড়াতাড়ি এখানে আসুন!”
কিন্তু এলেনা তো তার পাশেই দাঁড়িযে।
চারজন একসঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল।
পাশের ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে আলো আসছে।
সেখান থেকে আবার এলেনার কণ্ঠ শোনা গেল।
“আরিফ, আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস পেয়েছি!”
আসল এলেনা ফিসফিস করে বললেন, “কেউ দরজা খুলবেন না।”
রাফি ক্যামেরা চালু করল।
আরিফ ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সে দরজার ফাঁক দিয়ে তাকাতেই তার বুকের ভেতরটা জমে গেল।
ঘরের ভেতরে এলেনা দাঁড়িয়ে আছেন।
একই পোশাক, একই চুল, একই মুখ।
কিন্তু তার চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে স্থির।
নকল এলেনা মাথা ঘুরিয়ে আরিফের দিকে তাকালেন।
তারপর মৃদু হেসে বললেন, “তুমি এত দেরি করলে কেন?”
আরিফ পিছিয়ে এল।
প্রাণীটি এবার মাথা নিচু করে হাসতে লাগল। তার মুখের চামড়া যেন ঢেউয়ের মতো নড়ে উঠল।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মুখের গড়ন বদলে গেল।
এবার সেখানে রাফির মুখ!
নকল রাফি দরজার দিকে এগিয়ে এসে বলল, “আরিফ ভাই, আমাকে বাঁচান!”
আসল রাফি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল।
দরজার ওপাশ থেকে হঠাৎ একটা দীর্ঘ হাত বেরিয়ে এল।
হাতটা মানুষের মতো, কিন্তু আঙুল ছয়টি।
দরজার কাঠ আঁকড়ে ধরে প্রাণীটি ধীরে ধীরে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল।
তার শরীরটা অস্বাভাবিকভাবে বাঁকছিল। কখনো মানুষের মতো সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল, আবার কখনো চার হাত-পায়ে নেমে আসছিল।
জোয়াও চিৎকার করল, “দৌড়ান!”
চারজন করিডর দিয়ে ছুটতে লাগল।
পেছনে ভাঙচুরের শব্দ।
ধাম!
ধড়াম!
তারপর সেই প্রাণীটির কণ্ঠে শোনা গেল আরিফের নিজের গলা—
“এদিকে আসুন! আমি এখানে!”
আরিফের পা যেন জমে যাচ্ছিল।
সে বুঝতে পারল, প্রাণীটি শুধু তাদের মুখ নকল করছে না।
এটি তাদের কণ্ঠস্বরও শিখে ফেলেছে।
তারা একটি ছোট কক্ষে ঢুকে দরজা বন্ধ করল।
কক্ষটির ভেতরে পুরোনো রেডিও, ব্যাটারি এবং কয়েকটি মানচিত্র ছিল।
এলেনা দ্রুত দরজার পাশে ভারী আলমারি ঠেলে দিলেন।
রাফি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “এটা কীভাবে সম্ভব?”
এলেনা বললেন, “কিছু প্রাণী অন্য প্রাণীর ডাক অনুকরণ করতে পারে। কিন্তু আমরা যা দেখলাম, তা স্বাভাবিক অনুকরণ কি না, তা এখনো জানি না।”
জোয়াও দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনারা বিজ্ঞান দিয়ে সবকিছুর উত্তর খুঁজতে চান। কিন্তু কখনো কখনো বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় উত্তর।”
ঠিক তখন দরজার ওপাশ থেকে তিনবার টোকা পড়ল।
টক।
টক।
টক।
তারপর আরিফের বাবার কণ্ঠে কেউ বলল—
“বাবা, দরজা খোলো।”
আরিফের চোখে আতঙ্ক জমে গেল।
তার বাবা মারা গেছেন দশ বছর আগে।
গবেষণাকেন্দ্রের পেছনে একটি সরু সুড়ঙ্গ ছিল। পুরোনো নকশা দেখে এলেনা বুঝতে পারলেন, সেটি অন্য পাশে নদীর কাছে গিয়ে বের হয়েছে।
দরজার বাইরে প্রাণীটি তখনো অপেক্ষা করছিল।
তারা সিদ্ধান্ত নিল, সুড়ঙ্গ দিয়ে বেরিয়ে নদীতে পৌঁছাতে হবে।
সুড়ঙ্গের ভেতরে হাঁটুসমান পানি। দেয়ালে অদ্ভুত আঁকিবুঁকি, কোথাও কোথাও ছয় আঙুলের হাতের ছাপ।
হঠাৎ রাফির পায়ে কিছু একটা ঠেকল।
সে টর্চ ফেলতেই দেখতে পেল, পানির মধ্যে পড়ে আছে একটি মানুষের জুতো।
আর তার পাশে একটি পুরোনো পরিচয়পত্র।
পরিচয়পত্রে সেই গবেষকের ছবি, যাকে তারা ভিডিওতে দেখেছিল।
কিন্তু জুতোর ভেতরে কোনো পা ছিল না। সেখানে শুধু শুকনো পাতা আর কালো কাদা।
“ওরা কোথায়?” রাফি ফিসফিস করে বলল।
কেউ উত্তর দিল না।
সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে পৌঁছে তারা নদী দেখতে পেল।
কিন্তু নৌকাটি যেখানে বেঁধে রাখা হয়েছিল, সেখানে নেই।
দড়ি ছিঁড়ে পড়ে আছে।
নদীর ওপারে তাদের নৌকাটি ভাসছে। আর নৌকার ওপর দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ।
লোকটি দেখতে অবিকল জোয়াওয়ের মতো।
আসল জোয়াও তখন তাদের পাশেই দাঁড়িয়ে।
নৌকার ওপরের লোকটি হাত তুলে ডাকল, “এদিকে আসুন! আমি নৌকা নিয়ে এসেছি!”
রাফি ক্যামেরা তুলল।
লোকটি হাসল।
তারপর সে এমনভাবে হাত নাড়ল, যেন তার হাতের হাড়গুলো শরীরের বাইরে থেকেও বাঁকানো যায়।
জোয়াও কাঁপা গলায় বলল, “ওটা আমি নই।”
নৌকার ওপরের প্রাণীটি এবার চার হাত-পায়ে নেমে এল।
তার শরীর লম্বা হতে লাগল।
তারপর সে নৌকার পাশ দিয়ে পানিতে ঝাঁপ দিল।
জল ছিটকে উঠল।
নদীর কালো পানি থেকে এক বিশাল অ্যানাকোন্ডার মাথা ভেসে উঠল। তার পেছনে পানির ওপর দেখা গেল আরও কয়েকটি লম্বা ছায়া।
এলেনা চিৎকার করে বললেন, “পেছনে যান! পানিতে নামবেন না!”
ঠিক তখন নদীর অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এল সেই অদ্ভুত প্রাণীটির কণ্ঠ—
“আরিফ...”
আরিফ ঘুরে তাকাল।
গাছের ডালে প্রাণীটি বসে আছে।
এবার তার মুখে আরিফের মুখ!
প্রাণীটি হাসল।
“তুমি বাড়ি ফিরবে না।”
তারপর সে গাছের ডাল থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
রাত নেমে এসেছে।
চারজন নদীর ধার ধরে বিপরীত দিকে হাঁটতে লাগল। তারা জানত না কোথায় যাচ্ছে, শুধু জানত—স্থির হয়ে থাকলে বিপদ আরও বাড়বে।
হঠাৎ এলেনা একটি অস্বাভাবিক গাছের সামনে দাঁড়ালেন।
গাছটির গুঁড়ি বিশাল, প্রায় ছোট একটি বাড়ির সমান চওড়া। শিকড়গুলো মাটির ওপর দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে।
গাছের গোড়ায় পাথরের তৈরি একটি দরজা।
দরজার ওপর সেই ছয় আঙুলের চিহ্ন।
আরিফ অবাক হয়ে বলল, “আমাজনের জঙ্গলে পাথরের দরজা?”
এলেনা বললেন, “এখানে এমন কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থাকতে পারে, যা আমরা এখনো জানি না। কিন্তু দরজাটা কে বানিয়েছে, তা না দেখে বলা যাবে না।”
জোয়াও দরজার কাছে যেতে চাইছিল না।
“আমার দাদু এই দরজার কথা বলেছিলেন,” সে বলল।
“কী বলেছিলেন?” রাফি জিজ্ঞাসা করল।
জোয়াও গিলে ফেলল শুকনো ঢোক।
“তিনি বলেছিলেন, এই দরজার ওপারে এমন একটি জায়গা আছে, যেখানে দিনের আলো কখনো পৌঁছায় না। সেখানে অরণ্যের প্রথম বাসিন্দারা ঘুমিয়ে আছে।”
আরিফ পাথরের দরজায় হাত রাখল।
দরজাটি নিজে থেকেই খুলে গেল।
ভেতরে অন্ধকার সিঁড়ি।
তারা টর্চ জ্বালিয়ে নিচে নামল।
সিঁড়ির শেষে একটি বিশাল গুহা। গুহার ছাদ থেকে ঝুলছে অদ্ভুত স্ফটিক। দেয়ালে আঁকা রয়েছে মানুষের মতো প্রাণীদের ছবি।
কিছু ছবিতে দেখা যাচ্ছে, তারা গাছের ডালে বসে আছে।
কিছু ছবিতে দেখা যাচ্ছে, তারা মানুষের পোশাক পরে আছে।
আর একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, চারজন অভিযাত্রী গুহার সামনে দাঁড়িয়ে।
ছবির নিচে খোদাই করা চারটি নাম।
আরিফ। রাফি। এলেনা। জোয়াও।
চারজনের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
এলেনা কাঁপা গলায় বললেন, “এটা অসম্ভব। আমাদের এখানে আসার কথা কেউ জানত না।”
গুহার মাঝখানে একটি পাথরের বেদি।
বেদির ওপর রাখা একটি পুরোনো ধাতব বাক্স।
আরিফ বাক্সটি খুলল।
ভেতরে একটি ডায়েরি।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
‘আমি ক্যাপ্টেন আলভারেজ। ১৯৩৭ সালে এই অরণ্যে প্রবেশ করেছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম, এখানে একটি হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার সন্ধান পাব। কিন্তু আমরা এমন এক প্রজাতির দেখা পেলাম, যারা মানুষের আগমনের বহু আগে থেকেই আমাদের পর্যবেক্ষণ করছে।’
আরও লেখা ছিল—
‘তারা মানুষের মুখ ধারণ করতে পারে কি না, তা আমরা জানি না। তবে তারা মানুষের স্মৃতি, ভয় এবং কণ্ঠস্বরের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে পরিচিত। তারা শিকার করে ক্ষুধার জন্য নয়। তারা শিকার করে আমাদের বুঝতে।’
শেষ পাতায় লেখা—
‘যদি কেউ এই ডায়েরি খুঁজে পান, তবে মনে রাখবেন—যে মুখ আপনাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতে বাধ্য করে, বিপদ হয়তো সেই মুখের আড়ালেই লুকিয়ে আছে।’
হঠাৎ গুহার চারপাশে আলো জ্বলে উঠল।
দেয়ালের পাথরের ফাঁক থেকে অসংখ্য হলুদ চোখ তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
একটি নয়।
দুটি নয়।
শত শত চোখ!
গুহার গভীর থেকে ভারী পদশব্দ ভেসে এল।
ধীরে ধীরে অন্ধকারের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল এক বিশাল প্রাণী।
আগের প্রাণীগুলোর তুলনায় এটি অনেক বড়। উচ্চতা প্রায় বারো ফুট। শরীর কালচে লোমে ঢাকা, কাঁধ চওড়া, হাত অস্বাভাবিক লম্বা। তার মুখের গড়ন কখনো মানুষের মতো, কখনো অন্য কোনো প্রাণীর মতো দেখাচ্ছিল।
কিন্তু তার চোখ দুটো ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
সেগুলোতে কোনো পশুসুলভ অস্থিরতা নেই।
ছিল মানুষের মতো গভীর, ঠান্ডা বুদ্ধির ছাপ।
প্রাণীটি তাদের সামনে এসে থামল।
তারপর এমন এক ভাষায় কথা বলল, যা কেউ বুঝতে পারল না।
কিন্তু এলেনার হাতে থাকা ছোট অনুবাদযন্ত্রটি হঠাৎ শব্দ করে উঠল।
যন্ত্রটি কয়েকটি শব্দ অনুবাদ করল—
“তোমরা আবার ফিরে এসেছ।”
এলেনা অবিশ্বাসের চোখে তাকালেন।
“আবার? আমরা তো কখনো এখানে আসিনি!”
প্রাণীটি মাথা কাত করল।
যন্ত্রে আবার শব্দ ভেসে এল—
“তোমাদের মুখ নতুন। তোমাদের ভয় নতুন। কিন্তু তোমাদের প্রজাতি পুরোনো।”
আরিফ সাহস করে সামনে এগিয়ে গেল।
“তুমি কে?”
প্রাণীটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর অনুবাদযন্ত্র বলল—
“আমরা এই অরণ্যের স্মৃতি।”
রাফি ফিসফিস করে বলল, “এটা কোনো প্রাণী নয়... এটা একটা সভ্যতা!”
প্রাণীটি তার দিকে তাকাল।
“তোমরা নিজেদের পৃথিবীর মালিক ভাবো। গাছ কাটো। নদী বদলাও। প্রাণীদের বন্দি করো। তারপর অজানা কিছু দেখলেই তাকে দানব বলো।”
আরিফ বলল, “তোমরা মানুষকে আক্রমণ করো কেন?”
প্রাণীটি এবার গুহার দেয়ালের দিকে তাকাল।
সেখানে অসংখ্য মানুষের ছবি।
“তোমরা প্রথমে এসেছিলে সোনা খুঁজতে। তারপর এসেছিলে কাঠ কাটতে। এরপর এসেছিলে আমাদের ধরতে। তোমরা আমাদের ভাষা শিখতে চেয়েছিলে, কিন্তু আমাদের কথা শুনতে চাওনি।”
এলেনা বললেন, “আমরা গবেষক। আমরা তোমাদের ক্ষতি করতে আসিনি।”
প্রাণীটি ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
“তোমাদের আগের দলও একই কথা বলেছিল।”
আরিফের মনে পড়ল গবেষণাকেন্দ্রের ভিডিও।
খাঁচায় বন্দি প্রাণী।
নিখোঁজ গবেষক।
নকল মুখ।
সে বুঝতে পারল, মানুষই হয়তো প্রথমে এই প্রাণীদের বন্দি করতে চেয়েছিল।
কিন্তু তারপরও একটা প্রশ্ন থেকে গেল।
“তাহলে তোমরা আমাদের কণ্ঠস্বর নকল করো কেন?”
প্রাণীটি উত্তর দিল—
“তোমরা যখন অরণ্যে প্রবেশ করো, তখন তোমাদের ভাষা, তোমাদের ভয়, তোমাদের স্মৃতি অরণ্যের মধ্যে রেখে যাও। আমরা সেগুলো শুনি। শিখি। কখনো কখনো তোমাদের মুখে সেগুলো ফিরিয়ে দিই।”
আরিফ বলল, “তাহলে রাতে আমরা যাদের দেখেছি...”
“তারা আমাদেরই কয়েকজন। তারা তোমাদের পরীক্ষা করছিল।”
“পরীক্ষা?”
“তোমরা শিকার করতে এসেছ, নাকি বুঝতে?”
প্রাণীটি এবার হাত তুলল।
তার ছয়টি আঙুলের ডগায় ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠল।
গুহার দেয়ালে একটি নতুন ছবি ফুটে উঠল।
ছবিতে দেখা গেল, একটি বড় গাছের নিচে অসংখ্য প্রাণী ঘুমিয়ে আছে। তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি মানুষ।
মানুষটির মুখ আরিফের মতো।
কিন্তু তার চোখ দুটি কালো।
প্রাণীটি বলল—
“তোমাদের একজনকে এখানে থাকতে হবে।”
জোয়াও চিৎকার করে উঠল, “না! আমরা কাউকে এখানে রেখে যাব না!”
প্রাণীটি তার দিকে তাকাল।
“তাহলে তোমাদের কেউই ফিরতে পারবে না।”
গুহার চারপাশে প্রাণীগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল।
আরিফ বুঝতে পারল, পালানোর চেষ্টা করলে তারা সবাই বিপদে পড়বে।
সে এলেনাকে বলল, “আমাদের ওদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। হয়তো ওরা আমাদের শত্রু নয়।”
রাফি বলল, “কিন্তু একজনকে এখানে থাকতে হবে কেন?”
কেউ উত্তর জানত না।
আরিফ প্রাণীটির সামনে দাঁড়াল।
“আমি থাকব।”
এলেনা চিৎকার করে উঠলেন, “আপনি পাগল হয়েছেন?”
আরিফ শান্ত গলায় বলল, “আমাদের কাউকে না কাউকে সত্যিটা জানতে হবে। আর যদি আমরা এখান থেকে ফিরে যাই, তাহলে পৃথিবীকে বলতে পারব যে এই অরণ্যের গভীরে এমন কিছু আছে, যাদের আমরা বুঝতে পারিনি।”
প্রাণীটি তার দিকে তাকিয়ে রইল।
“তুমি ভয় পাও না?”
আরিফ মৃদু হেসে বলল, “ভয় পাচ্ছি। কিন্তু ভয় পেলেই সবকিছু থেকে পালাতে হয় না।”
দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর প্রাণীটি হাত নামিয়ে নিল।
“তুমি থাকতে পারবে না।”
আরিফ অবাক হলো।
“কেন?”
“কারণ তোমরা কেউই এখনো জানো না, তোমাদের দেখা সত্যি কি না।”
হঠাৎ গুহার আলো নিভে গেল।
চারপাশ থেকে অসংখ্য কণ্ঠ ভেসে আসতে লাগল।
কেউ আরিফের নাম ধরে ডাকছে।
কেউ রাফির মায়ের কণ্ঠে কথা বলছে।
কেউ এলেনার হারিয়ে যাওয়া সহকর্মীর মতো শোনাচ্ছে।
জোয়াও চোখ বন্ধ করে মাটিতে বসে পড়ল।
কয়েক মুহূর্ত পর আলো আবার জ্বলে উঠল।
কিন্তু এবার গুহায় শুধু চারজন মানুষ।
অন্য প্রাণীগুলো অদৃশ্য।
বড় প্রাণীটিও নেই।
শুধু পাথরের বেদির ওপর পড়ে আছে একটি ছোট কাঠের মুখোশ।
আর তার পাশে একটি কাগজ।
কাগজে লেখা—
“অরণ্য তোমাদের যেতে দিচ্ছে। কিন্তু তোমরা যা দেখেছ, তা কাউকে বলার আগে নিজেকে জিজ্ঞাসা করবে—তোমরা সত্যিই ফিরে এসেছ কি না।”
তারা গুহা থেকে বেরিয়ে এল।
বাইরে তখন ভোরের আলো।
পাখিরা ডাকছে।
নদীর পানি শান্ত।
দূরে তাদের নৌকাটি ভেসে আছে।
সবকিছু স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল।
কিন্তু আরিফের মনে হচ্ছিল, অরণ্য তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
যেন প্রতিটি গাছের পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
একাদশ অধ্যায়: বাড়ি ফেরার পর
দীর্ঘ যাত্রার পর তারা অবশেষে মানাউস শহরে ফিরে এল।
সেখান থেকে আরিফ বাংলাদেশে ফিরে গেল।
বাড়িতে পৌঁছে পরিবারের সবাই তাকে ঘিরে ধরল। স্ত্রী জানতে চাইলেন, এত দিন কোথায় ছিল সে, কেমন ছিল অভিযান।
আরিফ হাসিমুখে বলল, “আমাজন অদ্ভুত সুন্দর জায়গা। তবে সেখানে এমন কিছু রহস্য আছে, যা ব্যাখ্যা করা কঠিন।”
সে কাউকে গুহার কথা বলল না।
কাউকে সেই প্রাণীদের কথাও বলল না।
কারণ তার কাছে কোনো ছবি ছিল না।
রাফির ক্যামেরার মেমোরি কার্ডটি ফাঁকা।
এলেনার নোটবুকের সব পৃষ্ঠা সাদা।
জোয়াও আর কখনো তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।
কয়েক সপ্তাহ পর এক রাতে আরিফ তার কম্পিউটারে বসে অভিযানের নোট লিখছিল।
হঠাৎ একটি অজানা ই-মেইল এল।
প্রেরকের নাম নেই।
বিষয় লেখা—
PROJECT SIX: FINAL RECORDING
আরিফ ই-মেইলটি খুলল।
একটি ভিডিও ফাইল।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, আমাজনের সেই গবেষণাকেন্দ্রের একটি ঘর।
ক্যামেরার সামনে বসে আছে আরিফ নিজেই!
কিন্তু ভিডিওর আরিফের চেহারা অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে। চোখের মণি কালো। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
ভিডিওর আরিফ ধীরে ধীরে ক্যামেরার দিকে ঝুঁকে এল।
তারপর বলল—
“তুমি কি সত্যিই বাড়ি ফিরে এসেছ?”
আরিফের হাত থেকে মাউস পড়ে গেল।
ভিডিওর মানুষটি আবার বলল—
“তুমি কি নিশ্চিত, তুমি সেই আরিফ?”
তারপর সে হাসল।
আর সেই হাসির সঙ্গে সঙ্গে ভিডিওর পর্দা কালো হয়ে গেল।
কম্পিউটার বন্ধ হয়ে গেল নিজে থেকেই।
আরিফ তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল।
তারপর আয়নার দিকে তাকাল।
আয়নায় তার নিজের মুখ।
নিজের চোখ।
নিজের শরীর।
সবকিছু ঠিক আছে।
সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
ঠিক তখনই আয়নার ভেতরের মানুষটি মাথা কাত করল।
কিন্তু আরিফ মাথা কাত করেনি!
আয়নার মানুষটি ধীরে ধীরে হাসল।
তারপর ঠোঁট না নাড়িয়েই বলল—
“আমরা এখনো তোমার সঙ্গে আছি।”
আরিফ পিছিয়ে এল।
আয়নার মানুষটি হাত তুলল।
একটি।
দুটি।
তিনটি।
চারটি।
পাঁচটি।
তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল ষষ্ঠ আঙুলটি।
আরিফের গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না।
বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
দূরে কোথাও একটা পাখি ডেকে উঠল।
আর সেই ডাকের সঙ্গে মিশে গেল আমাজনের গভীর অরণ্যের পরিচিত ফিসফিসানি—
“আরিফ... আরিফ...”
পৃথিবীর বুকে এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে দিনের আলোও অন্ধকারকে পুরোপুরি হারাতে পারে না। যেখানে গাছের পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে হাজার বছরের রহস্য, নদীর কালো জলে ভেসে বেড়ায় অজানা আতঙ্ক, আর রাত নামলেই জেগে ওঠে এমন কিছু প্রাণী, যাদের অস্তিত্ব মানুষ আজও বিশ্বাস করতে চায় না।
দক্ষিণ আমেরিকার বিশাল আমাজন অরণ্য তেমনই এক রহস্যময় জগৎ।
ব্রাজিলের মানাউস শহরের একটি পুরোনো হোটেলের ঘরে বসে মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে ছিল বাংলাদেশি অভিযাত্রী আরিফ রহমান। বয়স আটত্রিশ। পেশায় বন্যপ্রাণী গবেষক। ছোটবেলা থেকেই
0 Comments