গ্রামের দক্ষিণ মাথায় বাঁশঝাড়ের পাশে একটা পরিত্যক্ত দোচালা বাড়ি রয়েছে। সবাই তাকে বলে ভুতের ঢেড়া। বহু বছর ধরে সেখানে নাকি ঝুলঝাপটার ভুত, পেত্নী, আর এক গোরখোদোর আত্মা থাকে। রাত হলেই বাড়িটার চারদিকে কুয়াশা ঘনীভূত হয়, ভেতর থেকে ঠকঠক শব্দ আসে।কিন্তু গ্রামের একমাত্র ভয়হীন ব্যক্তি—হারু—এসব গল্পকে পাত্তা দেয় না। হারুর কাজই হলো দুষ্টুমি করা, লোকজনকে ভয় দেখানো, আর নানা রকম উপদ্রব সৃষ্টি করা। একদিন সে ঠিক করল, মানুষকে ভয় দেখানো তো পারি, দেখি ভুতকে ভয় দেখানো যায় কি না!সেদিন রাত বারোটায় হারু হাতে লণ্ঠন আর মাথায় টিনের কৌটা পরে ভুতের ঢেড়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঘাড় বাঁকিয়ে বলল—“এই যে ভুতেরা! হারু আইছে! যারে ধরে কান মুলি না দিলে হারুর নাম বদলাই!”বাড়ির ভেতর হঠাৎ ঠকঠক আওয়াজ থেমে গেল। ঝুলঝাপটার ভুত শাহীনের কান কাঁপতে লাগল। সে পেত্নী রাধাকে বলল,“রে রাধা, শুনলি? এ কোন দানব আইলো?”রাধা ভয়ের চোটে ঘোমটা টেনে বলল, “ওরে বাবা, আমরা ভয় দেখাই—আমারে কে ভয় দেখায়! এই হারুটা নিশ্চয়ই কোন অলৌকিক কিছুর প্রেত!”ভুতেরা তখনো বুঝে ওঠেনি, হারু ভেতরে ঢুকে গেল। ঢুকেই সে এক পেত্নীর বালিশে কর্পুর ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিল। আগুন না লাগলেও গন্ধে পেত্নী হাঁচি দিতে দিতে লাফাতে লাগল। হারু খিকখিকিয়ে হাসল।“এইটুকুতেই ভয়? এবার দেখি আরেকটু করি…”সে গোরখোদোর আত্মার দাড়িতে খড়-ছোলা ঢুকিয়ে দিল। গোরখোদো চেঁচিয়ে উঠল,“রে ঝুলা! রাধা! কেউ আমার দাড়ির ভিতরে কাঁটা বড়শি ঢুকাইল!”তখন তিন ভুত একসাথে গলা মিলিয়ে বলল, “এ এক বিচ্ছিরি মানুষ-দানব রে!”হারুর দুষ্টুমি থামার নাম নেই—কখনো সে জং ধরা দরজা ধাক্কিয়ে ভুতেদের ঘুম ভাঙায়, কখনো মাথার উপর দিয়ে শুকনো মাছ ছুড়ে মারে।ভুতরা ততক্ষণে ক্ষেপে উঠেছে। ঝুলঝাপটা শাহীন বলল,“আমাদের সম্মান কোথায় গেল? মানুষকে ভয় দেখাতে পারি, আর এক হারুর কাছে হার মানব?”পেত্নী রাধা গলায় কাঁপুনি নিয়ে বলল,“তা ঠিক, কিন্তু হারু মানুষ না—আমার মনে হয় ও মানুষ-দানব।”গোরখোদো আত্মা তখনো দাড়ি আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল,“বাপেরা, ভয় দেখাইলে কিছু হয় না। হারুর ভয় লাগে না। আমাদের কিছু বুদ্ধি করতে হইব।”যেদিন ভুতেরা মিটিং করছিল, সেদিন হারুর মাথায় দারুণ এক বুদ্ধি হলো। সে বাঁশঝাড় ঘুরে এসে এক বড়ো সাপ ধরে ভেতরে ঢুকল। ঢুকেই সাপটা ঝুলা ভুতের সামনে ছুড়ে দিল।ঝুলা ভুত চিৎকার করে উঠল,“সাপ! সাপ!”বাড়ির ভেতরে মুহূর্তেই হুলুস্থুল পড়ে গেল।কিন্তু এবার ভুতেরা পালায়নি। তারা দৌড়ে এসে সাপটা ধরার সাথে সাথে বুঝল—“এটা তো খেলনা রাবারের সাপ!”পেত্নী রাধা দাঁত চেপে বলল,“এই ছেলেটা আমাদের নিয়ে খেলা করে!”মিটিং করে ভুতেরা এক বড়ো সিদ্ধান্ত নিল—হারুকে ভয় দেখাতে হবে, তবে ভুতের স্টাইলে নয়, মানুষের স্টাইলে।সেই রাতে হারু আবার ঢুকতেই দেখল, ভেতরটা অন্ধকার।একটু এগোতেই তার পায়ের নিচে ঠাণ্ডা কিছু লেগে গেল—পানি।হারু এগোতেই মাথার উপর দিয়ে ডাম! করে একটা নারকেল পড়ল।হারু আঁতকে উঠে বলল,“এইটা কে? ভুতেরা এত শক্তিশালী কবে হইল?”ঠিক তখন ঝুলা ভুত পিছন থেকে মানব-গলায় বলল,“এই শয়তান! আর একদিন এলে জুতাপেটা করব!”পেত্নী রাধা ঝাড়ু হাতে এসে চিৎকার করল,“হারু! বাড়ি ফেরো। আর আমাদের শান্তি নষ্ট কইরো না।”ভুতেরা এবার ভুতের ভয় দেখায়নি—সম্পূর্ণ মানুষের মতো ব্যবহার করেছে।এই দৃশ্য দেখেই হারুর গা দিয়ে ঠাণ্ডা ঘাম বেরিয়ে গেল।পরের দিন গ্রামের লোকজন দেখে—হারু ভুতের ঢেড়ার সামনে শুয়ে আছে, পাশে তার টিনের কৌটা ভাঙা, আর মুখে শুধু একটি বাক্য—“ভুত না, মানুষ-ভিত্তিক ভুতেরা সব চাইতে ভয়ংকর!”ভুতেরা যে দিন হারুকে ভয় পাইয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিল, সেদিন তারা ভেবেছিল—“এবার শান্তি! আর হারু আসবে না।”কিন্তু তারা হারুকে ভুল হিসাব করেছিল।হারু একবার ভয় পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু সে যে হারু, ভুতেরা জানে না—হারু ভয়কে ভয় পায় না, বরং ভয়কে বদলে ফেলে দুষ্টুমিতে।ভোরের আলো ফুটতেই হারু ঘরের বারান্দায় বসে ভাবতে লাগল—“ভুতেরা যখন মানুষ সেজে ভয় দেখাইতে পারে, আমিও তো ভুত সেজে দেখাইতেছি!”এবার সে নিজের মাথায় কালো কালি মাখল, চোখের তলায় কয়লার দাগ টানল, আর গায়ে সাদা চাদর জড়াল।নিজেকে আয়নায় দেখে নিজেই ভয় পেয়ে উঠল।“বাপরে! আমি তো হারু না, হারুকুত্তি ভুত!”সে ঠিক করল সেই রাতেই আবার যাবে ভুতের ঢেড়ায়।এইদিকে ঢেড়ার ভেতরে ভুতেরা একদম সতর্ক।ঝুলঝাপটা শাহীন টর্চ নিয়ে বাড়ির চারপাশে টহল দিচ্ছে।গোরখোদো আত্মা দাড়ি আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলছে—“হারু আবার আসলে আমার দাড়ি বাঁচব না!”পেত্নী রাধা ঝাড়ু হাতে দাঁড়িয়ে—“আজ যদি ধরা পড়ে, মানুষ হোক বা দানব—চটকা বানাই!”ভুতেদের মনে ভয় নয়, এবার রাগ জমেছে।মাঝরাতে হারু আবার হাজির।সে ঢেড়ার ভেতরে ঢুকেই শুরু করল অদ্ভুত গলা বদলের শব্দ—“ওওওও… আমি ধোঁয়া… আমি ছায়া… আমি অশরীরী… হারু না…”ভুতেরা শুনেই আঁতকে উঠল।ঝুলা ভুত বলল,“রে বাবা! হারুর গলা তো এমন না! এটা নিশ্চয়ই সত্যি ভুত!”গোরখোদো আতঙ্কে বলল,“এটা হারুর বাপের ভুত! হারুর চেয়েও ভয়ংকর!”পেত্নী রাধা ভয়ে কাঁপলেও সাহস করে বলল,“ধরে ফেল! ভুত হোক বা মানুষ—এবার পালাইতে দেব না!”ভুতেরা যখন হারুকে ঘেরাও করতে গেল, তখন হারু অন্ধকারে হোঁচট খেয়ে একেবারে রাধা পেত্নীর আঁচলে পড়ে গেল।পেত্নী রাধার চিৎকার—“আহ্! ভুত আমার আঁচল ধইরা আছে!”ঝুলা ভুত লাফ দিয়ে এসে হারুর মাথায় টোকা দিল—“এই, তুই কে?”হারু তখনও চরিত্রে অভিনয় রেখে বলল,“আমি… তোমাদের পূর্বপুরুষ ভুত!”গোরখোদো আত্মা নাকে নাকে পড়ে গন্ধ নিল—“এটা কোন ভুত? গায়ের গন্ধ তো হারুর মতো!”হঠাৎ এক টানতেই হারুর নিজের চাদর পড়ে গেল, মুখের কালি মুছে গেল।সামনে এখন স্পষ্ট—ভুত সেজে ভুতদের ভয় দেখাতে এসেছে হারু!হারু ধরা পড়তেই ভুতেরা হাসতে হাসতে ফেটে পড়ল।ঝুলা ভুত বলল—“তোর অভিনয় তো মন্দ না রে! এবার আমাদের পালা।”তারপর তিন ভুত মিলে হারুকে ধরে দোচালা বাড়ির চালে উঠিয়ে দিল।সেখানকার পুরনো কড়িকাঠে তাকে বসিয়ে বলল—“যতক্ষণ না তুই ভুতদের শান্তি দিবি, ততক্ষণ এখানেই বসে থাকবি। নিচে নামার উপায় নেই!”হারু নিচে তাকিয়েই ভয় পেয়ে ফিসফিস করে বলল,“আমি দুষ্টুমি আর করব না… আর ভুত সেজে আসব না… নামায়া দেন।”পেত্নী রাধা হাসি চেপে বলল—“প্রতিশ্রুতি?”হারু মাথা নেড়ে বলল—“হ, প্রতিশ্রুতি!”ভুতেরা হারুকে নামিয়ে দিল।হারু দৌড়ে বাড়ি পালাল, পেছনে তাকালও না।পরের দিন গ্রামে খবর রটে গেল—“হারু নাকি সত্যিকার ভুতের হাতে শাসন খাইছে। এখন নাকি ভুতের ঢেড়ায় গেলে হাঁটু কাঁপে!”ভুতেরা শান্তিতে থাকল, আর হারু শিখল—ভুতকে ভুত দেখানো যায় না,কারণ ভুতেরা যখন মানুষ সেজে রাগ ধরে,মানুষের কিছু করার থাকে না—শুধু দৌড়ানো ছাড়া!
গ্রামের দক্ষিণ মাথায় বাঁশঝাড়ের পাশে একটা পরিত্যক্ত দোচালা বাড়ি রয়েছে। সবাই তাকে বলে ভুতের ঢেড়া। বহু বছর ধরে সেখানে নাকি ঝুলঝাপটার ভুত, পেত্নী, আর এক গোরখোদোর আত্মা থাকে। রাত হলেই বাড়িটার চারদিকে কুয়াশা ঘনীভূত হয়, ভেতর থেকে ঠকঠক শব্দ আসে।কিন্তু গ্রামের একমাত্র ভয়হীন ব্যক্তি—হারু—এসব গল্পকে পাত্তা দেয় না। হারুর কাজই হলো দুষ্টুমি করা, লোকজনকে ভয় দেখানো, আর নানা রকম উপদ্রব সৃষ্টি করা। একদিন সে ঠিক করল, মানুষকে ভয় দেখানো তো পারি, দেখি ভুতকে ভয় দেখানো যায় কি না!সেদিন রাত বারোটায় হারু হাতে লণ্ঠন আর মাথায় টিনের কৌটা পরে ভুতের ঢেড়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঘাড় বাঁকিয়ে বলল—“এই যে ভুতেরা! হারু আইছে! যারে ধরে কান মুলি না দিলে হারুর নাম বদলাই!”
0 Comments