সব্যসাচী বুঝতে পারছেন যে, ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে তিনি এখন স্বর্গলোকের যাত্রী। সাঁই সাঁই করে রকেটের বেগে চলেছেন স্বর্গলোকের দিকে। তার বিশ্বাস স্বর্গে জায়গা হবে না। কারণ ইহলোকে ধর্মকর্ম তেমন করা হয়নি। তবে জীবনভর ভালো কর্মই করেছেন; সবসময় সৎ থেকেছেন, পরোপকার করেছেন, কখনো জেনে বা বুঝে কারো অনিষ্ট করেননি। এমনকি একটি পিঁপড়ার প্রাণও পারতঃপক্ষে পদদলিত করেননি। তাছাড়া ঐ তো কানে ভেসে আসছে; ইহলোকের সবাই বলাবলি করছে- উনি কত ভালো লোক ছিলেন! ভগবান উনাকে স্বর্গবাসী করো। আহা! কী শান্তি। শুনলেও আত্মাটা জুড়িয়ে আসে। কিন্তু ধার্মিক আর পুরোহিতের অভিশাপ বাণীও মনের অন্তঃপুরে বেজেই চলছে; নরকে যাবি, তুই নরকে যাবি! ধর্মকর্ম নেই, ভগবানের যপতপ নেই, শুধু দুনিয়াদারি নিয়েই ব্যস্ত! নরকের আগুনে পুড়ে মরবি! স্বর্গের অমৃত সূধা ভোগ করতে পারবি না; থরে থরে ফল সাজানো থাকবে না, অপ্সরা নর্তকীরা তোকে স্বর্গের নাচ দেখাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে এইটুকুই ভরসা শেষ বয়সে গুরুজির আশীর্বাদ নিয়েছেন।আকাশ পথ পেরিয়ে পরলোকে পৌঁছাতেই যমদূতের ডাণ্ডা রেডি। উনি এক আঘাতে পৌঁছে দেন স্বর্গে অথবা নরকে। প্রায় বসিয়ে দিচ্ছিলেন ডাণ্ডার পিটুনি। অমনি সব্যসাচীর স্বর্গীয় বড় ভাই হাত জোড় করে যমদূতকে বলেন- হুজুর, আপনার কথাই ফাইনাল। এই নিন এক ঘন্টার চিপ। আমার ভাইকে নরকে দিন।যমদূত ডাণ্ডা নামিয়ে এক স্বর্গীয় হাসিতে স্বর্গলোক ভাসিয়ে দিলেন। পুরো সপ্তাহ জুড়ে দেন-দরবার হচ্ছিল যমদূত আর অরুন্ধতীর মধ্যে। অরুন্ধতী খবর পেয়ে গেছেন উনার ছোট ভাই সব্যসাচী ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে শীঘ্রই আসছে। সবকিছু ঠিকঠাক মতোই চলছিল; নরক প্রাপ্তি নিশ্চিত ছিল। কিন্তু শেষ বয়সে এসেই বিপত্তি ঘটিয়ে বসলো; গুরুজির পদতলে ঠাঁই নিয়ে স্বর্গের টিকিট পাকাপোক্ত করে ফেলেছেন। এদিকে অরুন্ধতীর ঘুম হারাম, শত হলেও সহোদর। ওর শান্তি নিশ্চিত করা পরমধর্ম। তাই অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে নরকে গমনের পথটা নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু যমদূত আধঘন্টার চিপে রাজী হচ্ছিলেন না। অরুন্ধতীও চেষ্ঠা করেছিলেন। শেষ মুহূর্তে একঘন্টার চিপেই যমদূতকে শান্ত করলেন। সত্যি বলতে কী যমদূত এত চালাক ছিলেন না। বাঙালীদের চালাকির ছায়ায় থেকে থেকে যমদূতও এখন অতিচালাক হয়ে গেছেন।সব্যসাচীর মনটা বিমর্ষ হয়ে গেল মুহূর্তেই। যমদূত স্বর্গের দিকে পাঠাচ্ছিলেন অথচ বড়ভাই থামিয়ে দিল নরকে নেয়ার জন্য। শত হলেও বড় ভাই, ধমক দেয়া যায় না। তাই অভিযোগ করে সব্যসাচী বললেন- দাদা, তুমি আমার এত বড় সর্বনাশ করতে পারলে? আমি তো ইহলোকে তোমার কোন ক্ষতি করিনি!অরুন্ধতী আদরের সুরেই বললেন- ভাই, তোর ভালোর জন্যই করছি। আমি চাই না, তুই স্বর্গে গিয়ে নরকের জ্বালায় ভুগিস!মানে!- সব্যসাচীর দু\'চোখ কপালে।ভাই তোকে সব বলছি। আগে তোর চোখ দুটি জায়গা মত এনে রাখ।– অরুন্ধতী অনুরোধ করে বলেন।সব্যসাচী আরো অবাক হন, সত্যি সত্যি চোখ দুটো কপালে উঠে গেছে। হাতে টেনে টেনে চোখ জায়গা মতো এনে বলেন- ঠিক আছে আনলাম। কিন্তু ব্যাপারটা বুঝলাম না! ইহলোকে আমি স্বর্গের জন্য হাহাকার করেছি। আর তুমি আমাকে নরকে টানছো? তা\'ও আবার যমদূতকে ঘুষ দিয়ে! আরে ধ্যাৎ! একজন যমদূত আর কতজনকে ইহলোক থেকে পরলোকে টেনে আনবে! মৃত্যুর পর তিনি এখানেই ফয়সালা করেন ডাণ্ডার বাড়ি দিয়ে। উনার কী এত সময় আছে নাকি তোকে নিয়ে গিয়ে স্বর্গ আর নরকে ধরে ধরে পৌঁছে দিবেন!- অরুন্ধতী এক নিঃশ্বাসে বলেন।সব্যসাচী বিস্ময়ে অবাক হয়ে বলেন- তাহলে পাপ-পূণ্যির হিসাব কীভাবে হয়?চিত্রগুপ্তের নাম শুনিসনি!হ্যাঁ শুনেছি।চোখের ইশারায় অরুন্ধতী বলেন- ওই যে কম্পিউটার নিয়ে বসা। উনার হাতেই পাপ-পূণ্যি হিসাবের মেগা চিপ। সব হিসাব-নিকাশ করে উনিই নির্ধারণ করে দেন। আর উনার নির্দেশেই যমদূতজি ডাণ্ডা দিয়ে একখান বসিয়ে স্বর্গে অথবা নরকে পাঠিয়ে দেন, ব্যস্।তা বুঝলাম, কিন্তু ওটা কী?- অরুন্ধতীর হাতে রাখা চিপটা দেখিয়ে সব্যসাচী বলেন।অরুন্ধতী হাসতে হাসতে বলেন- এটাই তো আসল চাবিকাঠি। এটাই এখানকার প্রধান আকর্ষণ। এটা নিয়েই স্বর্গ-নরকের খেলা চলে।মানে বুঝলাম না!- সব্যসাচী বেশ অবাক হয়েই বলেন।এই চিপ দিয়ে উনি একঘন্টা আনন্দ-ফূর্তি করতে পারবেন। নরকের সকল আনন্দ দেখে দেখে উপভোগ করবেন।সব্যসাচীর কপাল কুঁচকে আসে এবং যমদূতকে দেখিয়ে বলেন- উনি যদি আনন্দ-ফূর্তিতে চলে যান তাহলে ডাণ্ডা চালাবে কে?অরুন্ধতীর সাফসাফ জবাব- আরে তুই এত চিন্তা করছিস কেন? শিফটিং ডিউটি আছে।আচ্ছা, তাই বলো! আমি ভেবেছিলাম একটানা কীভাবে ডিউটি করেন! আচ্ছা দাদা, সবই বুঝলাম। কিন্তু আমাকে তুমি স্বর্গে না পাঠিয়ে নরকে নিতে চাচ্ছো কেন?আরে বোকা নরকেই স্বর্গের সুখ। আর স্বর্গ হলো নরক-যন্ত্রণার কুণ্ডলী।না দাদা, তুমি যতকিছুই বলো আমি স্বর্গেই যাবো।লক্ষী ভাইটি আমার। আমি কি তোর অমঙ্গল চাইতে পারি?দাদা, অনেক কষ্ট করে পূণ্যি করে আমি স্বর্গের আবাসন স্থায়ী করেছি। গুরুজির পা ধুয়া জল খেয়েছি, নিজে না খেয়ে সব ভালো ভালো খাবার গুরুজিকে খাইয়েছি, গুরুজির চৌদ্দগোষ্ঠীর পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম ঠুকেছি। এমনকি আমার হাঁটুর বয়সীদেরও পায়ে মাথা ঠেকিয়েছি। এত কষ্ট করে স্বর্গপ্রাপ্তি হলাম। অথচ তুমি আমাকে টানছো নরকে। না দাদা, আমি স্বর্গেই যাবো।ভাইটি আমার, অমন ছেলেমানুষি করিস না। দাদা, তুমি তোমার ইচ্ছে মতো নরকে থাকো। আমি নরক ভোগ করতে চাই না।ঠিক আছে ভাই, তোর কথাই থাকবে। শুধু আমাকে একটিবার সুযোগ দে। আমি তোকে সবকিছু দেখাবো তারপর তুই ডিসিশন নিস।অনেক চিন্তা-ভাবনা করে সব্যসাচী বলেন- আচ্ছা ঠিক আছে দাদা।যমদূতকে একঘন্টার চিপটি হস্তান্তর করে অরুন্ধতী বলেন- হুজুর আপনার পাওনা আমি আপনাকে বুঝিয়ে দিলাম। শুধু একটু সুযোগ দিন, আমার ভাইকে স্বর্গ-নরকের অবস্থাটা একটু দেখিয়ে নিয়ে আসি।ঠিক আছে যাও। তবে বেশিক্ষণ সময় নেবে না। স্রেফ আধঘন্টার মধ্যে ফিরে আসবে। কারণ ডিউটি শেষে আমাকে হিসাব মিলিয়ে দিয়ে যেতে হবে।হুজুর এইটা আপনার কেমন বিচার! আমি আপনাকে একঘন্টার চিপ দিলাম, আর আপনি আমাকে মাত্র আধঘন্টা সময় দিচ্ছেন! হুজুর মাইণ্ড কইরেন না। বোনাস হিসেব করলেও তো এক ঘন্টা পাই নাকি?- অরুন্ধতী একটু রসিকতা করেই বলেন।যমদূত হাসতে হাসতে বলেন- বাঙাল! তোমাদের সাথে আর পারলাম না। ঠিক আছে যাও। তবে সময় মতো চলে এসো। পরে কিন্তু কোন অজুহাত চলবে না।জি হুজুর, ঠিক সময়েই চলে আসবো।*ভাই, আমি যেভাবে বলবো ঠিক সেভাবে সাবধানে চলবি। কী ঠিক আছে?- অরুন্ধতী বুঝিয়ে বলে জানতে চান।ঠিক আছে দাদা, তুমি যেভাবে বলবে সেভাবেই চলবো। কিন্তু আমার ডিসিশনে আমি যাবো। আমার যেটা পছন্দ হবে আমি সেখানে যাবো।– সব্যসাচী শর্ত আরোপ করে বলেন।আচ্ছা ঠিক আছে ভাই। তুই কোথায় যাবি সেটা তোর ডিসিশন অনুযায়ীই হবে। আগে আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোন।ঠিক আছে দাদা, নিশ্চিন্তে বলতে পারো।এখানে চারটি স্থান আছে। স্বর্গ, নরক, পাবলিক প্লেস আর স্পেশাল প্লেস।পাবলিক প্লেসও আছে!- সব্যসাচী অবাক হয়েই জানতে চান।এখানকার পাবলিক প্লেস আমাদের দুনিয়াদারির মতো নয়। একটু অন্যরকম।ঠিক আছে বলো।ঐ চারটি প্লেসে চারটি এলইডি ডিসপ্লে লাগানো আছে। স্বর্গে লাগানো থাকে নরকের ডিসপ্লে, নরকে থাকে স্বর্গেরটা, পাবলিক প্লেসে স্বর্গ আর নরকেরগুলো ফিফটি ফিফটি করে ডিসপ্লে।ফিফটি ফিফটি মানে!- সব্যসাচী জানতে চায়।স্ক্রীণ একটা কিন্তু অর্ধেকটাতে স্বর্গের সব দেখা যায় আর বাকি অর্ধেকটাতে নরকের জায়গার সব দেখা যায়। আর চতুর্থটা থাকে স্পেশাল প্লেসে। ওটা ভগবানের ওখানে থাকে।সব্যসাচী অবাক হয়। কথা বলতেও ভুলে গেছে। এত এত সুবিধা এখানেও!অরুন্ধতী আবার শুরু করে- এখানেই পাবলিক প্লেসেরটা আছে। তবে আমরা যারা মানুষ আছি তারা সেটা দেখতে পাই না। স্বর্গ এবং নরকের দায়িত্বে যারা আছেন তারাই শুধু দেখতে পান। যেমন- চিত্রগুপ্ত, যমদূত, পাহারাদার ওরা। তবে...।তবে কী দাদা?তবে পাবলিক প্লেসেরটাও দেখা যায়। কিন্তু তার ব্যবস্থা করা অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কিছু দালাল আছে ওদের ম্যানেজ করতে হয়।যেমন?- সব্যসাচী জানতে চায়।একটু আগে দেখলি না? যমদূতকে একটা একঘন্টার চিপ দিলাম। ওরকম আরেকটা স্পেশাল চিপ আছে। স্পেশাল চিপ দিয়ে দালালদের ম্যানেজ করতে হয়। তুমি কীভাবে ম্যানেজ করলে?সে এক বিশাল ইতিহাস। বলতে অনেক সময় লাগবে। পরে একসময় বলবো।না দাদা, এখনই বলো। পরে যদি আবার দেখা না পাই।ঠিক আছে। শর্টকাট বলছি; তুইতো জানিস আমি কত ধার্মিক ছিলাম।হ্যাঁ দাদা, তা\' জানি।তুই আমার ছোট ভাই। তবুও সব সত্যি কথা বলতে হবে।হ্যাঁ দাদা, সত্যি বললেই ভালো হবে।না বলেও উপায় নেই। ওই স্ক্রীণে সব দেখতে পাবি। যা বলছিলাম- ধর্মকর্ম ঠিকই করেছি। কিন্তু আড়ালে আবডালে অনেক কুকাম করেছি।কখন!- সব্যসাচী অবাক হয়ে জানতে চান।তোরা কেউ জানিস না। আমি তো খুব ধার্মিক ছিলাম তাই সবাই খুব বিশ্বাস করতো আমাকে।হ্যাঁ তা জানি দাদা। আমাদের এলাকায় ভালোমানুষ হিসেবে তোমার মতো আর কারো সুনাম ছিল না।ঐ সুযোগটাই আমি কাজে লাগিয়েছিলাম। অনেক কুকাম করেছি কিন্তু কেউ টের পায়নি। শুধু যার যার সাথে করেছি তারাই জানে। যাই হোক গয়া-কাঁশী ভিজিট করে পূণ্যি বলে আমি স্বর্গেই স্থান পেয়েছি। কিন্তু স্বর্গে গিয়ে তো আমি অবাক এবং ব্যথিত!কেন দাদা, কী হয়েছে?সেটাই তো বলছি। শোন, স্বর্গে আছে প্রায় সব বাওনরা, আমার মতো গুরুজির পা ধুয়া জল-খাওয়া পূণ্যিধারি লোকজন, অকর্মা আর নিষ্কর্মা সব ভালো লোকগুলো। অন্যদিকে নরকে আছে নাস্তিক, শিল্পী-সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী এককথায় যারা ভগবানের চরণে তেমন কোন কর্ম করেনি।তাহলে অবতার, দেব-দেবী, মুনি-ঋষি, মহাপুরুষ উনারা?- সব্যসাচী জানতে চায়।ওগুলো স্পেশাল কেস। ওই কেসগুলো ভগবান সরাসরি ডিল করে। অনেক কেস এখনো কয়েক হাজার বছর ধরে ঝুলে আছে। আচ্ছা দাদা, তুমি যেহেতু বলছো নরক ভালো। আবার আত্মীয় স্বজনকে এভাবে তোমার মতো এগিয়ে নেয়া যায়। তাহলে তো সবাই এগিয়ে এসে নিজেদের লোকগুলোকে নিয়ে যাবে।সবাই নিবে না।কেন দাদা?ওই যে হিংসা।হ্যাঁ, হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি।কী ভাবছো দাদা?না তেমন কিছু না। তোর কথা ভাবছি ভাই। হ্যাঁ, যা বলছিলাম; তোকে প্রথমে নরকে নিয়ে যাবো। তারপর স্বর্গে। কী কী আছে তা দেখানোর জন্য।তুমি যেটা ভালো মনে করো।স্বর্গ এবং নরকের দ্বারে দেখবি একটা করে লাল দাগ আছে। ঘুনাক্ষুরে ওখানে পা রাখবি না। তাহলে কিন্তু অটোমেটিক ঢুকে যাবি।আচ্ছা ঠিক আছে। আগে ডিসিশন নিয়ে তারপর যাবো। একদম ঠিক।*ঐ যে দেখ, ঐটা হলো নরক!- অরুন্ধতী আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে বলেন।ওএমজি!- সব্যসাচীর আশ্চর্য উচ্চারণ- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর! রাজারামমোহন রায়! রবিঠাকুর! জগদীশচন্দ্র বসু! উত্তমকুমার! কিশোরকুমার!- একেকজনের ওপর চোখ যাচ্ছে আর সব্যসাচী ক্রমশঃ অবাকই হচ্ছেন; সব বিখ্যাত বিখ্যাত লোকজন নরকে! যতদূর চোখ যায় চোখের পাতা জুড়িয়ে আসে। আহা! কী শান্তি। নরকের লোকগুলো দেখেই মনটা জুড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আগুনের কুণ্ডলীর ওপর চোখ পড়তেই বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে সব্যসাচীর। দাদা, ওই যে নরকের আগুন!আরে বোকা! আগুন ঠিকই, কিন্তু এই আগুনের কোন আঁচ নেই। ওই আগুন ফায়ার প্লেসের মতো মোলায়েম তাপ দেয়।কেমন করে সম্ভব!- সব্যসাচী অবাক হয়েই বলে।শীত প্রধান দেশে দেখিস নি? ঘরে ঘরে ফায়ার প্লেস জ্বালিয়ে রাখে। তা জানি। কিন্তু ওগুলো তো শীতপ্রধান দেশে। কিন্তু এটা তো নরক।দেখছিস না এখানে কা\'রা আছেন। সাথে সব বিজ্ঞানীরাও আছেন। তো বুঝতেই পারছিস; সবটুকু নরক এয়ারকন্ডিশন্ড করে ফেলেছে।ভগবান টের পায়নি?দালাল আছে তো। ঐ যে দেখছিস, ওদের মধ্যেই দালাল আছে। দেখতে তো মহাপুরুষ মহাপুরুষ ভাব। একেবারে সন্ন্যাসীর মতো মনে হচ্ছে!সব ম্যানেজ হয়ে যায়। ওরাও তো একটু আরাম আয়েশ চায় নাকি?এলইডি স্ক্রীণে চোখ পড়তেই সব্যসাচী অবাক এবং বলেন- ওএমজি! মাধুরী দীক্ষিতের নাচ চলছে! উনিতো এখনো বেঁচে আছেন!ক্যাসেট চলে এসেছে।তাই বুঝি দাদা!হ্যাঁ ভাই। আরো দেখবি?আর কী আছে?সব আছে। যা দেখতে চাইবি সব। এই নরক একেবারে আমাদের কল্পিত স্বর্গের মতো। তবে কোনরকম নোংরামি নেই এবং চলবে না। যার যারটা নিয়ে সে সে ব্যস্ত। এখানে শুধু আনন্দ, সুখ আর শান্তি। দেখছিস না চারদিক সুগন্ধময়! ঠিক বলেছিস দাদা। নরকেই এত স্বর্গসুখ! তাহলে তো স্বর্গে আরো বেশি হবে। চল দাদা, স্বর্গটা একটু দেখে আসি।চল ভাই, এবার স্বর্গে যাই।স্বর্গের দ্বারের কাছে এসেই সব্যসাচী নাক চেপে ধরে বলেন- দাদা মরে গেলাম!আহা! তুই তো মরেই গেছিস আর মরবি না।কিন্তু এটা তো মরণ থেকেও আরো কষ্টের! এই উৎকট পঁচা দুর্গন্ধ আমি সহ্য করতে পারছি না। এমন তো কখনো দেখিনি; সুন্দর ফুল বাগান, থরে থরে সাজানো ফলের বাগান, অগণিত অপ্সরার পদচারণা অথচ উৎকট দুর্গন্ধের ছড়াছড়ি। ব্যাপার কী দাদা!অরুন্ধতী হাসতে হাসতে বলেন- এটাই তো রহস্য! আগে দেখে নে কে কে আছে।পৈতাধারী বাওনসব মন্ত্রেতন্ত্রে ব্যস্ত, তোমার মতো ধার্মিক লোক, সব তো ভালো লোকই দেখছি, অবশ্য ঠগ-বাটপারও আছে!- বেশ অবাক হয়েই সব্যসাচী বলেন।ঠিকই দেখেছিস। এলইডি স্ক্রীণে তাকিয়ে দেখ। ওখানে তো নরকের স্বর্গীয় দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। আহা শান্তি, শান্তি, শান্তি! মনপ্রাণ জুড়িয়ে আসে। ঠিক ধরেছিস। স্বর্গের লোকেরা দেখে নরকের দৃশ্য আর নরকের লোকেরা দেখে স্বর্গের দৃশ্য। অবশ্য নরকের এলইডি স্ক্রীণটা ওরা প্রায়ই বন্ধ রাখে কারণ স্বর্গের দুর্গন্ধ নাকি এলইডি স্ক্রীণ ভেদ করে বেরিয়ে আসে।আচ্ছা দাদা, স্বর্গের ওরা তো ভাল কাজই করেছে। তবে এই অবস্থা কেন?ওদের কর্ম এই পর্যন্তই। শুধু খাও আর ছাড়ো, খাও আর ছাড়ো। ভালো থাকার ব্যবস্থা করারও মুরোদ নেই। পরনের কাপড়টা খুলে নিয়ে নিলে তো স্বর্গে-মর্ত্যে ন্যাংটো থাকবে। কোন মুরোদ আছে একখান তেনা বানানোর?দাদা বুঝতে পেরেছি। চল চল দুর্গন্ধে আমি আর টিকতে পারছি না।এখন বুঝো ঠ্যালা, ভেতরে কী অবস্থা!সত্যি বলেছিস দাদা। এমন স্বর্গের আমার দরকার নেই।ধন্যবাদ ভাই বুঝতে পারার জন্য। চল নরকেই যাই; ওখানে সব পাবি। এই, এই লাল দাগে পা পড়ে গেল!- এই বলে অরুন্ধতী এক টানে সব্যসাচীকে স্বর্গের লাল দাগ থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে এলেন।দেয়ালে মাথাটা ঠুকে যেতেই সব্যসাচী মাথায় হাত রেখে কুঁকড়ে ওঠলেন- ইস!ঘুমের ঘোর কেটে যেতেই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে বসলেন সব্যসাচী। তারপর স্বগোক্তি; যাক বাঁচা গেল এমন স্বর্গের আমার দরকার নেই!শেষ
ঐ যে দেখ, ঐটা হলো নরক!- অরুন্ধতী আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে বলেন।ওএমজি!- সব্যসাচীর আশ্চর্য উচ্চারণ- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর! রাজারামমোহন রায়! রবিঠাকুর! জগদীশচন্দ্র বসু! উত্তমকুমার! কিশোরকুমার!- একেকজনের ওপর চোখ যাচ্ছে আর সব্যসাচী ক্রমশঃ অবাকই হচ্ছেন; সব বিখ্যাত বিখ্যাত লোকজন নরকে! যতদূর চোখ যায় চোখের পাতা জুড়িয়ে আসে। আহা! কী শান্তি। নরকের লোকগুলো দেখেই মনটা জুড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আগুনের কুণ্ডলীর ওপর চোখ পড়তেই বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে সব্যসাচীর। দাদা, ওই যে নরকের আগুন!আরে বোকা! আগুন ঠিকই, কিন্তু এই আগুনের কোন আঁচ নেই। ওই আগুন ফায়ার প্লেসের মতো মোলায়েম তাপ দেয়।কেমন করে সম্ভব!- সব্যসাচী অবাক হয়েই বলে।শীত প্রধান দেশে দেখিস নি? ঘরে ঘরে ফায়ার প্লেস জ্বালিয়ে রাখে। তা জানি। কিন্তু ওগুলো তো শীতপ্রধান দেশে। কিন্তু এটা তো নরক।দেখছিস না এখানে কা\'রা আছেন। সাথে সব বিজ্ঞানীরাও আছেন। তো বুঝতেই পারছিস; সবটুকু নরক এয়ারকন্ডিশন্ড করে ফেলেছে।ভগবান টের পায়নি?দালাল আছে তো। ঐ যে দেখছিস, ওদের মধ্যেই দালাল আছে। দেখতে তো মহাপুরুষ মহাপুরুষ ভাব। একেবারে সন্ন্যাসীর মতো মনে হচ্ছে!...
0 Comments