চরের ধারে ছোট্ট গ্রাম—নাম কেউ ঠিক মনে রাখে না। সবাই বলে ওই কাঁঠালগাছের পাশের গ্রাম। সেই কাঁঠালগাছের নিচেই রফিকের সংসার। টিনের চাল, মাটির দেয়াল, আর ভাঙা খাট—এই তার রাজ্য।রফিক দিনমজুর। ভোরে বের হয়, ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। কাজ না থাকলে সারা দিন বসে থাকে নদীর পাড়ে, পা ঝুলিয়ে। ঘরে বসে থাকে তার বউ ময়না—চুলে পাক ধরেছে অল্প, বয়সের আগেই। সংসারের হিসাব করতে করতে চোখে কালি পড়ে গেছে।আজ সকালে চাল প্রায় শেষ। ময়না হাঁড়ির তলা চেঁছে ভাত তুলেছে—দু’মুঠোও হবে না।—“আজ কাজ পাইছ?”রফিক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে,—“না।”এই ‘না’ শব্দটার ওজন ময়না জানে। এই ‘না’ মানেই আজ তরকারিতে শুধু লবণ আর কাঁচা মরিচ।ছেলেটা, ছোট্ট বাবু, উঠোনে খেলছিল। ভাত দেখে বলল,—“আম্মা, আজ মাছ নাই?”ময়না হেসে বলল,—“কাল আনব রে।”কাল—এই শব্দটাই ওদের ভরসা।দুপুরে পাশের বাড়ির কাকিমা এসে বলল,—“ময়না, তোর মানুষটা নাকি শহরে যাবে?”ময়নার বুকটা কেঁপে উঠল। শহর মানে দূরত্ব, অনিশ্চয়তা, আর অপেক্ষা।রাতে কুপির আলোয় রফিক বলল,—“এই গ্রামে আর টানতে পারতেছি না। শহরে গেলে হয়তো কিছু হবে।”ময়না চুপ। কাঁঠালগাছের পাতার ছায়া দেয়ালে নড়ে। সে জানে, রফিক গেলে সংসার চলবে ঠিকই, কিন্তু মনটা ফাঁকা হয়ে যাবে।পরদিন ভোরে রফিক রওনা দেয়। কাঁধে একটা গামছা বাঁধা ব্যাগ। ময়না কিছু দেয়নি—দেওয়ার কিছু ছিল না। শুধু বলেছে,—“ভাল থাকিস।”মাস যায়, খবর আসে না। একদিন বিকেলে ডাক আসে—রফিক এসেছে। গায়ে ধুলো, চোখে ক্লান্তি, কিন্তু হাতে একটা ছোট পলিথিন। ভেতরে আধা কেজি চাল, একটু ডাল।ময়না কিছু বলে না। শুধু হাঁড়িতে চাল ঢালে। আজ অনেক দিন পর ভাত ফুটছে ঠিকঠাক।রফিক নিচু গলায় বলে,—“বেশি কিছু পারি নাই… তবে সংসারটা ভাঙি নাই।”ময়না চুপচাপ হাঁড়ি নামায়। কাঁঠালগাছের নিচে ধোঁয়া ওঠে। সেই ধোঁয়ার ভেতরেই টিকে থাকে তাদের সংসার—অভাবের সাথে লড়াই করে, ভালোবাসার জোরে।রফিক ফেরার পর কিছুদিন ভালোই চলছিল। কাজ পেলে কাজ করত, না পেলে নদীর পাড়ে বসে থাকত। ময়না আর আগের মতো অভিযোগ করত না। অভাবের সাথে তারা যেন মানিয়ে নিতে শিখে গিয়েছিল।একদিন বর্ষার সকালে রফিক বলল,—“আজ শহরে কাজের খবর আছে। গেলে দু’চারটা টাকা হইতে পারে।”ময়না শুধু মাথা নেড়ে দিল। বিদায়ের সময় গামছাটা ঠিক করে বেঁধে দিল রফিকের কাঁধে। কেন জানি তার বুকটা ভারী লাগছিল।সেই দিন দুপুরের পর আকাশ কালো হয়ে এল। নদী ফুলে উঠল হঠাৎ। বিকেলে গ্রামের ছেলেরা দৌড়ে এসে বলল,—“ময়না ভাবি! রফিক ভাই নদী পার হইতে গিয়া পড়ে গেছে!”ময়নার হাতের হাঁড়িটা মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল। সে দৌড়াল—পা চলে না, তবু দৌড়াল।নদীর ধারে তখন ভিড়। কেউ বলছে দেখেছে, কেউ বলছে শোনেনি। শুধু নদীর পানি কথা বলছিল—গর্জন করে, নিষ্ঠুরভাবে।সন্ধ্যার আগে রফিকের লাশ ভেসে উঠল। গামছাটা তখনও কাঁধে বাঁধা।গ্রামে দাফন হলো চুপচাপ। কেউ কান্না করল, কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিন্তু ময়না কাঁদল না। চোখ শুকনো, মুখ পাথরের মতো।রাতে কাঁঠালগাছের নিচে বসে ময়না বাবুকে বুকে টেনে নিল। কুপির আলোয় সে বলল,—“তোর আব্বা আর ফিরবো না রে।”বাবু ঘুমিয়ে পড়ল। ময়না জেগে থাকল। ভাঙা হাঁড়ির পাশে বসে হিসাব করল—সংসারের হিসাব না, জীবনের।পরদিন ভোরে গ্রামের লোক কাঁঠালগাছের নিচে ময়নাকে পেল না। শুধু বাবুটা ছিল, ঘুমন্ত। পাশে মাটিতে একটা চিরকুট—“সংসার টানতে গিয়া মানুষটা গেল।আমি আর পারলাম না।”নদীর পাড়ে খোঁজ পাওয়া গেল ময়নার ওড়নার। নদী আবার একজনকে নিজের করে নিল।কাঁঠালগাছ আজও দাঁড়িয়ে আছে।ছায়া দেয়—কিন্তু সেই ছায়ার নিচে আর কোনো সংসার নেই।
চরের ধারে ছোট্ট গ্রাম—নাম কেউ ঠিক মনে রাখে না। সবাই বলে ওই কাঁঠালগাছের পাশের গ্রাম। সেই কাঁঠালগাছের নিচেই রফিকের সংসার। টিনের চাল, মাটির দেয়াল, আর ভাঙা খাট—এই তার রাজ্য।রফিক দিনমজুর। ভোরে বের হয়, ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। কাজ না থাকলে সারা দিন বসে থাকে নদীর পাড়ে, পা ঝুলিয়ে। ঘরে বসে থাকে তার বউ ময়না—চুলে পাক ধরেছে অল্প, বয়সের আগেই। সংসারের হিসাব করতে করতে চোখে কালি পড়ে গেছে।আজ সকালে চাল প্রায় শেষ। ময়না হাঁড়ির তলা চেঁছে ভাত তুলেছে—দু’মুঠোও হবে না।—“আজ কাজ পাইছ?”রফিক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে,—“না।”এই ‘না’ শব্দটার ওজন ময়না জানে। এই ‘না’ মানেই আজ তরকারিতে শুধু লবণ আর কাঁচা মরিচ।ছেলেটা, ছোট্ট বাবু, উঠোনে খেলছিল। ভাত দেখে বলল,—“আম্মা, আজ মাছ নাই?”ময়না হেসে বলল,—“কাল আনব রে।”
0 Comments