শহরের ভোর, ধূসর আলোয় ঢাকা। রাস্তার ধারে বসে ছিলেন মিশনেশ্বর, গ্রামের বৃদ্ধ, যিনি শহরের ছোট চায়ের দোকানে প্রতিদিন সকাল কাটাতেন। তার গলার স্বর ভরা সময়ের স্মৃতি, এবং কথায় প্রায়শই ছাপ পড়ে গ্রামের প্রাচীন সংস্কৃতির।
“ওরে বেটা, দেখছ কি আজও ধোঁয়ার মতো মেঘ জমেছে আকাশে,” মিশনেশ্বর বললেন, চোখে ধোঁয়াটে স্মৃতির ঝলক।
চায়ের দোকানের ছোট ছেলে, রাজু, একটু অবাক হয়ে বলল, “দাদা, এভাবে কি সবসময় আকাশের কথা ভাবেন?”
“আকাশ ভাবি না, রাজু। সময় ভাবি, যা চলে যায় আর ফেরে না। যেমন আমার ছেলেটি তুই জানিস না, সে ছিল কতই না আনন্দের খনি। এখন শুধু এই শহরের ধুলোয় মিলিয়ে গেছে।” মিশনেশ্বরের চোখে জল আঁচড়ে উঠল।
রাজু চুপচাপ বসে থাকল। কিছুক্ষণ পর, বৃদ্ধের চোখে যেন নতুন আলো জ্বলল।
“শোনো বেটা, গল্প শুনতে চাও? সেই সময়ের, যখন নদী ছিল আমাদের আনন্দের সীমা। তখন আমি আর তোমার মতোই ছোট, খেয়ার তীরে বসে সূর্যাস্ত দেখতাম। তখনকার মানুষজন বলত, জীবন মানে শুধু দিন গোনা নয়, অনুভব করা। আর অনুভব করতেই হয় সাহস দিয়ে।”
রাজুর চোখে আগ্রহ জাগল। সে বলল, “সত্যি কি, দাদা? আপনি কি সেই সময়ের মানুষ?”
“হ্যাঁ, বেটা। সেই সময়ে মানুষে মানুষে সম্পর্ক ছিল, কথা ছিল, হাসি ছিল। এখন শুধু নিঃশব্দ। কিন্তু সেই নিঃশব্দেও যদি সাহস থাকে, তবেই জীবন হয় সুন্দর।” মিশনেশ্বর ধীরে চুমুক দিলেন তার চায়ের কাপ থেকে।
“আপনি কি কখনো কষ্ট পেয়েছেন, দাদা?” রাজু একটু সাহস নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“অবশ্যই, বেটা। কষ্ট ছিল বেশীই ছিল। কিন্তু কষ্টের মাঝেও মানুষকে বাঁচানো আর ভালোবাসা সবচেয়ে বড় শক্তি। আমি একদিন এক কিশোরীকে নদী থেকে উদ্ধার করেছিলাম। তার মুখে ভয়, আমার মনে ছেলের হাসি মিলে গেল। জীবন তখন বুঝিয়েছিল, সাহস আর ভালোবাসাই চিরন্তন।”
সেদিন রাজু মিশনেশ্বরের পাশে বসে দেখল, কিভাবে বৃদ্ধ তার গল্পে অতীতকে বাঁচাচ্ছেন।
পরের দিন, নদীর ধারে একটি নতুন চরিত্র এলো শাহিদা, এক মধ্যবয়সী মহিলা, যিনি শহর ছেড়ে গ্রামের শান্তি খুঁজতে এসেছিলেন। তার চোখে দুঃখের ছাপ, হালকা কাঁপা কণ্ঠ।
“দাদা, আপনি কি সত্যিই এই নদীর ধারে সব দেখেছেন?” শাহিদা জিজ্ঞেস করলেন।
মিশনেশ্বর হাসলেন, “হ্যাঁ, বেটা। আমি দেখেছি মানুষের আনন্দ, তাদের বেদনা, সাহস আর ভয় সব। কিন্তু নদী সবকিছু শোনে, সবকিছু ধরে রাখে। তাই আমরা এখানে কথা বলি, লিখি, যেন স্মৃতি হারিয়ে না যায়।”
শাহিদা হেসে বললেন, “আমি আসলে শুনতে এসেছি। আমারও কিছু গল্প আছে কিন্তু আমি সাহস পাই না বলতে।”
রাজু খোঁজাখুঁজির মতো বলল, “দাদা, তিনি আমাদের সাথে গল্প শেয়ার করতে চাইছেন।”
মিশনেশ্বর ধীরে বললেন, “ঠিক আছে বেটা। সাহসিকতা মানে শুধু বাঁচানো নয়, বলা। যা বলি, তাই আমরা বাঁচাই।”
শাহিদা তার কণ্ঠে কেঁপে ওঠা শব্দগুলো দিয়ে বললেন “আমি শহর ছেড়ে এসেছি কারণ আমার ছেলে হারিয়েছে। জীবনের আনন্দ আর দুঃখ একসাথে নিয়ে যাওয়া কঠিন, আর কেউ বোঝে না। আমি শুধু এখানে শান্তি খুঁজতে এসেছি।”
মিশনেশ্বরের চোখে কোমলতা। “বেটা, জীবন কঠিন। তবে মানুষ যদি একে অপরের কাছে সত্যি থাকে, গল্প শোনে, কান দেয়, তখন অন্ধকারও আলোয় পরিণত হয়। রাজু, তুই শুনছিস?”
রাজু মাথা নাড়ল। সে বুঝতে পারল শাহিদা, মিশনেশ্বর, এবং সে নিজেই একে অপরের জীবনের গল্পে অংশ হয়ে গেছে।
দিনের আলো বাড়তে থাকল। নদীর তীরে তিনজন গল্প শোনাল, শেয়ার করল, চোখের জল মুছল। মিশনেশ্বর ধীরে কাগজে লিখলেন, রাজু পাশে বসে তাকে সাহায্য করল, আর শাহিদা তার নিজের স্মৃতি বলল। নিঃশব্দ শহর, নদীর ধারে, সেই মুহূর্তে শব্দ হয়ে উঠল, ছায়ার মতো ভেসে গেল।
সন্ধ্যা এল। নদীর কুয়াশায় চারপাশ ঢেকে গেল। কিন্তু মিশনেশ্বর, রাজু, শাহিদা তাদের জন্য এটি শুধুই নিঃশব্দ রাত নয়। এটি ছিল নতুন সাহসের সকাল, নতুন সম্পর্কের শুরু।
মিশনেশ্বর ধীরে বললেন, “বেটা, মনে রাখিস, নিঃশব্দ শহরেও শব্দ তৈরি করা যায়। তা হয়তো অন্যরা শুনবে না, কিন্তু আমাদের হৃদয় জানে। আর একদিন, এই শব্দ অন্যদেরও ছুঁয়ে যাবে।”
রাজু চুপচাপ হাসল। শাহিদাও হেসে বললেন। সেই হাসি ছিল ছোট্ট, কিন্তু নদীর ধারে যেন পুরো শহরের আলো জ্বলে উঠল।
নিশ্বাসের মতো ধীর ভোরে, নদীর পাশে ছায়ার কথন আর সাহসের গল্প বয়ে চলল যা শুধু অতীতকে নয়, ভবিষ্যতকেও স্পর্শ করল।
নদীর ধারে ধূসর ভোরে বসে এক বৃদ্ধ তার অতীতের গল্প শেয়ার করে ছোট ছেলে ও এক মধ্যবয়সী মহিলার সঙ্গে। নিঃশব্দ শহরের মধ্যে সাহস, ভালোবাসা এবং স্মৃতির শক্তি ফুটে ওঠে। কথোপকথনমুখর এই গল্পে আবেগ, একাকীত্ব এবং নস্টালজিয়ার ছোঁয়া রয়েছে।
0 Comments