মিতুর ড্রয়ারে শ\'খানেক চিঠি।বিভিন্ন নামে,বিভিন্ন ঢঙে লেখা।একেক চিঠি একেক খামে ভরা। মিতু চিঠি লিখে যখন তার বয়স ৫ তখন থেকে,জীবনে লিখা প্রথম চিঠি তার মৃত বাবা মঈনউদ্দীনকে। চিঠির সারাংশ খানিকটা এমন, বাবা কেন শনিবার বিকেলে আসে নি তার সাথে দেখা করতে। মিসেসে রেহেনা চিঠি দেখে হতভম্ব, একজন মৃত মানুষ কি করে আসতে পারে দেখা করতে? এ নিয়ে প্রচুর হইচই করে সবাইকে জানিয়ে দেয়,মেয়ের উপর নির্ঘাত প্রেতাত্মা ভর করেছে। এরপর থেকে মিতু চিঠি গুলো লুকিয়ে লিখে,সে বুঝতে পেরেছিলো চিঠি লিখাটা খুব ভালো কাজ নই বোধহয়। এখনো সে চিঠি লিখে,চিঠিতে কি যে লেখে আজ পর্যন্ত কেউ দেখতে পারে নি। -সামনে তোমার পরীক্ষা, তুমি এত অনিয়ম করছো কেন?(গোল ফ্রেমের চশমা পরা,উস্কুখুস্কু চুল,ক্লান্ত এক জোড়া চোখ তুলে তাকালো মিতু)-অনিয়ম করছি না তো মা।-যত রাতেই উঠি না কেন,তোমাকে জেগে থাকতে দেখি।এত রাত জেগে কি করো?পড়াশোনা করো বলে তো আমার মনে হয় না।-ঠিক বলেছো,এত এত পড়া বইয়ের পাতায় নেই যে রোজ রাত জাগতে হবে । -তাহলে ঘুমিয়ে পরো।কি কাজ তোমার? -চিঠি লিখছি মা,বিরক্ত করো না।বিরক্ত করলে আমার মন খারাপ হয়ে যায়।-তুমি কাকে চিঠি লিখো জানতে পারি?-তুমি ওদের চিনবে না।মিসেস রেহানা একরাশ বিরক্তি নিয়ে মেয়ের রুম থেকে বেরিয়ে এলো।তার বারবার মনে হচ্ছিলো এই মেয়ে কিছুতেই সুস্থ হতে পারে না। সারারাত জেগে কি এমন চিঠি লিখে সে?হঠাৎ ভীষণ মন খারাপ হয়ে যায় তাঁর। হয়তো মেয়েকে সে পর্যাপ্ত ভালোবাসা আর যত্ন দিয়ে বড় করতে পারে নি তাই আজ এই অবস্থা। একবার পেছন ফিরে মেয়েকে দেখে সে।সোনালী রঙের একটা টেবিল ল্যাম্পের নিচে বসে মাথা ঝুঁকে সে চিঠি লিখছে,গভীর মনোযোগ দিয়ে, উস্কুখুস্কু চুলগুলো বারবার চোখের উপর এসে পরায় ভীষণ বিরক্ত হচ্ছে সে। এই মেয়ে ভীষণ অস্বাভাবিক,এর আচার আচরণও,বিশেষ কোনো বন্ধুও নেই যার থেকে খবর নেওয়া যাবে আসলে ও কাকে চিঠি লিখে?মিতুদের বাড়িটা অনেকটাই ভিতরে, খানিকটা জঙ্গলের আড়ালে, আশেপাশে আর কোনো জনবসতি নেই বললেই চলে। এই বাড়িটা মঈনুদ্দিনের শখের বাড়ি,উনার মধ্যবিত্ত জীবনের সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে এই বাড়ি বানিয়েছেন। পরিত্যক্ত জায়গা পরে ছিল,কম দামে পেয়ে নিয়ে নিয়েছেন। রেহানার সাথে প্রায়ই ঝগড়া লাগতো উনার,রেহেনা দাঁত খিঁচিয়ে বলতো যে না বাড়ি, নেমপ্লেটে আবার লিখেছে \"শখের বাড়ি\"। রোগাপটকা মঈনুদ্দিন স্থীর কথা গায়ে মাখতো না,মনোযোগ দিয়ে ভাত খেতো বসে বসে।মাঝেমধ্যে চশমার ফাঁক দিয়ে স্ত্রীকে দেখতো আর বিড়বিড় করে বলতো - এত সুন্দর মায়া মায়া চেহেরাটা, অথচ মুখ খুললেই মনে হয় একশো কাক একসাথে মিছিল করছে। মঈনউদ্দীনের \" শখের বাড়ি\'র \" কিছু টা দূরেই একটা ডাকবাক্স আছে। লোকমুখে শোনা যায় এটা ব্রিটিশ আমলের ডাকবাক্স।জং ধরা,লাল রঙের পুরানো একটা ডাকবাক্স, আশেপাশ টা জঙ্গলে ভরা। এখানে কুকুর -বেড়াল ব্যাতীত তেমন কাউকে আসতে দেখা যায় না।তবে রোগা-পাতলা একটা মেয়ে প্রায়ই ধীরগতিতে হেঁটে এই ডাকবাক্সের সামনে দাঁড়ায়,হাতে থাকে বাদামী রঙের খাম,চুপচাপ চিঠিটা বাক্সের মধ্যে ফেলে সে চলে যায়। এই মেয়েটাই মিতু।-তুমি ভুতপ্রেতে বিশ্বাস করো? প্রচন্ড হতাশা আর ক্লান্তি নিয়ে রেহেনা জানতে চায়।-কি আশ্চর্য! ভুতপ্রেতে কেন বিশ্বাস করবো?তুই করিস নাকি?-করি মা,আমার মনে হয় আমার মেয়ের উপর ওর বাবা মঈনউদ্দীনের ভূত চেপে আছে, যে কিনা মেয়েকে ছাড়তে চাচ্ছে না।-কি সব বলছিস?বাবা কেন মেয়ের উপর ভূত হয়ে চাপবে?-আমার মনে হয়, ওর বাবা চায় সবসময়ই যেন মিতু তার কাছে কাছে থাকে। -আজেবাজে কথা বলিস না,এই দুনিয়ায় ভূত বইলা কিছুই না।মেয়েটার আজ দুদিন খুব জ্বর, এমনি খুব একটা অসুস্থ সে হয় না। শেষ কবে জ্বরজারি হয়েছে মনে নেই।আজ এত জ্বর দেখে রেহেনা ভয় পেয়ে গেলো। এমনিতেই জ্বর জিনিস টা নিয়ে তার ফোবিয়া আছে মঈনুদ্দিন মারা যাওয়ার এক সপ্তাহ আগ থেকে তার প্রচন্ড জ্বর ছিল।ডাক্তার বললো ভাইরাস জ্বর, চলে যাবে, কিন্তু আর যায় নি।শেষবারের মতো উনার শরীর ঠান্ডা হয়েছে মৃত্যুর ১০ মিনিট আগে। রেহেনা পাগলের মতো মিতুর মাথায় জল ঠালছে।মেয়েটার চোখে গোল ফ্রেমের চশমা, রেহেনা চশমা খুলে বালিশের পাশে রাখলো। মিতু চোখজোড়া খুলে মায়ের দিকে তাকালো,এত ক্লান্ত চোখ রেহেনা অনেকদিন পরে দেখেছে,শেষ দেখেছিলো মিতুর বাবার চোখ,যখন সে ক্লান্ত চোখে, রুগ্ন হাত বের করে রেহেনার গাল ছুঁয়ে বলছিলো, আমার একটু পানি দেও,জমজম কূপের পানি। রেহেনা তখন ভয়ার্ত গলায় জানতে চায়, কেন মঈনদ্দুনিনের হাত এত ঠান্ডা হয়ে গেছে? তবে কি তাঁর জ্বর ছেড়ে গেছে?-জ্বর ছেড়ে গেছে রেহেনা, আর আসবে না জ্বর। তুমি চিন্তা করিও না,যাও জমজম কূপের পানি নিয়ে আসো।রেহেনা পানি এনে মঈনদ্দুনি এর মুখে দেয়।-রেহেনা, আমার মেয়েটাকে নিয়ে আসো,আমার বুকের উপর দাও।মিতু তখন ছোট, ৮ মাসের শিশু কেবল, রেহেনা তাকে বাবার বুকের উপর শুইয়ে দেয়।রুগ্ন হাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে সে,ইশারায় রেহেনাকে বসতে বলে তার পাশে।-বালিশ টা সরাও, আমার মাথাটা নাও দেখি তোমার কোলে।-এমন করে কথা বলছো কেন মিতুর বাবা?-জানো রেহেনা,এই বাড়িটা আমার খুব শখের, সেজন্য এই বাড়ির নাম শখের বাড়ি। আমার জীবনের প্রথম শখ কি জানো?-কি?-তুমি, তোমাকে আনার আগে আমি এই বাড়ি বানাই।আমার অতো টাকাপয়সা ছিল না তো,তাই ভালো জায়গায় বানাতে পারি নি।তুমি মনে কিছু নাও নি তো?-আমি মনে কেন কিছু নিবো?আমার বাড়ি দিয়ে কি হবে? আমার কাছে আপনি থাকলেই চলবে। -আসো তোমার কপালে একটা আদর দেই।-রেহেনা কপাল এগিয়ে দেয়।মঈনউদ্দীন ঘুমিয়ে পরে,গভীর ঘুম,মেয়েকে বুকে জড়িয়ে, স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পরে। রেহেনার ঘুম ভাঙে মিতুর কান্নার শব্দে,তখনও তার স্বামী ঘুমিয়ে আছে তার কোলে।রেহেনা সারারাত একটা মৃত মানুষ কে কোলে রেখে বসে ছিল,সে জানতোই না।মিতু না কাঁদলে হয়তো সে তখনও জানতে পারতো না।মিতু মায়ের দিকে তাকালো, মা আমাকে এক গ্লাস পানি দাও।জমজম কূপের পানি।বুকটা কেমন মোঁচড় দিয়ে উঠলো।রাত তখন ৩টে ২৩ মিনিট, মিতু ঘুমাচ্ছে, জ্বর ছেড়ে গেছে আরো ঘন্টা দেড়েক আগে। রেহেনা মেয়ের মাথার পাশে বসে আছে। আজ আর সে ঘুমিয়ে পরে নি।মাঝরাতে মিতু উঠে বসলো,মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি এবার ঘরে যাও মা,আমি ভালো আছি এখন।অনিচ্ছাসত্ত্বেও রেহেনা নিজের রুমে এসে বসে,হঠাৎ খট করে দরজা খোলার শব্দে সে চমকে উঠে। মিতু কোথাও একটা যাচ্ছে হাতে বাদামী রঙের খাম,গায়ে বাবার ব্যবহার করা মেরুন রঙের একটা বিশাল চাদর। রেহেনা কিছু না বলে, মিতুকে অনুসরণ করে। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার,কাকপক্ষীও নেই,মাঝেমধ্যে একটা দুইটা পেঁচা বিকট শব্দে ডেকে উঠছে, রাস্তার কুকুরগুলো আজ গভীর নিদ্রায় ডুবে আছে। জনমানবহীন রাস্তায় মিতু ঘটঘট করে হেঁটে যাচ্ছে। লাল রঙের ডাকবাক্সের সামনে এসে সে দাঁড়ালো।একে একে পাঁচটি চিঠি সে ফেললো,এরপর আবার হাঁটা শুরু করলো,একটা পুরোনো ব্রিফকেসের সামনে দাঁড়িয়ে মিটমিট করে হাসছিলো মিতু।ব্রিফকেসটা খুলে তিনটে চিঠি নিলো হাতে । রেহেনা মনে হচ্ছিলো এই মেয়ে টা কিছু তেই তার মেয়ে হতে পারে না।মিতু মায়ের দিকে না তাকিয়ে ডাকলো- মা।রেহেনা সামনে এসে দাঁড়ালো,মিতু অসম্ভব শান্ত ভঙ্গিতে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। What are you doing here, Mitu?-চিঠি নিতে এসেছি মা,চিঠি দিতেও।-কার চিঠি?-বাবা,নীলু আর ছোট কাকার।-তুমি এসব কি বলছো?ওরা কি করে তোমাকে চিঠি লিখবে?ওরা সবাই মৃত,মৃত মানুষ কখনো চিঠি লিখে না।-মিতু হাসি হাসি মুখ করে, মায়ের দিকে চিঠি এগিয়ে দিলো।(মিসেস রেহেনা, প্রথম চিঠিটা হাতে নিয়ে দেখলো তার স্বামী মঈনুদ্দিনের লেখা চিঠি এবং এই চিঠির লেখাগুলোও অবিকল মঈনদ্দুনি এরই,পরের চিঠিটা নীলু র।নীলু ছিল মিতুর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ,রোড এক্সিডেন্টে গত বছর মারা যায়,পরের চিঠি টা মিতুর কাকা রফিকের,যার লাশই তারা খুঁজে পায় নি কখনো,সে আজ ১৫ বছর ধরে নিখোঁজ।) রেহেনা বিস্ময় নিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।-তুমি কি রোজ এই ডাকবাক্সে চিঠি ফেলো?-রোজ না,সপ্তাহে একদিন ফেলি।চিঠিগুলো রাতে ফেলতে হয়,চিঠি আসেও রাতে। তাই তুমি দেখতে পাও নি কখনো। মিতু,তুই কি তোর বাবাকে দেখতে পাস?অবশ্যই দেখতে পাই মা,শুধু বাবা না,আমি বাকিদেরও দেখতে পাই।বাবাই আমাকে এই ডাকবাক্সের কথা জানিয়েছে। বাড়ি চলো মা,বাবার শখের বাড়ি\'তে।চিঠিগুলো পড়া শেষ হলে আমাকে দিয়ে দিও।রেহেনা দাঁড়িয়ে আছে, হাতে চিঠি ধরে, তার হাঁটার কিংবা চিন্তা করার শক্তি কাজ করছে না। মিতু গায়ে চাদর জড়িয়ে, উৎফুল্ল মনে গান গেয়ে গেয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। তার মা যে একা মধ্যরাতে দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। নির্জন রাস্তা,ল্যাম্পপোস্টের সোনালী আলোয় ঘুরপাক খাচ্ছে উইপোকার দল,মানুষের মতো চাকচিক্যের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে এরাও ঠকে যায়,রাস্তায় এতক্ষণে একটা কুকুর দেখা গেলো,পঁচাগলা, গা থেকে দুর্গন্ধ আসছে, ক্ষনে ক্ষনে পেঁচা বিকট শব্দে ডেকে উঠছে। জেনো এটাও একটা সতর্ক সংকেত, ঘরে ফেরার সংকেত। মিতু একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে মাকে ডাকে, আসো মা। অতো ভয়ানক মুখমণ্ডল রেহেনা আর কখনো দেখে নি। ঘরে ফিরেই মিতু সোফায় ঘুমিয়ে পরে।মিসের রেহেনা, মেয়ের ড্রয়ারে খুঁজে পায় শ\'খানেক চিঠি, সব চিঠি ই মৃত মানুষের লিখা,হাতে থাকা তিনটে চিঠির দিকে তাকায় সে,এখন চিঠির সংখ্যা একশত তিন। মিতুর জানালা ছুঁয়ে একটা পেঁচা উড়ে গেলো,,,,,,,জানালার পর্দাগুলো হঠাৎ দুলে উঠে, বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছিলো কুকুরের বিকট আর্তনাদ
0 Comments