গোরস্থান আর শ্মশানের মধ্যবর্তী এক নির্জন, অভিশপ্ত জায়গা—যেখানে বটগাছের ছায়ায় ঘন অন্ধকার আর শ্মশানের ধোঁয়ায় নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। এমন এক ভীতিপ্রদ পরিবেশে অপেক্ষা করছিল দুই কবরখননকারী—করিম ও তার সহকারী রতন।রতন কপালে জমে ওঠা ঘাম মুছে বলল, \"ওস্তাদ, আর কতক্ষণ বইসা থাকমু? শ্মশানের দোয়ায় তো দম বন্ধ হয়ে আসতাছে! আর লাশটা তো ওই শ্মশান ঘাটে নেওয়ার কথা ছিল, আমাগো কাছে কেন পাঠাইতাছে?\"করিম গম্ভীর গলায় বলল, \"চুপ কর রতন! এইটা সাধারণ লাশ না, এটা জগাই ডাকাতের লাশ। শুনছি ওরে চিতায় তোলার পর আগুন নিভা গেছে তিনবার। চিতার কাঠ জ্বলে, কিন্তু ওর শরীর জ্বলে না। তাই শ্মশানের অঘরি বাবা কইছে, যার শরীরে আগুন নেয় না, তারে মাটি দিতে।\"জায়গাটা খুবই খারাপ—এখানে হিন্দুও মরে না, মুসলিমও মরে না; জায়গাটা ভূত-প্রেতের আখড়া। তবুও টাকার তাগিদে তারা সেখানে কাজ করছিল। কুয়াশার বুক চিরে হঠাৎ একটা ডিঙ্গি নৌকা ঘাটে এসে ভিড়ল। নৌকা থেকে নেমে এল অদ্ভুত এক অঘরি সাধু—গলায় হাড়ের মালা, পরনে কালো পোশাক। সাধু নৌকা থেকে নামিয়ে দিল লাল শালু কাপড়ে মোড়ানো এক ভারী লাশ। লাশটা থেকে তখনও হালকা ধোঁয়া বের হচ্ছিল।অঘরি সাধু বলল, \"নে করিম, তোর মাল তুই নে! আগুন ওরে চিবায়া খাইতে পারে নাই, দেখ এহন মাটি ওরে গিলে কিনা।\"লাশ ধরে রতন আঁতকে উঠল, \"বাবা, লাশের গা তো গরম! ও কি মরা, না জ্যান্ত?\"অঘরি সাধু সতর্ক করে বলল, \"ও মরাও না, জ্যান্তও না—ও এখন প্রেত! সূর্য উঠার আগে ওরে মাটির নিচে না দিলে ও তোদের দুইজনের ঘাড় মটকাইবো।\" এ কথা বলে সাধু নৌকায় উঠে কুয়াশায় মিলিয়ে গেল।করিম আর রতন লাশটা পাশে রেখে কবর খুঁড়তে শুরু করল। কিন্তু মাটি কাটতে গিয়ে ঘটল এক অলৌকিক ঘটনা—মাটির বদলে গর্ত থেকে বের হয়ে আসতে লাগল কালো ছাই, পোড়া কাঠ-কয়লা আর মানুষের হাড়গোড়! জায়গাটা একসময় শ্মশান ছিল, নদী ভাঙনে পরে গোরস্থানে পরিণত হয়েছে।হঠাৎ লাল কাপড়ের ভেতর থেকে লাশের পেটটা নড়ে উঠল! করিম রতনকে আয়াতুল কুরসি পড়তে বলে লাশের মুখের কাপড় সরাতে গেল। কাপড় সরাতেই দুজনের রক্ত হিম হয়ে গেল—লাশের মুখের একপাশ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে হাড় বেরিয়ে গেছে, আর অন্যপাশটা একদম ঠিক। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, লাশের ঝলসানো দিকের চোখটি খোলা এবং তার মণি আগুনের মতো লাল টকটকে!তারা ধরাধরি করে লাশটাকে কবরে নামাতেই মাটির নিচ থেকে ভূমিকম্পের মতো বিকট আওয়াজ হলো। শ্মশানের দিক থেকে শিয়ালের পাল একসাথে ডেকে উঠল। ঠিক তখনই লাশের সেই ঝলসানো হাতটা বিদ্যুৎবেগে উঠে এসে করিমের পা খপ করে ধরে ফেলল! হাতটি যেন ফুটন্ত আঙ্গার—করিমের চামড়া পুড়ে যেতে লাগল।করিম যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল, \"আহ! পুইড়া গেল... রতন, আবার পা ধরছে, টান দে! ওস্তাদ হাত ছাড়ান, কোদাল মারেন!\"কিন্তু লাশ ছাড়ল না। উল্টো সে উঠে বসার চেষ্টা করে আগুনের চিরবির শব্দে গর্জে উঠল—\"করিম, আগুন আমারে খায় নাই, মাটিও আমারে খাইবো না! আমি তোদের নিয়া যামু... প্রস্তুত হ!\"রতন একটা বাঁশ দিয়ে লাশের বুকে আঘাত করতে গেল, কিন্তু লাশ এক হাতে বাঁশ ধরে ফেলল এবং বাঁশে দাউ দাউ করে আগুন ধরে গেল! দূর শ্মশান থেকে মন্দিরের ঘণ্টা আপনা-আপনি টংটং করে বাজতে শুরু করল। লাশের শক্তি আরও বেড়ে গেল।করিম যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে বলল, \"রতন! ওরে থামাইতে হইলে মিশ্র মাটি লাগবো। শ্মশানের চিতা থাইকা এক মুঠো ছাই আর কবরের এক মুঠো মাটি একসাথে মিশাইয়া লাশের চোখের মধ্যে ছুইড়া মার, জলদি!\"রতন জীবন বাজি রেখে শ্মশানের নিভে যাওয়া চিতা থেকে গরম ছাই এবং কবরের মাটি মিশিয়ে লাশের লাল টকটকে চোখে ছুড়ে মারল। সাথে সাথে গরম তেলে পানি পড়লে যেমন শব্দ হয়, তেমনই বিকট শব্দে চিৎকার দিয়ে লাশটি করিমকে ছেড়ে দিল।হঠাৎ বাতাসে ভেসে এলো অঘরি সাধুর অদৃশ্য কণ্ঠ—\"করিম, ওরে উল্টা কইরা দে! মাটির দিকে বুক দে, পিঠ দে আকাশের দিকে! আর রতন, তুই বাঁশ দিয়ে ওর পিঠে চাপ দে!\"করিম নিজের শেষ শক্তি দিয়ে টেনে লাশটাকে উপুড় করে দিল। রতন বাঁশের চাটাই ও ভারী বাঁশ লাশের পিঠে চেপে ধরে দুজনে পাগলের মতো কোদাল চালিয়ে মাটি চাপা দিতে লাগল। প্রায় আধা ঘণ্টা যুদ্ধের পর কবরের নড়াচড়া থামল, তবে মাটি চিরে তখনও গরম ধোঁয়া বের হচ্ছিল।ভোরের আলো ফুটলে করিম আর রতন কবরের পাশে ধসে পড়ল। রতন টর্চের আলো ফেলে দেখল, করিমের ডান পায়ের গোড়ালিতে যেখানে লাশটি ধরেছিল, সেখানকার মাংস পুড়ে ঠিক জগাই ডাকাতের সেই ঝলসানো মুখের অবয়ব ভেসে উঠেছে!করিম বিষণ্ন গলায় বলল, \"এই দাগ আর শুকাইবো না রে রতন। শ্মশানের মরা আর গোরস্থানের মাটি এক হইছে... আজ এই জায়গা অভিশপ্ত।\" হঠাৎ দেখা গেল, নতুন দেওয়া কবরটির মাটি ফেটে লাল পাতার একটি অদ্ভুত গাছ গজিয়ে উঠল, যা থেকে পোড়া মাংসের গন্ধ বের হচ্ছে।তারা হাত-মুখ ধুতে নদীর ঘাটে গেল। করিম পানিতে পা রাখতেই যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল, \"আহ! পানি তো অনেক গরম, নদীর পানি তো ফুটতাছে!\"অথচ রতন হাত দিয়ে দেখল নদীর পানি বরফের মতো ঠান্ডা।করিম বুঝতে পারল, জগাই ডাকাতের শরীরের সেই অদৃশ্য আগুন এখন তার শরীরে ভর করেছে। করিম বিড়বিড় করে বলতে লাগল, \"আমার শীত লাগেনা রে... আমার শরীরে আগুন, জগাই আমারে ডাকতাছে...\"কথাটি বলেই করিম গভীর নদীর দিকে হাঁটতে শুরু করল। সে হাঁটতে হাঁটতে মাঝনদীতে তলিয়ে গেল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সে যখন পানিতে ডুবছিল, তার চারপাশের পানি থেকে দাউ দাউ করে ধোঁয়া উঠছিল—যেন এক টুকরো জ্বলন্ত আঙ্গার পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে!
আগুনে না পোড়া জগাই ডাকাতের অভিশপ্ত লাশ দাফন করতে গিয়ে কবরখননকারী করিম ও রতন এক ভয়ংকর প্রেতাত্মার আক্রমণের শিকার হয়। শ্মশানের ছাই ও গোরস্থানের মাটির মিশ্রণ ছুড়ে মেরে লাশটিকে শেষ পর্যন্ত দাফন করা সম্ভব হলেও করিম রক্ষা পায়নি—লাশের অভিশপ্ত আগুন তার শরীরে ভর করায় সে রহস্যজনকভাবে নদীর পানিতে তলিয়ে চিরতরে হারিয়ে যায়।
0 Comments