শেষ ট্রেনের যাত্রী—একটি রাতের গল্প, যেখানে ভয় শুধু অন্ধকারে নয়,পরিচিত মুখে, পরিচিত কণ্ঠে, আর নিজের রক্তের বন্ধনে লুকিয়ে আছে।পড়তে শুরু করুন।কিন্তু সাবধান—একবার উঠলে নামার উপায় নেই।
**শেষ ট্রেনের যাত্রী**part: 01রাত তখন ১২টা ৪৭ মিনিট।স্টেশনটা মৃতের মতো নিস্তব্ধ। বাতাসে পুরনো লোহার গন্ধ আর ভেজা মাটির গন্ধ মিশে আছে। দূরে দু-একটা ভাঙা বাতি ঝিকিমিকি করছে, কিন্তু প্ল্যাটফর্মের বেশিরভাগ জায়গাই ঘন অন্ধকারে ডুবে আছে। কোথাও থেকে একটা বিড়ালের কর্কশ ডাক ভেসে আসছে, তারপর আবার চুপ।রাহাত বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। হাতের তালু ঘামে ভিজে গেছে। আজ তার বাড়ি ফেরার কথা ছিল না। কিন্তু মায়ের ফোনটা পাওয়ার পর আর কোনো কিছু মাথায় থাকেনি।“বাবা… আজ রাতেই বাড়ি আয়। তোকে… তোকে খুব দরকার।”মায়ের কণ্ঠে এমন একটা ভাঙা ভয় ছিল, যেটা রাহাত আগে কখনো শোনেনি। যেন কেউ তার গলা চেপে ধরে কথা বলাচ্ছে।শেষ ট্রেন প্রায় মিস হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল—কিন্তু সেটা স্বাভাবিক হুইসেলের মতো নয়। যেন কেউ গলার ভিতর থেকে চিৎকার করে উঠছে।ট্রেনটা ধীরে ধীরে স্টেশনে ঢুকল। চাকার শব্দ স্বাভাবিক নয়—যেন হাড়ের ওপর লোহা ঘষছে।অদ্ভুত ব্যাপার হলো—ট্রেনের প্রায় সব কামরাই অন্ধকার। শুধু মাঝখানের একটি কামরায় মৃদু হলুদ আলো জ্বলছিল, যেন কেউ ইচ্ছে করে সেটা জ্বালিয়ে রেখেছে।রাহাত দৌড়ে সেই কামরায় উঠে পড়ল। দরজা পিছনে বন্ধ হয়ে গেল একটা ভারী শব্দে।ভেতরে ঢুকে সে থমকে গেল।পুরো কামরায় মাত্র একজন যাত্রী। একজন বৃদ্ধ লোক। জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে। তার পিঠ সোজা, মাথা একটু কাত। শরীর থেকে একটা হালকা পচা গন্ধ আসছে—যেন ভেজা কাপড় অনেকদিন রোদে না শুকিয়ে রাখা হয়েছে।রাহাত তার বিপরীত সিটে বসে পড়ল। হাত কাঁপছে।ট্রেন চলতে শুরু করল। বাইরের অন্ধকার আরও ঘন হয়ে উঠছে।কয়েক মিনিট পর বৃদ্ধ লোকটি হঠাৎ মুখ ঘোরাল। তার চোখ দুটো অদ্ভুত শান্ত, কিন্তু চোখের মণি যেন একটু বেশি বড়।“তুমি কি রাহাত?”রাহাতের গলা শুকিয়ে গেল।“জি… কিন্তু আপনি আমার নাম জানেন কীভাবে?”বৃদ্ধ লোকটি ধীরে ধীরে পকেট থেকে একটি পুরোনো, হলুদ হয়ে যাওয়া খাম বের করল। খামের কোণগুলো ছিঁড়ে গেছে।“তোমার মা আমাকে পাঠিয়েছে।”রাহাতের বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।“আমার মা?”“এটা তোমার জন্য।”রাহাত কাঁপা হাতে খামটা নিল। খামের ওপর তার নিজের নাম লেখা। কিন্তু হাতের লেখা দেখে তার মুখ শুকিয়ে গেল। রক্ত যেন শিরা থেকে সরে গেল।এই হাতের লেখা সে চেনে। এটা তার বাবার হাতের লেখা।তার বাবা মারা গেছেন আট বছর আগে। হার্ট অ্যাটাকে। কফিনে শুইয়ে দেখেছে সে নিজে।রাহাত ধীরে ধীরে খামটা খুলল। ভেতরে একটি ছোট কাগজ। কালি কিছু জায়গায় ছড়িয়ে গেছে, যেন লেখার সময় হাত কাঁপছিল।মাত্র একটি বাক্য—**“রাহাত, আজ রাতে বাড়ি যাস না।”**রাহাত কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তারপর বৃদ্ধ লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল, কণ্ঠস্বর কাঁপছে—“আপনি… আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?”বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিল না। বরং জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, গলায় কোনো আবেগ নেই—“পরের স্টেশনে নেমে যেও।”“কেন?”“কারণ এই ট্রেনটা তোমাকে তোমার বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে না।”রাহাতের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।“তাহলে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?”বৃদ্ধ এবার তার দিকে তাকাল। চোখের মণিতে আলোর প্রতিফলন নেই।“যেখানে তোমার বাবা আট বছর আগে গিয়েছিলেন।”ঠিক তখনই ট্রেনের সব আলো নিভে গেল।অন্ধকারের মধ্যে রাহাত শুধু একটা শব্দ শুনতে পেল—খুব কাছ থেকে, তার পাশের সিট থেকে—“রাহাত…”কিন্তু সেখানে তো কেউ ছিল না।ট্রেনটা হঠাৎ প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল। চাকার নীচে যেন কিছু পিষ্ট হয়ে গেল। আলো আবার জ্বলে উঠল।বৃদ্ধ লোকটি নেই।কামরায় এখন শুধু রাহাত। আর তার সামনে পড়ে আছে আরেকটি খাম। এবার খামের ওপর লেখা—**“এটা খোলার আগে জানালার বাইরে তাকিও না।”**রাহাতের হাত কাঁপতে লাগল। কিন্তু মানুষের কৌতূহল ভয়কে অনেক সময় হারিয়ে দেয়।সে ধীরে ধীরে জানালার দিকে তাকাল।আর যা দেখল, তাতে তার শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল।ট্রেনটি কোনো স্টেশনে দাঁড়িয়ে নেই।ট্রেনটি দাঁড়িয়ে আছে তার নিজের গ্রামের পুরোনো কবরস্থানের পাশে। অন্ধকারে কবরের সারি সারি পাথরগুলো দেখা যাচ্ছে। কিছু কবর খোলা। মাটি সাম্প্রতিকভাবে খোঁড়া হয়েছে।আর কবরস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ।রাহাত চোখ কুঁচকে তাকাল। মানুষটা ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তারপর হাত তুলে ট্রেনের জানালার দিকে ইশারা করল।রাহাত চিনে ফেলল তাকে।সে তার বাবা।কিন্তু তার বাবা মারা গেছেন আট বছর আগে।এবং এখন যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, তার মুখের চামড়া কোথাও কোথাও ছিঁড়ে গেছে। চোখের একটা গর্ত ফাঁপা। জামাকাপড় মাটি আর পচা পাতায় ভেজা। বুকের ওপর যেখানে হার্ট ছিল, সেখানে একটা কালো গর্ত।রাহাত চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল—ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।স্ক্রিনে মায়ের নাম।রাহাত ফোন ধরল। হাত কাঁপছে তীব্রভাবে।ওপাশ থেকে মায়ের কাঁপা কণ্ঠ—“বাবা… তুই কোথায়?”“মা, আমি ট্রেনে…”কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর মা ফিসফিস করে বললেন, কণ্ঠস্বর ভেঙে যাচ্ছে—“কোন ট্রেনে?”রাহাত বলল,“শেষ ট্রেনে…”ওপাশ থেকে মায়ের কান্নার শব্দ শোনা গেল। তারপর একটা কথা, যেটা শুনে রাহাতের হাঁটু নরম হয়ে গেল—“বাবা… ওই ট্রেন তো আট বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। সেই রাতেই… যে রাতে তোর বাবা মারা গেল… সেই ট্রেনেই সে উঠেছিল। আর আর কখনো নামেনি।”ফোনটা রাহাতের হাত থেকে পড়ে গেল।আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার সামনে বসে থাকা খালি সিট থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল—গলায় মাটির গন্ধ, কিন্তু হাসির সুর আছে—“আমি তোকে বলেছিলাম, বাড়ি যাস না।”রাহাত ধীরে ধীরে মাথা তুলল।তার সামনে তার বাবা বসে আছেন।হাসছেন।কিন্তু সে হাসি আর মানুষের হাসি নয়। ঠোঁট দুটো ছিঁড়ে গেছে একপাশে, দাঁতগুলো হলুদ আর কালো, মাঝখানে মাটি আর পচা মাংসের টুকরো আটকে আছে। চোখের একটা গর্ত ফাঁপা—সেখান থেকে ঘন কালো তরল ধীরে ধীরে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। অন্য চোখটা এখনো আছে, কিন্তু মণিটা সাদা হয়ে গেছে।তিনি খামটা খুলে রাহাতের দিকে এগিয়ে দিলেন। হাতের আঙুলগুলো হাড়ের মতো পাতলা, নখগুলো লম্বা আর কালো।রাহাতের হাত কাঁপতে কাঁপতে খামটা নিল। ভেতরের কাগজটা ভেজা। লেখা—**“তুইও এখন এই ট্রেনের যাত্রী। আর এই ট্রেন কখনো থামে না।”**ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটা শব্দ শোনা গেল।কবরস্থানের মাটি ফেটে যাচ্ছে। একটা… দুটো… তারপর শত শত হাত উঠে আসছে। পচা, ফোলা, হাড় বেরিয়ে থাকা হাত। কিছু হাতে আঙুল নেই, কিছু হাতে শুধু হাড়। তারা সবাই ট্রেনের দিকে এগোচ্ছে। ধীরে ধীরে। অবিরাম।রাহাত চিৎকার করে উঠল। সিট থেকে লাফিয়ে উঠে দরজার দিকে দৌড়াল। দরজা খুলতে গিয়ে দেখল—দরজার হাতলটা আর হাতল নেই। সেখানে একটা ঠান্ডা, ভেজা হাত ধরে আছে। বাইরের হাত।সে পিছু হটল।পিছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ—“কোথায় যাবি, বাবা?”রাহাত ঘুরে তাকাল। তার বাবা এখন আর সিটে বসে নেই। তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন। বুকের কালো গর্ত থেকে একটা পচা গন্ধ বেরোচ্ছে। তিনি এক পা এগিয়ে এলেন। তারপর আরেক পা।রাহাতের পা পিছলে গেল। সে মেঝেতে পড়ে গেল।বাবা তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন। হাত দিয়ে রাহাতের গাল স্পর্শ করলেন। হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা, আর চামড়াটা খসে যাচ্ছে স্পর্শে।“তোর মা আজ রাতে ফোন করেছিল না,” বাবা ফিসফিস করে বললেন। “আমি করেছিলাম। তার গলায়। তার মুখ দিয়ে।”রাহাতের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।“মা… মা কোথায়?”To be continued......
শেষ ট্রেনের যাত্রী—একটি রাতের গল্প, যেখানে ভয় শুধু অন্ধকারে নয়,পরিচিত মুখে, পরিচিত কণ্ঠে, আর নিজের রক্তের বন্ধনে লুকিয়ে আছে।পড়তে শুরু করুন।কিন্তু সাবধান—একবার উঠলে নামার উপায় নেই।
0 Comments