কোথায় যেন প্রান্তরের নিস্তব্ধ নিরবতা,
কোথায় যেন নীলিমায় অপলক চঞ্চলতা!
কোথায় যেন ধূ ধূ মরুর রিক্ত স্বপন,
স্নিগ্ধতার প্রশান্ত পরশ, যেন খানিক ঠাঁই পাওয়া।
লিখছিলাম, বহুদিন পর। আজকাল কেন যেন আর নিয়ম করে লেখা হয়ে ওঠে না। একটা সময় প্রচুর লেখা হতো। মেঘে মেঘে বয়সটাও কম হলো না। আজ আমার জন্মদিন। বয়স ৭৬ হলো। জীবন উপাখ্যানের আরও একখানা পত্র পরিপূর্ণ হলো। জীবন সম্পর্কে এ ক\'বছরের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, জীবনটা অম্ল-মধুর। কখনো তীব্র বিষাদ, কখনো একরাশ আনন্দ আমার জীবনকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করেছে। সেই সময়গুলোও বেশ কেটেছে। এখন আমার অখণ্ড অবসর।
আমি থাকি পাহাড়ের ছোট্ট একটা বাড়িতে। আমার বহুদিনের স্বপ্ন ছিল, পাহাড়ে থাকবো। তাই যান্ত্রিকতার ভীড়ে থাকার আবশ্যকতা সম্পন্ন হওয়ার পর পাহাড়কেই বেছে নিয়েছি। বেশ ঠান্ডা বাতাস। এক কাপ উষ্ণ চায়ের সাথে এর বেশ ভালো সখ্য আছে বোধহয়! যখনই একটু চা নিয়ে নিরিবিলিতে ঠান্ডা বাতাসে বসি, ঠিক তখনই চায়ের প্রতি অদ্ভুত একটা টান অনুভব করি। শহর ছেড়েছি আজ প্রায় ১০ বছর হতে চলল! কেউ খোঁজ নিল না। আমি অবশ্য চিরকালই মানুষের থেকে একটু দূরে দূরে থেকেই অভ্যস্ত। তার ওপর আবার যোগাযোগের জন্য মোবাইল ফোন, টেলিফোনও আমি ব্যবহার করি না। তবুও আজ মনে হচ্ছে কেউ যদি একটু খোঁজ নিতো। কোনো প্রয়োজন হলে এখানকার স্থানীয় উপশহরে যাই। এখানে ডাকে চিঠি আসে। সবই প্রয়োজনের চিঠি। কেউ বোধহয় আজকাল আর অপ্রয়োজনে শুধুমাত্র একটু খোঁজ নেওয়ার আড়ালে সুদীর্ঘ একখানা পত্র লেখার প্রয়োজনবোধ করে না। এই ১০ বছরে একটা চিঠিও আসেনি।
শেষ বয়সে মানুষের তেমন কোনো শখ থাকে না। আর থাকলেও যখন শরীরে শক্তি ছিল, তখনকার শখগুলোর মতো করে পূরণ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভূত হয় না। শখের মধ্যে যা করার, লেখালেখি-ই যা। মাঝে মাঝে বিকেলে আমার ছোট্ট ঘরের জানালার পাশে বসে লিখি। কোনো কোনো দিন তো লিখতে লিখতে ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় হুঁশ ফেরে। আজ আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর একটা সময়ের কথা খুব মনে পড়ছে। আমার খুব কাছের, প্রিয় একজন বন্ধুর সাথে কাটানো স্মৃতি বিজড়িত মূল্যবান কিছু সময়, মুহূর্ত; যেন একটু হাত বাড়ালেই স্মৃতি থেকে বাস্তব হয়ে উঠবে জীবন্ত সেই সময়গুলো! বলছি আজ থেকে প্রায় ৫৮ বছর আগে পেরিয়ে আসা আমার কলেজ জীবনের কথা। খুব ছোট্ট একটুকরো সময় কিন্তু আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনটা সেসময়েই হয়েছে। ভাস্কো দ্য গামা যেমন ভ্রমণ করতে করতে ভারতবর্ষের মতো ঐশ্বর্য, প্রাচুর্য আবিষ্কার করেন; ঠিক তেমন একটা আবিষ্কার! এই অর্জন, আবিষ্কারটা টা হলো খুব ভালো একজন বন্ধু প্রাপ্তি। বন্ধু বলতে এর আগে তেমন কেউ-ই ছিল না। তবে বন্ধুত্ব যে কখনোই করতে চাইনি, এমনটাও নয়। আসলে হয়তো ওর মধ্যে বিশেষ কিছু একটা খুঁজে পেয়েছিলাম। এরপর শুধু দুজনের মিলগুলো নয়, অমিল গুলোও খুব সহজেই আমরা আপন করে নিয়েছিলাম। একটু একটু করে বহু বিষয় একে অপরের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়া, কলেজের অবসরের সময়গুলোতে একসাথে বসে গল্প করা, কোনো বিশেষ কাজ থাকলে একসাথে পরামর্শ করে করা, ছোট ছোট খুঁনসুঁটিতে কত মধুর সময়-ই না কেটেছে আমাদের! তবে এতো সুন্দর বোঝাপড়া, স্মৃতির অবারিত সম্ভাবনা খুব বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। তবে একসময় আমাদের কথা কমে যেতে থাকে। কথার সাথে সাথে সম্পর্কের দূরত্বও বাড়তে থাকে। কিন্তু কখনো আমরা দুজনের কেউই এই দূরত্বটাও ঘোঁচাবার চেষ্টা করিনি। তখন দুজনই একটু চেষ্টা করলে হয়তো আবার সব ঠিক হতো; আবার দারুণ একটা বন্ধন তৈরি হতো আমাদের! আমার প্রতি জন্মদিন, বিশেষ উপলক্ষ্য গুলোতে ওর কথা খুব মনে হয়। আমাদের জন্মদিনটাও খুব কাছাকাছি সময়ে ছিল। তবুও যেদিন খুব বেশি মনে পড়ে, সেদিন আমাদের একসাথে করা কিছু সময়ের ছোট ছোট স্মৃতি বিজড়িত বিষয় নিয়ে স্মৃতি রোমন্থনে বসি। এতো গুলো দিন, বছর চলে যাওয়ার পরও স্মৃতিগুলো খুব সতেজ মনে হয়। আমার প্রতি জন্মদিনে আমি ওকে একটা চিঠি লিখি। এখন ওকে একটা চিঠি লিখবো।
০৩ অক্টোবর,২০২৫
প্রিয় অর্ষমা,
কেমন আছিস? আশা করি ভালো আছিস। জন্মদিন কেমন কাটলো বল? আজকে তো আমার জন্মদিন। প্রতিবছরের মতো এবারও তোকেই চিঠি লিখতে বসলাম।
একটু আগেই আমাদের স্মৃতিগুলো মনে করছিলাম। কত সুন্দর সময় ছিল আমাদের! তোর মনে আছে, একসময় কলেজ ছুটির পর আমরা কত গল্প করতাম, মাঝে মাঝে একসাথে চটপটি খেতাম, একসাথে মাঝে মাঝে খেলতামও। এরপর কি হয়েছিল বল তো? হঠাৎ করেই সব শেষ হয়ে গেল! যাই হোক সময়গুলো সত্যিই মনে রাখার মতো ছিল। এখন হয়তো তোর আর সেসব কথা মনে নেই। আমার কথাও নিশ্চয়ই মনে নেই। এখন কোথায় আছিস, সেই খবরটাও জানি না। আমার চিঠিগুলোও তো তোর অব্দি পৌঁছায় না। তোর শহরে কি ডাকবাক্স আছে? তোকে লেখা কত্ত চিঠি জমে আছে আছে আমার বসার টেবিলের ড্রয়ারে! চিঠিগুলো পাঠিয়ে দিতাম। বেনামেই পাঠাতাম। যেন চিঠিগুলো আমি লিখেছি দেখে তোর কাছেও জমা পড়ে না থাকে। মানুষ বলে,পৃথিবীটা নাকি অনেক ছোট। তাই পরিচিত মানুষের সাথে নাকি দেখা হয়েই যায়! কই, আমাদের যে একবারও দেখা হলো না ! একটা কথা বলি, মান- অভিমান, রাগ করে থাকার জন্য আমাদের জীবনটা অনেক ছোট। কখনো যদি তোর মনে হয় আবার কথা বলা যায়, আমাকে ক্ষমা করা যায়; তাহলে কথা বলিস।
আমাদেরও হয়তো আবার দেখা হবে। আদেখা হওয়ার অপেক্ষায় থাকলাম। যেখানেই থাকিস, ভালো থাকিস। নিজের যত্ন নিস।
ইতি,
তোর কোনো একসময়ের খুব কাছের একজন বন্ধু,
সুধা
খুব আত্মিক সম্পর্কের বন্ধুত্ব হঠাৎ ঝড়ের বাতাসে তছনছ হয়ে গেলে মনে যে ভাঙন, তীব্র অবসাদের জন্ম হয়; সে যন্ত্রণা থেকে মুক্তির খানিকটা আছে এই গল্পে। জীবনের নিদারুণ ব্যস্ততার মাঝেও শৈশব-কৈশোর, কিংবা যৌবনে পদার্পণের প্রারম্ভিক সময়ের অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বের বিচ্ছেদে মানব মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, অভিমান, মনোঃকষ্ট বিশেষ একটি দিনকে কতখানি প্রভাবিত করতে পারে_ তার প্রেক্ষাপটেই এই গল্প রচিত হয়েছে। বন্ধুত্ব সকলের জীবনকে অর্থবহ করে তুলুক, প্রতিটি হৃদয় উদ্ভাসিত হোক বন্ধুত্বের হৃদ্যতায়।
শখ, ভালো লাগা থেকে অনেকেই লেখালেখি করে থাকেন। খুব ভালো লিখতে না পারলেও শখের বশে মাঝে মাঝে টুক-টাক লিখে ফেলি। ফেসবুক এ মুক্ত কলমের বিজ্ঞাপন দেখে ভাবলাম একটু চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। তাই মুক্ত কলমের সাথে যুক্ত হওয়া।
0 Comments