গল্পনারী জীবনের করুণচিত্র।আফছানা খানম অথৈ #magic #easter #game #conversation #storytellingজোলেখা মামার কাছে মানুষ।কারণ তার বাবা মায়ের দাম্পত্য জীবনকাহিনী অত্যান্ত করুণ ছিল।কারো সাথে কারো বনিবনা ছিল না।স্বামী স্ত্রী দু\'জনের মাঝে প্রায়ই সময় ঝগড়া লেগেই থাকত।জোলেখাকে সামলে রাখার পরিবেশ সেখানে ছিল না।তাই মা বাধ্য হয়ে তার ভাই মানে জোলেখার মামাকে তাকে দিয়ে দেয়।অনিচ্ছা সত্বেও মামা তাকে নিতে রাজী হয়।এরপর শুরু হয় জোলেখার জীবনে আরেক যুদ্ধ।মামী তাকে কোনোমতে মেনে নিতে পারছে না।উটকো ঝামেলা ভেবে দূর ছাই করছে।কিছুকিছু পিতামাতা সন্তানের জন্য পাগল।আবার কিছুকিছু পিতামাতা সন্তানকে বোঝা মনে করে।যেমন জোলেখার বাবা।একমাত্র সন্তানকে মা দিয়ে দিয়েছে।এরজন্য কোনো আফসোস নেই।বরং তিনি খুশি।তিনি পেশায় একজন আদম বেপারী ছিলেন।বিদেশে মানুষ নেয়ার কাজ করতেন।তিনি এতটাই অপদার্থ,কুলাঙ্গার ছিলেন,এক সময় লোভে পড়ে মানুষের সাথে নিজের স্ত্রীকেও টাকা উপার্জনের জন্য বিদেশ পাঠিয়ে দেন।অনিশ্চা সত্বেও তিনি বাধ্য হয়ে বিদেশ চলে যান।এদিকে জোলেখা মামীর কাছে অনাদর অবহেলায় মানুষ হচ্ছে।কিন্তু খুব ইচ্ছে করছে বাবা মায়ের কাছে যেতে,তাদের ভালোবাসা পেতে।কিন্তু কিছুই সে পাচ্ছে না।মায়ের সাথে ফোনে কথা হয় মাঝে মাঝে। ব্যস এইটুকু...।সময়ের গন্ডি পেরিয়ে জোলেখা এস এস সি পাশ করে, সবেমাত্র ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হয়।জোলেখে দেখতে খুব সুন্দরী।তাকে দেখলে যে কারো পছন্দ হয়ে যায়।এরই মধ্যে তার জন্য একটার পর একটা বিয়ের প্রস্তাব আসতেছে।মামীর ইচ্ছা তাকে দ্রুত বিয়ে দিয়ে আপদ বিদায় করা।মামা জোলেখার মতামত জানতে চাইলেও মামী কড়া ধমক দিয়ে বলে,তার আবার কিসের মতামত?আমরা যেখানে বিয়ে ঠিক করব,তাকে সেখানে বিয়ে করতে হবে।কথা মোতাবেক কাজ হলো।জোলেখার মামীর ইচ্ছায় একজনের সাথে তার বিয়ে ঠিক হলো।তড়িঘড়ি করে তার বিয়ে হয়ে গেল।কিন্তু কারো সাথে কারো দেখা সাক্ষাত হলো না।ছুটিতে যখন তার মা আসল,তখন সে জামাইকে খবর দিলো তাদের বাড়ি যাওয়ার জন্য। জামাই গেল,তাকে দেখে জোলেখা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।কারণ সে প্রয়োজনের তুলনায় খুব খাট।তবুও তাকে শেষমেষ মেনে নিলো।এই প্রথম তাদের বাসর হলো।দুজন দু\'জনকে চিনল জানল।এরই মধ্যে জোলেখার স্বামী জানাল তার একটা বাজে নেশা আছে,সে অনলাইনে জুয়াতে আসক্ত।এসব কথা শোনে সে আর ও টেনশন ফিল করল।যাক সবকিছু মেনে নিলো।ভাবল এক সময় সে ঠিক হয়ে যাবে।এরপর থেকে জামাই নিয়মিত শ্বশুর বাড়িতে যাতায়াত করে।কিন্তু বউ তুলে নেয়ার নাম নেয় না।শ্বশুর শ্বাশুড়িকে বউ তুলে নিতে বললে,তারাও আমতা আমতা করে।সরাসরি কিছু বলে না।এরই মধ্যে জোলেখা প্রেগন্যান্ট হয়।সাদেক কিন্তু এতে দ্বিমত পোষণ করে।সে জোলেখাকে চাপ দেয়,বাচ্চা নষ্ট করে ফেলার জন্য।জোলেখা রাজী হয়না।যাক সময়ের গন্ডি পেরিয়ে জোলেখার একটা কন্যা সন্তান হয়।সব খরচ তার মায় দেই।সাদেক টুকটাক খরচ দেয়।আর সব তার মায়ের।এরপর তার মা ছুটিতে দেশে আসে।তারপর সাদেককে চাপ দেয়,বউ নিয়ে যাওয়ার জন্য।জোলেখাও চাপ দেয় তার শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার জন্য। তারপর সাদেক তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়।জুয়াতে আসক্ত থাকার কারণে সে সংসারে তেমন একটা খরচ দিতে পারে না।বাবা মা একটু কড়া কথা বলেছে,সে পৃথক হয়ে গেছে।যাক মোটামুটি কোনোমতে চলছে জোলেখার জীবন।কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ততই স্বামীর রুপ বদল হতে শুরু করেছে।সে আগের মতো তার সাথে কথা বলছে না।কথায় কথায় রুঢ আচরণ,মারধর ইত্যাদি করে।তবুও মুখ বুঝে সহ্য করছে জোলেখা।তার ধারণা সে এক সময় ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু না সে আর ও খারাপ হয়ে যাচ্ছে।পান থেকে চুন খসলে জোলেখার উপর চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে।এমনিভাবে বাড়তে থাকে নির্যাতনের মাত্রা।এক সময় নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সে বাবার বাড়ি চলে আসে।এরপর সাদেক আবার নিজের ভুল স্বীকার করে,মাফ চেয়ে ভালো হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে নিয়ে আসে। সাদেক একটা চাকরী করে,ভালো মাইনে পায়। তবুও মাস শেষে তার হাতে টাকা থাকে না।সংসার চালাতে কষ্ট হয়।কারণ সে জুয়ার নেশায় আসক্ত।এমতাবস্থায় সংসার চালাতে জোলেখা একটা এন জিওতে ট্রেইনার পদে চাকুরী নেয়।মোটামুটিভাবে নিজের হাত খরচ চলে।কিন্তু এটাও স্বামীর সহ্য হচ্ছে না।সে তাকে মিছেমিছি সন্দেহ করা শুরু করেছে।বাধ্য হয়ে সে এই চাকরী ছেড়ে দেয়।তবুও সে শান্ত না।কারণে অকারণে জোলেখাকে রোজ রোজ মারধর করছে।সে অসহ্য হয়ে আবার মায়ের বাড়ি চলে আসে।এবার তার মা তাকে আর এই সংসারে না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।কিছুদিন পর,সাদেক তার মা বাবাকে নিয়ে জোলেখাকে আনতে যায়।তার মা দিতে রাজী হয় না।তবুও তারা নেয়ার জন্য কাকুতি মিনতি করে।এবার মা শর্ত দেয়,সাদেক যদি ভালো হয়ে যায়। সংসার করার মতো করে তাহলে সে মেয়েকে দিবে, নতুবা দিবে না।এই নিয়ে দু\'পক্ষের মাঝে খুব বাকবিতণ্ডা হয়।তারা কোনো শর্ত মানে না।আর জোলেখাকে তার মা দেয় না।এরপর সাদেক চলে আসে।জুয়ার নেশায় পুরোপুরিভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে।জোলেখার আর খোঁজখবর নেয়না।এদিকে জোলেখা অপেক্ষায় আছে।তার স্বামী এক সময় ভালো হয়ে যাবে।তাকে নিয়ে আসবে।কিন্তু না সে আর ভালো হলো না।এক সময় সে তার কাছে ডিভোর্সের কাগজপত্র পাঠিয়ে দিলো।কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল জোলেখা।সুখ নামের পাখিটি যেন চিরদিনের জন্য তার জীবন থেকে হারিয়ে গেল।
0 Comments