অধ্যায় ১: স্নেহের নীড় ও এক অদ্ভুত সন্তান
মায়া যখন প্রথম অজগরটিকে ঘরে এনেছিল, তখন সেটি ছিল মাত্র কয়েক ইঞ্চির একটি সাপের বাচ্চা। বনের ধারে এক নিষ্ঠুর শিকারির হাত থেকে সেটিকে উদ্ধার করেছিল সে। নিঃন্তান মায়া সাপের বাচ্চাটিকে দেখে এক অদ্ভুত মাতৃত্বের টান অনুভব করে। সে তার নাম রাখে ‘নীল’। দেখতে দেখতে পাঁচটা বছর কেটে গেছে। এই পাঁচ বছরে নীল আর সাধারণ কোনো পোষা প্রাণী রইল না, সে হয়ে উঠল মায়ার নিজের সন্তানের মতো।
নয় ফুটের দীর্ঘ, চকচকে আঁশযুক্ত নীল এখন মায়ার বিছানায় ঘুমায়, তার হাতের ওপর মাথা রেখে পরম শান্তিতে চোখ বুজে থাকে। মায়া তাকে নিজের হাতে মুরগির মাংস, ডিম খাওয়ায়। নীলও মায়ার গলার আওয়াজ চিনত। মায়া ডাকলেই সে আলতো করে তার শরীর পেঁচিয়ে ধরে আদর জানাত। মায়ার স্বামী রঞ্জন প্রথম দিকে আপত্তি করলেও, পরে স্ত্রীর এই পাগলামি মেনে নেয়। অন্তত বাইরে থেকে দেখে সেটাই মনে হতো।
কিন্তু গত এক মাস ধরে নীলের আচরণে এক রহস্যময় পরিবর্তন দেখা দিল। সে সম্পূর্ণভাবে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তার প্রিয় খাবার সামনে দিলেও সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। মায়া অস্থির হয়ে উঠল। সে নীলের গায়ে হাত বুলিয়ে কাঁদত, “কী হয়েছে রে তোর নীল? একটা মাস ধরে কিছু খাচ্ছিস না কেন? তুই না বাঁচলে আমি কীভাবে বাঁচব?”
নীল কোনো উত্তর দেয় না। তবে প্রতি রাতে একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে। মাঝরাতে নীল তার খাঁচা বা ঘরের কোণ থেকে বেরিয়ে সোজা মায়ার বিছানায় চলে আসে। সে মায়ার শরীরের সমান্তরালে একদম সোজা হয়ে শুয়ে থাকে। অবলীল গতিতে মায়ার পায়ের পাতা থেকে মাথা পর্যন্ত নিজেকে প্রসারিত করে। আর তার শীতল, স্থির চোখ দুটো দিয়ে একভাবে মায়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। মায়ার মনে হতো, নীল হয়তো অসুস্থতার কারণে তার কাছে একটু বাড়তি ওম আর সান্ত্বনা খুঁজছে। সে স্নেহের বশে নীলকে আরও জড়িয়ে ধরে ঘুমাত।
অধ্যায় ২: বন্ধুদের সতর্কতা ও অন্ধ বিশ্বাস
মায়ার এই দুশ্চিন্তার কথা শুনে তার দুই ছোটবেলার বন্ধু—অর্ণব ও তিথি একদিন তাদের বাড়িতে এলো। অর্ণব বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগে কাজ করে এবং সাপ সম্পর্কে তার পড়াশোনা বেশ গভীর। তিথি পেশায় একজন স্কুল শিক্ষিকা, কিন্তু মায়ার প্রতি তার ভালোবাসা বোনের মতো।
ড্রয়িংরুমে বসে কফি খেতে খেতে তিথি বলল, “মায়া, তুই নীলকে ভালোবাসিস তা আমরা জানি। কিন্তু একটা সাপ তো শেষ পর্যন্ত বন্য হিংস্র প্রাণীই। এক মাস ধরে খাচ্ছে না, এটা মোটেও স্বাভাবিক লক্ষণ নয়।”
অর্ণব মায়ার বিছানার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “মায়া, তুই বললি না যে নীল রাতে তোর পাশে এসে একদম সোজা হয়ে শুয়ে থাকে আর তোকে মেপে দেখে?”
“হ্যাঁ,” মায়া সরলভাবে হাসল, “মনে হয় ও খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই আমার পাশে এসে একটু শান্তি পায়।”
অর্ণবের মুখটা মুহূর্তে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে কফির কাপটা টেবিলে রেখে মায়ার হাত ধরে বলল, “মায়া, তুই মস্ত বড় ভুল করছিস! তুই যেটাকে ভালোবাসা ভাবছিস, সেটা আসলে মৃত্যুর প্রস্তুতি। অ্যানাকোন্ডা বা পাইথনের মতো বড় সাপেরা যখন শিকারকে গিলে খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তারা অনেক দিন আগে থেকে পেট খালি করার জন্য খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়। একে বলে ‘ফাস্টিং’। আর রাতে যে ও তোর পাশে সোজা হয়ে শোয়, ও তোকে আদর করছে না মায়া! ও তোর দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ মাপছে। ও পরীক্ষা করে দেখছে যে ওর পেটে তোকে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গা আছে কি না! ও সুযোগ খুঁজছে তোকে আস্ত গিলে ফেলার।”
তিথি আঁতকে উঠে বলল, “ওরে বাবারে! মায়া, তুই প্লিজ ওটাকে চিড়িয়াখানায় দিয়ে দে। নিজের জীবনটা এভাবে ঝুঁকিতে ফেলিস না!”
বন্ধুদের এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মায়ার মনে একটুও দাগ কাটল না। সে হাতটা সরিয়ে নিয়ে বলল, “তোরা নীলকে চিনিস না। ও আমার সন্তানের মতো। পাঁচ বছর ধরে আমি ওকে বুকে আগলে রেখেছি। ও অন্য সাপের মতো নয়। ও আমার ক্ষতি করতেই পারে না। তোরা প্লিজ আমাকে আর ভয় দেখাস না।”
অর্ণব অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু মায়ার অন্ধ মাতৃত্বের কাছে তার সব যুক্তি হেরে গেল। বিদায় নেওয়ার সময় অর্ণব শুধু বলে গেল, “মায়া, সাপ কখনো পোষ মানে না। প্রকৃতির নিয়ম তুই বদলাতে পারবি না। সাবধানে থাকিস।”
অধ্যায় ৩: রঞ্জনের গুপ্ত মন্ত্রণা ও আসল সত্য
বন্ধুরা চলে যাওয়ার পর মায়া যখন রান্নাঘরে গেল, তখন রঞ্জন ড্রয়িংরুমে এসে একা বসল। রঞ্জনের ঠোঁটের কোণে তখন এক কুৎসিত, কুটিল হাসি। সে মায়ার অলক্ষ্যে তার পকেট থেকে একটা ছোট কাচের শিশি বের করল। শিশির গায়ে কোনো লেবেল ছিল না, ভেতরে ছিল হালকা হলুদ রঙের এক তরল ওষুধ।
রঞ্জন বিড়বিড় করে বলল, “বোকা অর্ণব! সাপের ফাস্টিং এর তত্ত্ব কপচাচ্ছিস? নীল তো নিজের ইচ্ছায় খাওয়া বন্ধ করেনি। ও তো খেতে চায়, কিন্তু আমি যে ওকে এই বিশেষ ওষুধটা খাওয়াচ্ছি!”
আসলে রঞ্জন মায়াকে ভালোবাসেনি কখনো। সে মায়ার বাবার বিপুল সম্পত্তি আর লাইফ ইন্সুরেন্সের কোটি টাকার ওপর চোখ রেখে মায়াকে বিয়ে করেছিল। মায়াকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য সে এক নিখুঁত পরিকল্পনা ফেঁদেছে। সে ইন্টারনেট ঘেঁটে এবং এক চোরা শিকারির কাছ থেকে এমন এক ওষুধ জোগাড় করেছে, যা সাপের পেটে গেলে তার স্বাভাবিক হজম ক্ষমতা সাময়িকভাবে নষ্ট করে দেয় এবং সাপের ভেতরে এক তীব্র, পাগল করা খিদে তৈরি করে। এই ওষুধের প্রভাবেই নীল এক মাস ধরে কিছু খাচ্ছে না এবং তার ভেতরের বন্য হিংস্রতা চরম সীমায় পৌঁছে গেছে। সে ক্ষুধার জ্বালায় অস্থির হয়ে মায়াকে তার শিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং প্রতি রাতে তাকে মাপছে।
রঞ্জন জানত, নীল যদি মায়াকে গিলে খেয়ে ফেলে, তবে আইনিভাবে রঞ্জনের গায়ে কোনো আঁচ লাগবে না। সবাই ভাববে, পোষা সাপের হাতে মায়ার এক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হয়েছে। আর রঞ্জন খুব সহজেই মায়ার সব সম্পত্তির মালিক হয়ে যাবে।
পরদিন সকালে রঞ্জন মায়ার অজান্তেই নীলের জলের পাত্রে সেই ওষুধের শেষ কয়েক ফোঁটা মিশিয়ে দিল। সে নীলের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আজ রাতেই তোর ফাস্টিং ভাঙার দিন নীল। আজ তোকে একা ঘরে তোর শিকারের সাথে ছেড়ে দেব। তোর খিদে মেটানোর পুরো ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।”
অধ্যায় ৪: কালরাত্রি ও বিভীষিকা
সেদিন রাতে আচমকাই রঞ্জনের একটা জরুরি ফোন এলো। সে মায়াকে বলল, “মায়া, আমার অফিসের একটা জরুরি কাজে এখনই শহরের বাইরে যেতে হচ্ছে। ফিরতে কাল দুপুর হবে। তুমি সাবধানে থেকো, আর দরজা-জানলা ভালো করে বন্ধ করে ঘুমিও।”
মায়া সরল বিশ্বাসে রঞ্জনকে বিদায় দিল। বিশাল বড়ো একতলা বাড়িটাতে মায়া এখন সম্পূর্ণ একা। রাত তখন আনুমানিক বারোটা। চারদিক নিস্তব্ধ। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। মায়া তার শোবার ঘরের খাটে শুয়ে পড়ল। ঘরের এক কোণে নীলের বড় কাঠের খাঁচাটা রাখা ছিল, যার দরজা রঞ্জন যাওয়ার আগে কায়দা করে আলগা করে রেখে গিয়েছিল।
হঠাৎ একটা খসখস শব্দে মায়ার ঘুম ভেঙে গেল। সে চোখ মেলে দেখল, নীল খাঁচা থেকে বেরিয়ে মেঝে বেয়ে তার খাটের দিকে আসছে। কিন্তু আজ নীলের চলাচল অন্যদিনের মতো শান্ত নয়। তার বিশাল শরীরটা অস্বাভাবিক দ্রুততায় কাঁপছে, আর তার মুখ থেকে অনবরত দ্বিখণ্ডিত জিবটা বের হচ্ছে। নীলের চোখ দুটো আজ যেন জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল হয়ে আছে।
নীল খাটে উঠে এলো। মায়া প্রতিদিনের মতো তার গায়ে হাত বুলাতে গেল, “কী রে নীল? আজ খুব কষ্ট হচ্ছে তোর?”
কিন্তু হাত ছোঁয়াতেই নীল এক ভয়ানক শব্দ করে ফোঁস করে উঠল। মায়া চমকে হাত সরিয়ে নিল। নীল তার স্বভাবসুলভ আচরণ ভুলে মায়ার চারপাশ ঘিরে বৃত্তাকার কুণ্ডলী পাকাতে শুরু করল। মায়া বিছানা থেকে নামার চেষ্টা করতেই নীল তার লেজ দিয়ে মায়ার একটা পা শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল। সেই বাঁধন এত শক্ত ছিল যে মায়ার হাড় মড়মড় করে ওঠার উপক্রম হলো।
মায়া এবার বুঝতে পারল অর্ণবের কথা কতটা সত্যি ছিল! নীল তাকে ভালোবাসে না, নীল তাকে আজ রাতে জীবন্ত গিলে খাওয়ার জন্য প্রস্তুত। ক্ষুধার জ্বালায় পাগল হয়ে যাওয়া নয় ফুটের অজগরটি মায়ার বুকের ওপর তার ভারী শরীরটা তুলে দিল। মায়ার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার জোগাড় হলো। সে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হলো না।
অধ্যায় ৫: সত্যের উন্মোচন ও জানলা দিয়ে মুক্তি
মৃত্যু যখন মায়ার ঠিক মাথার ওপর দাঁড়িয়ে, ঠিক তখনই ডাইনিং রুমের দিক থেকে একটা খাতার পাতা ওল্টানোর মতো শব্দ হলো। মায়া তার সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে নীলকে এক ধাক্কায় কিছুটা সরিয়ে বিছানা থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ল। নীল তার বিশাল শরীর নিয়ে আবার মায়ার দিকে এগোতে লাগল। মায়া হামাগুড়ি দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের রঞ্জনের পড়ার ঘরে গিয়ে ঢুকল এবং ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। বাইরে নীল দরজায় তার ভারী মাথা দিয়ে আঘাত করতে লাগল।
মায়া ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে রঞ্জনের টেবিলের ওপর রাখা জলের গ্লাসটা তুলতে গেল। তখনই তার চোখ পড়ল টেবিলের ড্রয়ারের ওপর, যা তাড়াঘড়ো করে যাওয়ার সময় রঞ্জন লক করতে ভুলে গিয়েছিল। ড্রয়ারের ভেতরে একটা ডায়েরি আর একটা খালি কাচের শিশি রাখা ছিল।
মায়া কাঁপানো হাতে ডায়েরিটা খুলল। রঞ্জনের হাতের লেখায় সেখানে স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে মায়াকে খুন করার সম্পূর্ণ নীল নকশা! ডায়েরির পাতায় লেখা—“আজ ২৫ তারিখ থেকে সাপের খাবারে রাসায়নিক ড্রপ মেশানো শুরু করলাম। সাপটার খিদে যত বাড়বে, মায়ার মৃত্যুর দিন তত কাছে আসবে। পুলিশ ভাববে সাপ মেরেছে, কিন্তু আসল চালটা আমার। মায়ার সম্পত্তি এবার আমার হাতের মুঠোয়।”
ডায়েরিটা পড়ে মায়ার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। যে স্বামীকে সে এতকাল বিশ্বাস করেছে, সে-ই তার এই অবস্থার মূল খলনায়ক! নিজের পালিত সন্তানতুল্য সাপটাকেও এই লোকটা বিষ খাইয়ে হিংস্র করে তুলেছে! মায়ার চোখ দিয়ে জল পড়ার বদলে তীব্র ক্ষোভ আর বেঁচে থাকার জেদ জেগে উঠল।
বাইরে দরজায় নীলের আঘাত আরও তীব্র হচ্ছে। কাঠের দরজাটা যে কোনো মুহূর্তে ভেঙে যাবে। মায়া দেখল ঘরে আর কোনো এক্সিট নেই, শুধু একটা বড় কাচের জানলা রয়েছে। সে ঘরের কোণ থেকে একটা লোহার স্ট্যান্ড নিয়ে জানলার কাচে সজোরে আঘাত করল। ঝনঝন শব্দে কাচ ভেঙে গেল।
মায়া আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে ভাঙা জানলা দিয়ে বাইরের বাগানে লাফিয়ে পড়ল। কাচের টুকরোয় তার হাত-পা কেটে রক্ত বের হতে লাগল, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল ছিল না। সে অন্ধকার রাতে একছুটে মেইন গেট দিয়ে বেরিয়ে রাস্তার দিকে দৌড়াতে লাগল।
অধ্যায় ৬: চক্রান্তের অবসান ও পাপিষ্ঠের শাস্তি
মায়া সোজা গিয়ে পৌঁছাল অর্ণবের বাড়িতে। মাঝরাতে মায়াকে রক্তাক্ত আর বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে অর্ণব ও তার বাড়ির লোক স্তম্ভিত হয়ে গেল। মায়া ডায়েরিটা অর্ণবের হাতে দিয়ে কেঁদে ফেলল। সব শুনে অর্ণব রাগ ও ক্ষোভে ফেটে পড়ল। সে তৎক্ষণাৎ পুলিশে ফোন করল এবং বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী দলকেও খবর দিল।
ভোর হওয়ার আগেই পুলিশ আর অর্ণবের দল মায়াদের বাড়িতে পৌঁছাল। বাড়ি তখনো নিস্তব্ধ। ঘরের ভেতরে নীল ক্ষুধার জ্বালায় ক্লান্ত হয়ে মেঝেতে কুঁকড়ে পড়ে ছিল। অর্ণব খুব সাবধানে তার বিশেষ দল নিয়ে নীলকে ট্রাঙ্কুলাইজার দিয়ে অজ্ঞান করল এবং তাকে একটি নিরাপদ খাঁচায় বন্দি করল। অর্ণব মায়াকে আশ্বস্ত করে বলল, “নীলকে আমরা বন্যপ্রাণী হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। ওর শরীর থেকে ওই বিষাক্ত রাসায়নিক বের করে ওকে আবার সুস্থ করে বনে ছেড়ে দেওয়া হবে। ও তোর শত্রু ছিল না মায়া, ওকে শত্রু বানানো হয়েছিল।”
সকাল আটটা নাগাদ রঞ্জন বাড়ি ফিরল। সে ভাবছিল বাড়িতে গিয়ে সে মায়ার ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ দেখতে পাবে এবং কান্নাকাটির ভান করে পুলিশ ডাকবে। কিন্তু বাড়ির গেটে পা রাখতেই তার সামনে এসে দাঁড়াল পুলিশ ইন্সপেক্টর এবং স্বয়ং মায়া।
মায়াকে জীবিত এবং সুস্থ দেখে রঞ্জনের মুখ চুন হয়ে গেল। সে তোতলামি করে বলল, “মায়া! তুমি ভালো আছ? আমি তো খুব চিন্তায় ছিলাম...”
মায়া এগিয়ে গিয়ে রঞ্জনের গালে এক সজোরে থাপ্পড় মারল। সে রঞ্জনের সেই ডায়েরি আর ওষুধের শিশিটা তার মুখের সামনে ধরে বলল, “তোর চিন্তা সাপের পেটে মায়াকে পাঠানো নিয়ে ছিল, তাই না রঞ্জন? এই নাও ইন্সপেক্টর বাবু, এই ডায়েরিতে ওর সব অপরাধের প্রমাণ আছে। ও একটা নিরীহ প্রাণীকে বিষ দিয়ে আমাকে মারতে চেয়েছিল।”
পুলিশ রঞ্জনের হাতে হাতকড়া পরাল। রঞ্জন মায়ার পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতে লাগল, কিন্তু মায়ার চোখে তখন আর কোনো করুণা ছিল না। সে রঞ্জনের দিকে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিল।
উপসংহার
কিছুদিন পর, নীলকে সুস্থ করে গভীর অরণ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়। মায়া তাকে শেষবারের মতো দেখতে গিয়েছিল। খাঁচা থেকে বের হওয়ার পর নীল বনের দিকে যাওয়ার আগে একবার মায়ার দিকে তাকাল। তবে সেই চোখে আর কোনো হিংস্রতা ছিল না, ছিল বন্য প্রাণীর নিজস্ব এক শান্ত দৃষ্টি। মায়া বুঝতে পারল, ভালোবাসা কখনো ভুল ছিল না, কিন্তু প্রকৃতির নিয়মকে জোর করে নিজের খাঁচায় বন্দি করতে যাওয়াটাই ছিল ভুল। মায়া রঞ্জনের সম্পত্তি থেকে পাওয়া সমস্ত অর্থ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও অনাথ আশ্রমের নামে দান করে দিল এবং নিজের জীবনকে এক নতুন সমাজসেবামূলক কাজে উৎসর্গ করল।
good