গরিবের অপরাধ by \"Riaz khan hridoy\" রাহেলা জানত না, পাঁচ হাজার পাঁচশো টাকার একটা অঙ্ক মানুষের জীবন থেকে ত্রিশটা বছর কেড়ে নিতে পারে। সেদিন নওগাঁর সেই সকালটা অন্য সব দিনের মতোই ছিল। উঠোনে ঝরনা পাতার ছায়া, দূরে ধানক্ষেতের ওপর রোদ্দুর, আর চুলায় বসানো ভাতের হাঁড়ি। রাহেলার অপরাধ ছিল সে গরিব। আর গরিবের অপরাধের কোনো জামিন নেই।স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরতে গিয়ে সে জড়িয়ে পড়েছিল এক মামলায়। কাগজে লেখা ছিল জরিমানা ৫৫০০ টাকা। কিন্তু কাগজ জানে না ক্ষুধার দাম, জানে না অনাহারের ওজন। টাকা জোগাড় করতে না পারায় আইনের নিয়ম অনুযায়ী সে হয়ে উঠল অপরাধী। সেদিন যেদিন রাহেলা কারাগারে ঢুকেছিল, তার চুল পাকা ছিল না। তখন তার বয়স পঁয়ত্রিশ।কারাগারের দেয়ালগুলো সময় গিলে খায়। দিন যায়, বছর যায়, কিন্তু গরিবের মুক্তি আসে না। রাহেলার দিনগুলো কেটেছে বন্দি নারীদের দীর্ঘশ্বাস শুনে। কেউ যৌতুকের মামলায়, কেউ মিথ্যা অভিযোগে, কেউ শুধু আইনের ভাষা না বোঝার অপরাধে। আইন সবার জন্য সমান–এই কথাটা কারাগারের দেয়ালে লেখা থাকলে হয়তো ভালো লাগত, কিন্তু বাস্তবে আইন সবচেয়ে কঠিন দুর্বলদের জন্য।বাইরে তখন দেশ বদলাচ্ছিল। শহরে উঁচু দালান উঠছিল, বড় বড় রাস্তা হচ্ছে, টিভিতে উন্নয়নের গল্প। কিন্তু কারাগারের ভেতরে সময় থেমে থাকে। রাহেলা জানত না, তার গ্রামে স্কুল হচ্ছে কি না, নদী ভাঙছে কি না, কিংবা তার সন্তানেরা বেঁচে আছে কি না। রাষ্ট্র তাকে শাস্তি দিয়েছিল, কিন্তু কখনো জানতে চায়নি—এই শাস্তির মানে কী?ত্রিশ বছর পর একদিন হঠাৎ দরজা খুলে গেল। রাহেলা মুক্তি পেল। তখন তার বয়স পঁয়ষট্টি। আয়নায় তাকিয়ে সে নিজেকে চিনতে পারল না। চোখে গভীর গর্ত, মুখে সময়ের কাটা দাগ, চুল পুরো সাদা। যে জীবনটা সে বাইরে কাটাতে পারত—মায়ের মতো, দাদির মতো, সাধারণ একজন মানুষের মতো—সেটা সে রেখে এসেছে কারাগারের অন্ধকারে।রাহেলার গল্প একার নয়। এই দেশে হাজারো রাহেলা আছে। কেউ বিনা চিকিৎসায় মরে, কেউ ন্যায্য মজুরি পায় না, কেউ শ্রম দিয়ে বাঁচলেও সম্মান পায় না। শ্রমিকের ঘাম দিয়ে গড়া শহরে শ্রমিকের ঘরের চাল নেই। কৃষকের হাতে ফসল, কিন্তু ভাত নেই। আইনের খাতায় তারা সবাই অপরাধী—কারণ তারা প্রশ্ন করতে জানে না, টাকা দিতে পারে না।এই সমাজে অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত হয় টাকার অঙ্কে। বড় অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়, আর ছোট অপরাধে গরিবের জীবন থেমে যায়। বিচার এখানে ন্যায়ের নয়, সামর্থ্যের। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে রাহেলা বুঝেছিল—আইন চোখ বাঁধা হলেও সমাজের চোখ বাঁধা নয়। সমাজ জানে কে শক্তিশালী, কে দুর্বল।রাহেলা আজ মুক্ত, কিন্তু তার জীবন আর ফেরত আসবে না। সে শুধু একটাই প্রশ্ন রেখে যায়—একটি রাষ্ট্র কি এতটাই নিষ্ঠুর হতে পারে, যেখানে পাঁচ হাজার পাঁচশো টাকার দাম ত্রিশ বছরের চেয়েও বেশি? যদি এই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজি, তবে রাহেলার মুক্তি শুধু একটি তারিখ হবে, ন্যায় হবে না।তবে পরিশেষে একটি প্রশ্ন রেখে যেতে চাই। আইন কী, ন্যায় কী ? আর মানুষ হওয়ার মানে কী ?
0 Comments