যা করেছ তুমি বপন জীবনের গভীরে, নীরব দানে, তোমারই আসনে একদিন তার ফল হবে জ্ঞাপন মানুষের প্রাণে, মানুষের কল্যাণে।
যা পুড়ে যায় না
ঝিমলি ইউনিফর্ম ছাড়তে ছাড়তে পকেট হাতড়াল। ভাঁজ করা কাগজটা বের করে এমন ভঙ্গিতে মনিকার হাতে দিল, যেন খুব সাধারণ কিছু। স্কুলের ম্যাম দিয়েছে। মনিকা তখন ডাল নামাচ্ছে। হাত ধুয়ে কাগজটা খুলে চোখ বোলাতেই ভ্রু দুটো কুঁচকে গেল। বড় বড় অক্ষরে লেখা অর্গ্যান ডোনেশন সচেতনতা শিবির। মুহূর্তেই মেজাজটা চড়ে গেল। কাগজটা টেবিলের ওপর ছুড়ে দিয়ে সে রান্নাঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। আজকাল এই এক নতুন হাওয়া উঠেছে। অর্গ্যান ডোনেশন। কে না কে এসে বোঝাচ্ছে, দান করো, মহৎ হও। যেন না করলেই পাপ! আগে তাও শুধু চোখ ছিল। মানুষ মরার পর চোখ গেলে কী এমন আসে যায়। এখন তো আর শেষ নেই। হার্ট, লিভার, কিডনি, স্কিন সব খুলে নিয়ে যাবে। এমনকি পুরো শরীর! কেন বাপু? কী দরকার এসবের? তোমার দরকার তো আমি দিতে যাব কেন? চুলোর আঁচ একটু বাড়াতে বাড়াতে নিজের সঙ্গেই কথা বলে মনিকা। একটা কিডনি দিয়ে সারাজীবন আধমরা হয়ে থাকব নাকি? আর তারপর যদি নিজেরই দরকার পড়ে? তখন কে দেবে? হঠাৎ জামাইবাবুর বড়মাসীর মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে। কী উৎসাহ, কী আনন্দ তখন। দিদিকে কিডনি দিয়েছেন আহা, কী মহৎ! পাড়া ভর্তি প্রশংসা। আর আজ? তেরো বছর পেরিয়ে গেছে। মাসীর নিজের কিডনি নষ্ট হতে বসেছে। তখন কেউ আসে না। বাহবা নেই, ফুল নেই, খবর নেওয়ার লোক নেই। এখন যদি অন্য কিডনিটা থাকত! মনিকার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। আগে নিজেরটা বাঁচাও। তারপর দান-টান ভাবো। ভগবান বুঝেশুনেই শরীর বানিয়েছেন। বিলোনোর জন্য নয়। ঝিমলিকে খেতে ডাকে সে। ভাত বেড়ে দেয়, ডাল ঢালে, কিন্তু মুখে কথা নেই ঝিমলি খেতে খেতে বলে ওঠে, মা, আজকে স্কুলে সেমিনারটা খুব ভালো ছিল। অনেক ডাক্তার এসেছিল। বলল, একজন মানুষের অঙ্গ নাকি দশজনের জীবন বাঁচাতে পারে। মনিকা কিছু বলে না। ঝিমলি থামে না। আমরা বন্ধুরা ঠিক করেছি। চোখ তো দেবই। হার্ট, লিভারও। এমনকি পুরো শরীরও। মা, জানো কত মেডিক্যাল স্টুডেন্ট শিখতে পারে? মনিকা এবার তাকায়। মেয়ের দিকে না, ভাতের থালার দিকে। মেয়ের একটা কান টেনে বলে, খাচ্ছিস তো খা। এসব বাজে কথা বন্ধ কর। শুনলে মাথা গরম হয়ে যায় আমার। এখন এসব ভাবার বয়স হয়নি। আগে মানুষ হও ঝিমলি খুব আস্তে বলে, মানুষ হবো না মা? এই কথাটুকুই যথেষ্ট। মনিকার ভেতরে জমে থাকা সব রাগ একসাথে বেরিয়ে আসে। একদম চুপ! দাদুর কথা বেশি শুনছিস আজকাল। উনি যেটা করেছেন সেটাই সব ঠিক? শরীর দান করে দিয়েছেন যত্তসব কাণ্ড! কই, তোর বাবা, কাকা কেউ তো এগোয়নি এসব করতে। বুড়ো বয়সে মানুষের মাথা খারাপ হয়। ভীমরতি বলে একটা কথা আছে। থালা বাটি তুলে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে মনিকা। দরজাটা একটু জোরেই লাগল। ঝিমলি চুপচাপ বসে থাকে। চোখে জল আসে না। অভ্যেস হয়ে গেছে। খাওয়া শেষ করে উঠে যায়। প্রতিদিনের মতো দাদুর ঘরে ঢোকে সে। কর্নেল রায় তখন খবরের কাগজ পড়ছেন। চশমার ফাঁক দিয়ে চোখটা একটু তুললেন। ঝিমলি গিয়ে পাশে বসে। তারপর ফিসফিস করে বলে, দাদু, আমি আগামী সপ্তাহে ফর্মটা ফিল আপ করব। তুমি মা-বাবাকে বোঝাবে তো? আমি কলাগাছ হব। কর্নেল রায়ের ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে যায়। ঠিক এই হাসিটাই উঠেছিল সেদিন, যেদিন হাসপাতালের ফর্মে সই করেছিলেন। সেদিনও বাড়িতে ঝড় উঠেছিল। বড় ছেলে চিৎকার করেছিল, বাবা এসব পাগলামি বন্ধ করুন। মনিকা কেঁদেছিল। মরার পর শরীর পোড়ানো হবে না? মুখাগ্নি হবে না? শ্রাদ্ধ হবে না? আত্মা শান্তি পাবে কী করে? ভূত হবে না তো? এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল। কর্নেল রায় হেসে বলেছিলেন, আত্মা যদি এতই দুর্বল হয় যে আগুন ছাড়া শান্তি পায় না, তাহলে তার শান্তি নিয়েই তো প্রশ্ন আছে। বড়বৌমা কিছু বুঝতে চায়নি। নামমাত্র শিক্ষিত মানুষগুলো বিশ্বাসের দড়িতে বাঁধা। ঝিমলি সেদিন বুঝেছিল। দাদু বলেছিলেন, কলাগাছ দেখেছিস? মরার পরও ও আমাদের দেয়। ওর কিছু নষ্ট হয় না। মানুষ কেন পুড়ে ছাই হবে? যদি এই শরীর দিয়ে কেউ ডাক্তার হতে পারে, কেউ বাঁচতে পারে, সেটাই তো জীবনের সার্থকতা। আজ ঝিমলির মাথায় হাত রেখে কর্নেল রায় বলেন, ভয় পাস না। সময় লাগবে। কলাগাছ একদিনে বড় হয় না। বাইরে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। রান্নাঘর থেকে বাসনের শব্দ আসে। মনিকা জানে না, এই বাড়ির ভেতর একটা বীজ ইতিমধ্যেই গজাতে শুরু করেছে। কিছু বীজ চাপা পড়ে থাকে, কিছু বীজ অন্ধকারেই শিকড় মেলে। আর কোনো কোনো বীজ একদিন কলাগাছ হয়। যা করেছ তুমি বপন জীবনের গভীরে, নীরব দানে, তোমারই আসনে একদিন তার ফল হবে জ্ঞাপন মানুষের প্রাণে, মানুষের কল্যাণে।
0 Comments