গল্পনষ্ট ছেলেআফছানা খানম অথৈখুনি রাহুলের আজ ফাঁসি হবে।দশ বছর আগে সে এক রাজনীতিক নেতাকে প্রকাশ্যে স্টেজে বক্তৃতা অবস্থায় গুলি করে খুন করে।এরপর পুলিশ তাকে এরেস্ট করে থানায় নিয়ে যায়।এত বছর মামলা চলছিল।আজ জজ সাহেব চুড়ান্ত রায় ঘোষণা করলেন।তার ফাঁসির রায় কার্যকর হলো।আজ রাত ১২:০১ মিনিটে তাকে ফাঁসি দেয়া হবে।জেলার তাকে জিজ্ঞেস করলেন,তোমার শেষ ইচ্ছা কী?,আমার কোনো শেষ ইচ্ছা নেই?বলো কী!তোমার মা-বাবার সাথে দেখা করবে না?জ্বি না স্যার?কেন কোন সমস্যা?জ্বি স্যার অনেক সমস্যা,উনাদের কারণে আজ আমি সন্ত্রাসী খুনি? বলো কী!সত্যি স্যার।আমি বিশ্বাস করি না।কারণ কোনো মা-বাবা সন্তানের খারাপ চায় না।ভুল বললেন স্যার। মা-বাবা ভালো হলে সন্তান ভালো হয়।আর মা-বাবা খারাপ হলে সন্তান খারাপ হয়।আমার মা-বাবা তার একটা উহাহরণ।তা কিভাবে,আমি ঠিক বুঝলাম না।স্যার সে অনেক লম্বা কাহিনী...।তুমি বলো আমি শুনব।বলছি স্যার,আমার বাবা-মা দুজনে চাকরীজীবি ছিলেন।মা-অ্যাডভোকেট,বাবা ম্যাজেজট্টেট ছিলেন।টাকা পয়সার কমতি ছিলো না।দুজনে ভালো টাকা আয় করতেন।মাস শেষ মোটা আমাউন্ট আসত।কিন্তু আমাদের সংসারে কোনো সুখ ছিলো না।ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি মা-বাবার ঝগড়া।এমন কোনোদিন ছিলো না যে মা-বাবা ঝগড়া করেনি।মা-বাবা দুজনকে খুব ভয় করতাম।কিছু বলার মতো বয়স তখন হয়ে উঠেনি।তাই কিছু বলতে পারতাম না।তাছাড়া মা-বাবা আমাকে তেমন একটা সময় দিতেন না।কাজের মেয়ে আমাকে দেখাশুনা করতো।পড়ালেখা মন বসাতে পারতাম না।সব সময় টেনশনে থাকতাম।মা- বাবা আমার কেয়ার করতেন না।তারা ব্যস্ত থাকতেন অফিস আদালত নিয়ে।যেটুকু সময় বাসায় থাকতেন তা ঝগড়ার মাঝে কেটে যেত।ছেলে কি খেলো না খেলে তা দেখার সময় কোথায়।দুজন দু\'জনকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ভাষা ব্যবহার করতো।কেউ কাউকে সেক্রিফাইজ করত না।দু\'জনের মাঝে প্রায় সময় গৃহযুদ্ধ লেগে থাকত।এই গৃহযুদ্ধের মাঝে আমি বেড়ে উঠেছি।আস্তে আস্তে আমি লেখাপড়া থেকে দূরে সরে যায়।খারাপ ছেলেদের সাথে মেলামেশা শুরু করি।কোনোমতে টেনেটুনে ম্যাট্টিক পাশ করি।তারপর কলেজে ভর্তি হই।কলেজে ভর্তি হওয়ার পর শরীরে একটা ভাব চলে আসে।বড় ভাইদের সাথে রাজনীতিতে যোগ দিই।জীবন পাল্টে যায়।মাস্তানি চাঁদাবাজি,মারামারি,খুন খারাবি শুরু করি।একদিন এক ছাত্রকে মার্ডার করি।পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যায়।বাবা- মা দুজনে আইনের লোক আমার জামিন ঠেকায় কে?আমি জামিনে মুক্তি পেয়ে যায়।এরপর থেকে শুরু হয় মিশন,আজ একে কাল ওকে মার্ডার করা আর জেলে যাওয়া নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে গেল।বাবা-মা কখনো এসব কাজে বাঁধা দিতেন না।তাছাড়া তারা নিজেরা ও অনেক অন্যায় করতেন।ঘুষ খেতেন,সত্যকে মিথ্যা,মিথ্যাকে সত্য বলে রায় দিতেন।।আমি যখন ইন্টারে পড়ি তখন একদিন একলোক হন্তদন্ত হয়ে আমার বাবার কাছে আসল।লোকটি কেঁদে কেঁদে আমার বাবার পা চেপে ধরে বলল,স্যার আমার ছেলেটাকে বাঁচান?আপনার ছেলের কী হয়েছে?স্যার আমার ছেলেকে মার্ডার কেচে ফাঁসানো হয়েছে।আমার ছেলে মার্ডার করেনি।সত্যি বলছেন?জ্বি স্যার সত্যি?প্রমাণ দিতে পারবেন?জ্বি স্যার পারব।স্যার একমাত্র আপনি পারেন তাকে বাঁচাতে।ঠিক আছে আপনি প্রমাণ নিয়ে আদালতে হাজির হবেন।আর একটা কথা...।জ্বি স্যার বলুন।আসলে সত্যি কথা বলতে কি,আদালতের ব্যাপার বুঝতে পারছেন,টাকা...।স্যার কত টাকা লাগবে?বেশি না লাখ পাঁচেক হলে চলবে।বুঝতেই পারছেন মার্ডার কেচ বলে কথা।স্যার আমার কাছে এত টাকা নেই।জমিজমা আছে?জ্বি স্যার আছে।বিক্রি করে নিয়ে আসেন।লোকটি সময়মতো পাঁচ লাখ টাকা এনে আমার বাবার হাতে দিলেন।বাবা তার ছেলেকে মার্ডার কেচ থেকে খালাস দিয়ে দিলেন।আসলে ছেলেটা ছিলো নির্দোষ। এভাবে আমার বাবা লোকের কাছ থেকে ঘুষ খেতেন।অনুরুপ একদিন দেখলাম আমার মায়ের কাছে এক লোক আসল,লোকটি ভালো না,স্ত্রীকে নির্যাতন করতো,পরকীয়া করতো।একদিন তার স্ত্রী সবকিছু জেনে যায়। এই নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে দ্বন্ধ হয়।মাঝরাতে সে তার স্ত্রীকে মেরে ফেলে।মায়ের কাছে এসে সব সত্য প্রকাশ করে এবং মৃত্যুটাকে নরমাল বলে কেচ সাজানোর জন্য মায়ের হাতে পায়ে ধরে। মা রাজী হয়ে যায়।তবে শর্ত একটা, মোটা এমাউন্ট টাকা লাগবে।লোকটি রাজী হয়।আর এই সুযোগে মা অনেক লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।আর এই টাকার বিনিময়ে মা একজন খুনিকে নির্দোষ প্রমাণ করে।তার সাজা মওকুফ করে আদালত তাকে খালাস দিয়ে দেয়।এভাবে আমার মা-বাবা মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিতেন।টাকা ছিলো আমার মা-বাবার জীবনে সব।প্রেম ভালোবাসা,স্নেহমমতা নেই বললে চলে।আমি একমাত্র সন্তান নষ্ট হয়ে যাচ্ছি সেদিকে তাদের খেয়াল নেই।নেশা করে অনেক রাত করে বাসায় ফিরতাম।এই নিয়ে বাবা-মার কোনো অভিযোগ নেই।একদিন সকালবেলা ঘর থেকে বের হতে দেখালাম একটা বুড়ো লোক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।আমি জিজ্ঞেস করলাম,আপনি কে?লোকটি জিজ্ঞেস করলো,এটা কি রাজ্জাক সাহেবের বাসা?জ্বি হ্যাঁ।আপনি উনার কি হোন?আমি ওর বাবা।তার মানে আপনি আমার দাদু।ঠিক বলেছ,দাদু ভাই।আমি তাকে ভিতরে ডেকে নিয়ে বসতে দিলাম।বাবা আসলেন দাদুকে সালাম করে কুশল বিনিময় করলেন।তারপর দাদু বললেন,বাবা রাজ্জাক,সন্তান মা-বাবাকে ভুলে থাকতে পারে।কিন্তু বাবা-মা সন্তানকে ভুলে থাকতে পারে না।এত কষ্ট করে তোকে মানুষ করলাম।অথচ তুই আমাদের কোনো খোঁজ খবর নিস না।টাকা পয়সা দিস না।বুড়ো হয়ে গেছি।এখন আর কাজকর্ম করতে পারি না।সংসার চালাতে কষ্ট হয়।কোনোবেলা খাই,কোনোবেলা উপোষ থাকি।তাছাড়া তোর মা খুব অসুস্থ।টাকার জন্য ডাক্তার দেখাতে পারছি না।এতদিন গায়ে শক্তি ছিল,কাজ করে সংসার চালিয়েছি।তোর কাছে কিছু চায়নি।আজ আর পারছি না।তাই বলছি,এখন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের দায়িত্ব তুই নেহ বাবা।তোর কাছে বেশি চায় না।মাসে মাসে সাধারণভাবে কোনোমতে খেয়ে পরা চলার মতো কিছু টাকা আমাদের দেহ্ বাবা।ঠিক আছে বাবা দেব।তুমি কোনো চিন্তা করো না।বাবা কিছু টাকা দাদুর হাতে গুজে দিতে মা দেখে ফেলল।তখনি দাদুর হাত থেকে টাকা কেড়ে নিয়ে বলল,তোমার বাবাকে টাকা দিলে যে?তো কী হয়েছে?কী হয়নি মানে।উনার এতবড় সাহস কি করে হয়, আমার বাসায় আসার।ছেলের বাসায় বাবা আসবে এতে সাহসের কী দেখলে?আপনার সাহস তো কম নয়।এখনো বসে আছেন।ভালো ভালোই চলে যান।তানা হলে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেব।দাদু বের হতে প্রস্তুত হলেন।বাবা তাকে বসিয়ে দিয়ে বললেন,সিমরান অনেক সহ্য করেছি আর নয়।তোমার জন্য মা-বাবাকে ত্যাগ করেছি।কোনো দায়িত্ব পালন করেনি।আমি বড় ভুল করেছি।আর কোনো ভুল করতে চায় না।ভালোই ভালোই বলছি টাকা দিয়ে দাও।না আমি টাকা দেব না।উনাকে আমার চোখের সামনে থেকে যেতে বলো।তুমি টাকা দিয়ে দাও,বাবা চলে যাবে।না টাকা দেব না।টাকা তোমাকে দিতেই হবে।বাবা জোর করে টাকা কেড়ে নিতে চাইলে,মা বাবার গায়ে হাত তোলে,এবং খুব মারধর করে।আমি নিরুপায় হয়ে পুলিশে ফোন করি।পুলিশ এসে মায়ের হাত থেকে বাবাকে রক্ষা করে।এরপর মা সিদ্ধান্ত নেয় সেপারেট হওয়ার।বাবা তাতে সাঁই দেয়।দুজন সেপারেট হয়ে যায়।মা নানা বাড়ি চলে যায়।আমি বাবার কাছে থেকে যায়।একটি বারের জন্য আমাকে নিতে চাইল না মা। মাস খানেক পরে জানতে পারলাম মা খুব অসুস্থ ব্লাড ক্যান্সার,উন্নত চিকিৎসার দরকার।অনেক টাকা লাগবে।মায়ের অসৎভাবে আয় করা সব টাকা শেষ হয়ে গেল।তবুও মায়ের চিকিৎসা হলো না।এক সময় মারা গেলেন।এদিকে বাবা ও ভালো নেই।মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েছেন।আর আমি পুরোপুরি নেশা গ্রস্ত হয়ে পড়ি।রোজ একটা দুটা মার্ডার খুন করে বাসায় ফিরি।রাজনীতিবীদরা টাকা দিয়ে সব ধামাচাপা দেন।আমি হুকুমের গোলাম,টাকার বিনিময়ে যখন যে যা করতে বলে,তাই করি।থানায় যায়,আর আসি।এভাবে চলছিল জীবন।একদিন মাঝরাতে বাসায় ফিরে দেখি বাবা ফ্লোরে পড়ে আছে।বাবা বাবা বলে কয়েকবার ডাক দিলাম।কোনো সাড়াশব্দ নেই।এতরাতে কি করব না করব ভেবে পাচ্ছিলাম না।তবুও এম্বুলেন্স কল করলাম।অনিচ্ছা সত্বেও বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে গেলাম।ডাক্তার বাবাকে মৃত বলে ঘোষণা করলো।বাবাকে নিয়ে বাসায় ফিরলাম।দাফন কাপন শেষ করলাম।আমার বাবা মাকে কখনো কোনো ভালো কাজ করতে দেখিনি।আর আমি তা দেখে দেখে সব খারাপের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছি।আমি হয়ে গেছি নষ্ট ছেলে।আমার মা বাবা উচ্চশিক্ষিত ছিলেন সেটা ঠিক আছে।তবে ভালো মানুষ হতে পারেননি।কারণ এক গাদা টাকা আর বড় সার্টিফিকেট থাকলে ভালো মানুষ হওয়া যায় না।ভালো মানুষ হতে হলে মনুষ্যত্ব থাকতে হয়।মানবীয় গুণাবলী থাকতে হয়,উত্তম চরিত্রের অধিকারী হতে হয়।সত্যবাদী হতে হয়।নামাজী হতে হয়।আমার মা-বাবার মাঝে এসব গুনাবলি ছিলো না বিধায় তারা অমানুষে পরিণত হয়েছে।তাই ভালো কাজ না করে সব সময় খারাপ কাছ করেছে।টাকার পেছেনে ছুটেছে।তাদের পাপের ফসল আমি হয়ে গেলাম একজন নষ্ট ছেলে।সব বুঝলাম।কিন্তু তুমি এ মামলার আসামী হলে কী করে?নেতাকে খুন করার জন্য আমাকে উপর থেকে অর্ডার করা হলো। কি করব আমি নিরুপায় হয়ে সরাসরি বক্তৃতারত অবস্থায় তাকে খুন করি।চোখের সামনে খুন পার পাব কিভাবে।ফাঁসির রায় হয়ে যায়।আমি নষ্ট ছেলে বেঁচে থাকলে কি,আর না থাকলে কি?ততক্ষণে রাত ১২:০১ মিনিট বেজে গেল।রাহুলের ফাঁসি কার্যকর হলো। ঃসমাপ্তঃ
0 Comments