রাতের বেলা ঘুম এলেই এক অদ্ভুত মায়া আমাকে ঘিরে ধরে। চোখ বন্ধ না হতেই যেন আমাকে টেনে নেওয়া হয় এক অচেনা নদীর চরে—তপ্ত বালু, বেলিছড়া বাতাস, আর দূরে মানুষের চিৎকার। দুই দলে লাঠিসোটা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি, জমি দখল নিয়ে মারামারি। আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে। মনে হয়, আমি কাউকে বাঁচাতে এসেছি। যে আমাকে ডেকে বলছে— \"সুলতান, সাবধানে!\"সেই ডাকে বুক কেঁপে ওঠে।কিন্তু হঠাৎ এক লাঠির আঘাত মাথায় লাগে। গরম রক্ত গড়িয়ে পড়ে কপাল বেয়ে। আমি ধপ করে পড়ে যাই। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো মাটির ঘর, ছনের চালা, আর তেলের প্রদীপের ক্ষীণ আলো। মনে হয় সেই ঘরে কেউ আছে… কেউ আমার জন্য কাঁদছে।স্বপ্ন এখানে ভেঙে যায়।আমি তখন চল্লিশ বছরের এক মানুষ—বউ, সন্তান, সংসার; তবুও ঘুম ভাঙার পর মনে ধরে বেজে ওঠে সেই অজানা মাটির গন্ধ। কেন যেন মনে হয় খুব চেনা, খুব নিজের।দিনে অফিস করি, রাতে বাচ্চাকে গল্প শুনাই, কিন্তু মনে দাঁড়িয়ে থাকে সেই তরুণী—যাকে আমি দেখেছি স্বপ্নে। সে দাঁড়িয়ে থাকে মাটির ঘরের সামনের উঠোনে, পানে পানে তাকিয়ে থাকে পথের দিকে। তার কণ্ঠ শুনি না, কিন্তু চোখ দুটো… যেন হাজার বছরের দুঃখ কান্নায় ভরা। হঠাৎ একদিন স্বপ্নে প্রথমবার তার মুখ পরিষ্কার দেখলাম। ঠোঁট নড়ছে—— “সুলতান… তুমি ফিরলি না কেন?”স্বপ্ন থেকে উঠে বসতেই শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। বুকের ভেতর ধকধক করে ব্যথা লাগছে। মনে হয়, রাতের অন্ধকারে কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে।পরের কয়েক রাতে স্বপ্ন আরও স্পষ্ট হলো।মাটির বাড়ি।ঘরের কোণে কাঁসার থালা।ছনের চালা দিয়ে পানি পড়ছে।আর সেই তরুণী—তার নামও এবার শুনলাম।— “আমার নাম মরিয়ম। তুমি যাবে না সুলতান। বাইরে যেও না।”কিন্তু আমি, অর্থাৎ স্বপ্নের ‘আমি’, তাকে বুঝিয়ে বলছি,— “চরের মানুষজন মারামারি শুরু করে দিয়েছে। জমিটা আমাদের বাপ-দাদার। আমি গেলে না, কে যাবে?”মরিয়ম কাঁদতে কাঁদতে আমার হাত আঁকড়ে ধরে।আমি তবুও বেরিয়ে যাই।বাকিটা আগের মতো—লাঠির আঘাত, রক্ত, অন্ধকার।জেগে উঠে দেখি আমার দুই হাত কাঁপছে।আমি কি সত্যিই সুলতান ছিলাম?আমার কি সত্যিই কোনো পূর্বজন্ম ছিল?মরিয়ম কি এখনো অপেক্ষা করছে?এক রাতে হঠাৎ আরও কিছু দেখলাম।মারামারির ঠিক আগে আমার বন্ধু—অথবা সহপাঠি—আমাকে ডেকে বলছে,— “সুলতান, তুই পেছনে যা!”যে দৃশ্যগুলো এতদিন খণ্ড খণ্ড ছিল, এবার যেন পুরো ছবি স্পষ্ট হয়ে গেল।মনে হল—একজন মানুষের মৃত্যু দৃশ্য আমি নিজের চোখে দেখছি, আর সেই মানুষটি আমিই।পরদিন সকালে আর থাকতে পারলাম না।বউকে বললাম অফিসে জরুরি কাজ আছে, কিন্তু আমি রওনা দিলাম পদ্মার দিকে।আমার গ্রামের আশেপাশে কোনো চর নেই, তবুও মন টেনে নিচ্ছিল এই দিকেই।যেন কেউ বলছে—“এসো, তোমাকে কিছু দেখাতে হবে।”নদীর কাছে পৌঁছাতেই বুকের ভেতর ছ্যাঁৎ করে উঠল।বালুর গন্ধ—একেবারে স্বপ্নের মতো।চরের দিকে হাঁটতেই হঠাৎ দেখলাম, দূরে মাটির ঘরের মতো কিছু ভাঙা ভিত্তি।ইট নেই, টিন নেই—শুধু মাটির দাগ।আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম।হাওয়ার ঝাপটা মুখে লাগতেই মনে হল কেউ আমার কানে ফিসফিস করছে—— \"সুলতান…\"পেছনে কেউ নেই।তবুও ফিসফিসানি চলতে থাকে।আমার বুক কেঁপে ওঠে।এক মুহূর্তে বুঝে গেলাম—এই জায়গাটাই সেই জায়গা।এখানেই আমি… অর্থাৎ সেই সুলতান… মারা গিয়েছিলাম।সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে হঠাৎ আকাশে মেঘ জমে।আমি একা দাঁড়িয়ে।হাওয়া হু হু করে বইছে।চরের এক পাশে যেন ঝাপসা আলোর মতো কিছু দেখা গেল। ধীরে ধীরে সেটা পরিষ্কার হলো।একটি তরুণী। সেই একই চোখ, যা আমি স্বপ্নে দেখেছি—দীর্ঘ অপেক্ষার কষ্ট চেপে রাখা দুই চোখ।সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে নিঃশব্দে।আমি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম।কথা বের হতে চাইল না।শুধু ঠোঁট নড়ল—“মরিয়ম?”তরুণীর ঠোঁটে ছোট্ট হাসি।এক ফোঁটা অশ্রু তার গাল বেয়ে নেমে এলো।সে বলল—— “এবার তো আর যেও না, সুলতান…”বাতাসের ঘূর্ণি উঠল।আলোটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।আমি নিঃশ্বাস ফেলে দাঁড়িয়ে রইলাম।চর ফাঁকা।কিন্তু বুকের অভ্যন্তরে একটি ভার নেমে গেল।বুঝলাম—এটা শুধু স্বপ্ন না।এটা স্মৃতি।মাটি আর রক্তে লেখা এক জীবনের স্মৃতি, যা আমাকে ডেকেই চলেছিল। আমি বাড়ি ফিরলাম। বউ-সন্তানকে দেখে মনে হলো—এই জীবনেরও মূল্য আছে, দায়িত্ব আছে।কিন্তু মরিয়মের চোখদুটি…
রাতের বেলা ঘুম এলেই এক অদ্ভুত মায়া আমাকে ঘিরে ধরে। চোখ বন্ধ না হতেই যেন আমাকে টেনে নেওয়া হয় এক অচেনা নদীর চরে—তপ্ত বালু, বেলিছড়া বাতাস, আর দূরে মানুষের চিৎকার। দুই দলে লাঠিসোটা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি, জমি দখল নিয়ে মারামারি। আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে। মনে হয়, আমি কাউকে বাঁচাতে এসেছি। যে আমাকে ডেকে বলছে— \"সুলতান, সাবধানে!\"সেই ডাকে বুক কেঁপে ওঠে।কিন্তু হঠাৎ এক লাঠির আঘাত মাথায় লাগে। গরম রক্ত গড়িয়ে পড়ে কপাল বেয়ে। আমি ধপ করে পড়ে যাই। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো মাটির ঘর, ছনের চালা, আর তেলের প্রদীপের ক্ষীণ আলো। মনে হয় সেই ঘরে কেউ আছে… কেউ আমার জন্য কাঁদছে।
0 Comments