#গল্প বড় বোনআফছানা খানম অথৈবাবার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরেছিল বড় মেয়ে রেহানা। তখনও তার নিজের বয়স খুব বেশি নয়। ছোট তিন ভাই-বোন—বীথি, রিশাত ও নুহা—আর অসহায় মা। সংসারে উপার্জন করার মতো আর কেউ নেই।রেহানা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। স্কুলের বেতন দিয়েই কোনো রকমে সংসার চলে। কিন্তু সংসারের খরচ, ভাই-বোনদের পড়াশোনা, মায়ের ওষুধ—সবকিছুর দায়িত্ব যেন একাই তার কাঁধে।সময় গড়াতে লাগল।রেহানার বয়সও বাড়ছে। চারদিক থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসতে শুরু করল। মা-ও মেয়েকে বোঝাতে লাগলেন।—রেহানা, তোর বয়স তো কম হলো না মা। তুই নিজের সংসার কর। আমরা কোনো রকমে চলে যাব।রেহানা মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,—মা, আমি বিয়ে করে চলে গেলে ওদের কী হবে? ওদের লেখাপড়া শেষ হয়নি। ওদের মানুষ না করে আমি বিয়ের পিঁড়িতে বসব না।—কিন্তু তোর নিজের জীবন? তোর ভবিষ্যৎ?—আমার ভবিষ্যৎ ওরাই, মা।মায়ের চোখ ভিজে উঠল।তিনি বুঝতে পারলেন, মেয়েটা নিজের জন্য কিছুই ভাবছে না।রেহানা প্রতিদিন সকালে স্কুলে যায়। দুপুরে স্কুল ছুটি হলে বাড়ি ফিরে সংসারের কাজ সামলায়। সন্ধ্যা নামলেই টিউশনি করতে বেরিয়ে যায়। রাত করে বাড়ি ফেরে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে আবার ভাই-বোনদের পড়াশোনা দেখায়।এভাবেই দিনের পর দিন, বছরের পর বছর কেটে যেতে লাগল।কিন্তু যে বোনের ভবিষ্যতের কথা ভেবে রেহানা নিজের ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিয়েছিল, সেই বীথিই একদিন প্রেমে পড়ে গেল।—আপু, আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না। ওকে বিয়ে না করলে আমি আত্মহত্যা করব!রেহানা অনেক বোঝাল।—আগে লেখাপড়া শেষ কর। নিজের পায়ে দাঁড়া। তারপর বিয়ে করিস।কিন্তু বীথি কিছুতেই রাজি নয়।অবশেষে বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে রেহানা হার মানল। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ধুমধাম করে বোনের বিয়ে দিল।বীথি স্বামী-সংসার নিয়ে সুখেই রইল।এরপর রিশাত ও নুহার লেখাপড়াও শেষ হলো। চাকরির জন্য একের পর এক আবেদন, পরীক্ষা, ইন্টারভিউ—সবকিছুর খরচ জোগাল রেহানা।শেষ পর্যন্ত দুজনেরই ভালো চাকরি হলো।রেহানা মনে মনে ভাবল,‘এবার বুঝি আমার দায়িত্ব শেষ। এবার ওরা নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়েছে। এবার হয়তো আমি নিজের কথা ভাবতে পারব।’কিন্তু ভাগ্যের হিসাব অন্যরকম।রিশাত ও নুহা দুজনেই প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। তারা নিজেদের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করতে চায়।মা যখন রেহানার বিয়ের কথা তুললেন, তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিল,—আপু, আমাদের আগে বিয়ে করতে হবে। পরে তোমার কথা ভাবব।রেহানা কিছু বলল না।আবারও ব্যাংক থেকে ঋণ নিল। নিজের জন্য নয়—ভাই-বোনের বিয়ের জন্য।ধুমধাম করে রিশাত ও নুহার বিয়েও হয়ে গেল।বীথি চলে গেছে শ্বশুরবাড়ি। রিশাত স্ত্রীকে নিয়ে ব্যস্ত। নুহাও নিজের সংসারে ব্যস্ত।রেহানা?সে আগের মতোই সংসারের খরচ চালিয়ে যাচ্ছে।রিশাতের স্ত্রী স্বামীকে প্রায়ই বোঝায়,—তোমার বোন তো চাকরি করে। সংসারের খরচ সে-ই চালাক। তুমি এত টাকা বাড়িতে দেবে কেন?রিশাতও স্ত্রীর কথায় কান দেয়।রেহানা সব বুঝেও চুপ থাকে।কারণ সে জানে, যাদের জন্য নিজের জীবনটা উৎসর্গ করেছে, তাদের কাছে নিজের পাওনা চাইতে নেই।দিন যায়।মা বারবার মেয়েকে বিয়ের কথা বলেন।—রেহানা, এবার তো তুই বিয়ে করতে পারিস। সবাই নিজের নিজের সংসারে চলে গেছে।রেহানা শুধু মৃদু হেসে বলে,—আমার আর বিয়ের দরকার নেই মা। আমার বয়স তো আর কম নেই।মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।কিন্তু রেহানার বুকের ভেতর যে কতটা শূন্যতা, তা কেউ জানে না।একদিন স্কুলে ক্লাস নেওয়ার সময় হঠাৎ রেহানার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। তারপর সবার সামনে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে।সহকর্মীরা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন।জরুরি চিকিৎসা শুরু হলো। স্যালাইন, ইনজেকশন, নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা।কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরল।প্রাথমিক রিপোর্টে তেমন কিছু ধরা পড়ল না। ডাক্তার দুর্বলতা ভেবে কিছু ওষুধ দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন।কিন্তু ওষুধে কোনো কাজ হলো না।দিনদিন রেহানার শরীর আরও ভেঙে পড়তে লাগল।কিছুদিন পর আবার অজ্ঞান হয়ে গেল সে।এবার তাকে শহরের বড় হাসপাতালে নেওয়া হলো।একগুচ্ছ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রিপোর্ট হাতে নিয়ে ডাক্তার গম্ভীর হয়ে বললেন,—আপনার ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে।রেহানার মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।—ডাক্তার সাহেব, আমি কি ভালো হব?ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,—চিকিৎসা শুরু করতে হবে। তবে চিকিৎসাটা দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল।ব্যয়বহুল!এই শব্দটাই যেন রেহানার বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধল।তার নিজের কোনো সঞ্চয় নেই। জীবনের সবটুকু আয় সে খরচ করেছে মা, ভাই-বোন আর সংসারের পেছনে।সে একে একে ভাই-বোনদের কাছে গেল।প্রথমে বীথির কাছে।—বোন, তোর স্বামীর তো বড় ব্যবসা। আমার চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা দে। আমি তোদের জন্য কত কিছু করেছি।বীথি মুখ নামিয়ে বলল,—আপু, আমাদের হাতেও এখন টাকা নেই।রেহানা কিছুক্ষণ বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।—তোর জন্য আমি ঋণ করে বিয়ে দিয়েছিলাম বোন।বীথি কোনো উত্তর দিল না।রেহানা এবার রিশাতের কাছে গেল।—ভাই, তুই তো ভালো চাকরি করিস। আমার চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা দে।রিশাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,—আপু, আমারও অনেক খরচ। যা বেতন পাই, সংসার আর বউয়ের পেছনেই চলে যায়। হাতে কিছু থাকে না।রেহানা চুপ করে রইল।শেষে নুহার কাছে গিয়ে বলল,—বোন, তুই আর তোর স্বামী দুজনেই চাকরি করিস। আমার চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা দে।নুহা বলল,—আপু, আমরা তো লোন করে ফ্ল্যাট কিনেছি। প্রতি মাসে বেতন থেকে কিস্তি কেটে নেয়। আমাদেরও খুব টানাটানি চলছে।তিন ভাই-বোনের কাছ থেকেই একই উত্তর।টাকা নেই।অথচ এই তিনজনকে মানুষ করতে রেহানা নিজের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো বিসর্জন দিয়েছে।নিজের বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে।ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে।দিন-রাত পরিশ্রম করেছে।তাদের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের চোখের জল লুকিয়েছে।আজ তারা সবাই প্রতিষ্ঠিত।শুধু রেহানার জন্য তাদের হাতে টাকা নেই!রেহানা কাউকে কিছু বলল না।শুধু ঘরে ফিরে নিঃশব্দে বসে রইল।তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।মা আর সহ্য করতে পারলেন না।তিন সন্তানকে সামনে দাঁড় করিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বললেন,—তোরা মানুষ, নাকি জানোয়ার?তিনজনই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।মা বললেন,—যে বোন তোদের কথা ভেবে নিজের সংসার করেনি, নিজের সুখ বিসর্জন দিয়েছে, রাতদিন পরিশ্রম করে তোদের মানুষ করেছে, তোদের বিয়ে দিয়েছে, তোদের চাকরির পেছনে টাকা খরচ করেছে—আজ সেই বোন যখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে, তখন তোদের কাছে তার চিকিৎসার জন্য টাকা নেই?মায়ের কণ্ঠ ভেঙে গেল।—তোরা অমানুষের চেয়েও নিকৃষ্ট! তোদের সন্তান বলতে আজ আমার লজ্জা হচ্ছে। দূর হয়ে যা আমার সামনে থেকে!মায়ের চোখের পানি আর বাঁধ মানল না।কিন্তু রেহানা নীরব।সে কাউকে দোষ দিল না।কাউকে অভিশাপ দিল না।শুধু বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টটাকে চেপে ধরে বিছানায় শুয়ে রইল।যে মেয়েটা সারাজীবন অন্যদের বাঁচানোর জন্য লড়েছে, আজ নিজের জীবনটুকু বাঁচানোর জন্য তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।চিকিৎসা শুরু হলো না।টাকার অভাবে থেমে গেল রেহানার চিকিৎসা।দিন দিন নিস্তেজ হয়ে গেল তার শরীর।এক রাতে মায়ের হাতটা শক্ত করে ধরে রেহানা ফিসফিস করে বলল,—মা, আমি কি খুব খারাপ ছিলাম?মা মেয়ের হাত বুকে চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,—না মা, তুই ছিলি সবচেয়ে ভালো। শুধু মানুষ চিনতে ভুল করেছিলি।রেহানা মৃদু হাসল।তারপর চোখ বন্ধ করল।আর খুলল না।ক্যান্সারের সঙ্গে অনেকদিন যুদ্ধ করে, বিনা চিকিৎসায় শেষ পর্যন্ত হার মেনে নিল রেহানা।মায়ের কোলেই নিথর হয়ে গেল সেই বড় বোন।যে বড় বোন নিজের জীবনটা বিলিয়ে দিয়েছিল ছোট ভাই-বোনদের জন্য।যে বোনের জন্য কেউ একদিন নিজের জীবন উৎসর্গ করেনি।কিছু মানুষ জীবনে বড় হয় না—শুধু বড় বোনের কাঁধে দাঁড়িয়ে বড় হয়ে যায়। সমাপ্ত
0 Comments