এতদিন পর একটা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে...এটা আরো আগেই নেয়া উচিত ছিলো...আজ এখানে এসে অনেক ভালো লাগছে... মনে মনে কথাগুলো ভাবছিলো রাহা।এখন সে রক্তকরবী একাডেমীতে...এই একাডেমী নাচ, গান , গিটার ,তবলা ,বেহালা , আবৃত্তি শেখাবার একাডেমী। অনেক সুন্দর সাজানো গোছানো একটা পরিবেশ...যেন শিল্পীর হাতে আঁকা কোনো পেইন্টিং।রাহা বিবাহিত। তিন বছরের সংসার তার।তার হাজব্যান্ড ফাহাদ বিজনেস ম্যান।রাহাকে দেওয়ার মত কোনো সময় নেই তার...সে শুধু বোঝে বিজনেস...সবই আছে রাহার...আলিশান বাড়ি ,গাড়ি ,ব্যাংক ,ব্যালেন্স.. কিন্তু যে মানুষটিকে সে সবচেয়ে ভালোবাসে তার থেকেই পায় অবহেলা...সময় কাটে না রাহার।তাই আজ সে রক্তকরবী একাডেমীতে। ইনস্টাগ্রাম এ একটা পোস্ট দেখে এখানে এসেছে সে... জায়গাটা সুনসান...অত কোলাহল নেই।রাহার বাসা থেকেও কাছে...এটা শুধু মেয়েদের একাডেমী..বিষয়টা অদ্ভুত তবে মন্দ না... আরো একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো রক্তকরবী একাডেমীর টাইমিং রাত আটটা থেকে বারোটা...অবশ্য কত জায়গার কত কিছুই তো অদ্ভুত হয়...এসো নিপোবনে...ছায়া বীথি তলে এসো...আজ এই গানটা শেখানো হচ্ছে...রাহা শুনতে শুনতে একটা যেন ঘোরের মধ্যে চলে গেলো...ঘোর যখন কাটলো তখন রবীন্দ্রসঙ্গীত এর ক্লাস শেষ...এখন নজরুল সঙ্গীত এর ক্লাস...এক মাদকতায় কখন যে ক্লাস শেষ হয় টেরও পায় না রাহা...আরো একটা ব্যাপার হলো রাত আটটা বাজতেই তার পা আপনাআপনি এখানে ছুটে চলে আসে...এভাবেই চলে গেছে সাত দিন... ফাহাদ বোঝেও না যে রাহা ঘরে থাকে না...অবশ্য রাহার দিকে কখনও খেয়াল করলে তো বুঝবে! এদিকে একাডেমীতে অনেকের সাথে ভাব হয়েছে রাহার... একজনের নাম অতসী...সে মাস্টার্স করছে... অনেক ভালো গলা তার...গানও ভালো গায়...অবশ্য রাহা যে খারাপ গায় তা নয় তবে অতসীর মত অত ভালো না...রাহা... তুমি একটা জিনিস খেয়াল করেছো...কি?এখানকার রক্তকরবী গাছগুলো দিন দিন বড় হচ্ছে...মনে হয় এখনই গিলে খাবে...যা!তা আবার হয় নাকি... হেসে বললো রাহা...সত্যি বলছি...একটু ভালো ভাবে দেখো...রাহা খেয়াল করেছে রক্তকরবী একাডেমীর চারপাশ শুধু রক্তকরবী গাছেই ভরা... মাঝে মাঝে মিষ্টি গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ...মাথা ঝিমঝিম করে রাহার... তবুও কি এক দুর্নিবার আকর্ষণে এখানে ছুটে আসে রাহা... হয়তো তার একাকীত্বের কারণে...আজ পূর্ণিমা। চাঁদটা যেন আজ বেশীই বড় লাগছে... চাঁদের আলোয় রক্তকরবী গাছগুলো আরো বড় লাগছে... রক্তকরবী ফুলগুলো চাঁদের আলোয় লুটোপুটি খাচ্ছে...আজ যেন কেমন ভয় ভয় করছে তার...আজ বাতাসটা বড় ভারী লাগছে...তাই না অতসী...হ্যা... আমারও একই অবস্থা...আজ একটু আজব লাগছে...চলো তো চলে যাই... মনে হচ্ছে আর কিছুক্ষণ এখানে থাকলে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে...তারা ক্লাস থেকে বের হয়ে একাডেমীর গেটের কাছে দেখলো গেট বন্ধ...কি আশ্চর্য?গেট বন্ধ কেন...কি জানি কিছুই তো বুঝতে পারছি না...কোথায় যাচ্ছো তোমরা... হঠাৎ কারো ডাকে চমকে উঠলো রাহা ও অতসী...আরে...এতো ফারজানা ম্যাম... তাদের টিচার...ম্যাম...আজ আমরা একটু আগেই চলে যেতে চাই...কিন্তু যেতে চাইলেই কি যাওয়া হয়...মানে?মানে তোমাদের যে আর কখনো যাওয়া হবে না... এখানেই থাকবে আর পরিণত হবে রক্তকরবীতে...জ্বি...এসব আপনি কি বলছেন...হ্যা...রাহা অতসী...আজ পূর্ণিমা। চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার রাত...প্রস্ফুটিত হওয়ার রাত... চলে গেলে কিভাবে হবে... ফারজানা ম্যামের মুখে পৈশাচিক হাসি...ভয়ে পা জমে গেলো রাহা ও অতসীর..এ কোথায় এসে পড়লো তারা... চিৎকার করতে লাগলো তারা... কিন্তু তাদের চিৎকার কেউ শুনছে না...সবাই মোহাচ্ছন্ন... কেউ নাচছে... কেউ গানের সুরে মগ্ন... আস্তে আস্তে তারা পরিণত হচ্ছে এক একটি রক্তকরবীতে... অতসী কাঁপতে কাঁপতে রাহার হাত শক্ত করে চেপে ধরলো...রাহা চোখ বন্ধ করে ফেললো।আর দেখা হবে না ফাহাদের সাথে...চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্র...বেশ কিছুদিন পর...ফেসবুকিং করতে করতে হঠাৎ চোখ আটকে গেলো নাইমার...\"রক্তকরবী একাডেমী\" ওয়াও..নামটা তো বেশ সুন্দর..নাচ শেখার জন্য উপযুক্ত স্থান...কালকেই যাবে সে সেখানে...নাইমা জানে না সে কোন পথে পা বাড়াচ্ছে...সে ভাবতেও পারছে না সে হতে যাচ্ছে রক্তকরবী একাডেমীর পরবর্তী শিকার।
0 Comments