Full Story:পর্ব এক,,, শেষ ট্রেনরাত সাড়ে এগারোটা। স্টেশনে ভিড় নেই বললেই চলে। অরিন্দম অফিস থেকে ফিরছে। আজ আবার দেরি হয়ে গেল। শেষ ট্রেনটা ধরতে হবে, নইলে বাড়ি ফেরা হবে না।ট্রেন এল। অরিন্দম তার চেনা বগিতে উঠে জানালার পাশে বসল। বগিতে মাত্র কয়েকজন মানুষ। কেউ ঘুমাচ্ছে, কেউ ফোনে ব্যস্ত। অরিন্দম ক্লান্ত চোখে জানালার বাইরে তাকাল। শহরের আলো ধীরে ধীরে পিছনে সরে যাচ্ছে।ঠিক সেই সময় তার চোখ পড়ল, দুই সারি পিছনে, কর্নার সিটে একজন লোক বসে আছে। বয়স ষাটের কাছাকাছি, সাদা চুল, পরনে পুরনো ধূসর কোর্তা। লোকটির হাতে একটা ছোট ব্যাগ। চোখ দুটো স্থির, যেন অনেক দূরে তাকিয়ে আছে।অরিন্দম কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ভাবল, সাধারণ যাত্রী। হয়তো ক্লান্ত। সে আবার জানালার দিকে তাকাল।পরদিন রাতে আবার সেই ট্রেন। আবার সেই বগি। আর অবাক হয়ে অরিন্দম দেখল, সেই লোকটি আবার সেই সিটে বসে আছে। একই পোশাক, একই দৃষ্টি।তৃতীয় দিন। চতুর্থ দিন। প্রতিদিন একই দৃশ্য। অরিন্দমের মনে প্রশ্ন জাগল এই লোকটি কে? প্রতিদিন একই ট্রেনে, একই সিটে, একই সময়ে? এটা কি কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে কিছু আছে।পর্ব দুই,,, প্রথম কথাপঞ্চম দিনে অরিন্দম সাহস করে উঠে গেল। লোকটির পাশে গিয়ে বলল, \"দাদা, এই সিটটা কি খালি।\"লোকটি ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই, যেন সে অপেক্ষা করছিল। সে বলল, \"বসুন।\"অরিন্দম বসল। কিছুক্ষণ চুপ। তারপর জিজ্ঞেস করল, \"আপনি প্রতিদিন এই ট্রেনে ওঠেন?\"লোকটি হাসল। সেই হাসিতে ক্লান্তি, আর কিছু অজানা কষ্ট। সে বলল, \"হ্যাঁ। অনেক দিন ধরে।\"\"কোথায় যান?\"\"কোথাও না।\"অরিন্দম থমকে গেল। \"মানে?\"লোকটি জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, \"আমি ট্রেনে উঠি, কয়েকটা স্টেশন পর নেমে যাই, আবার পরদিন ফিরে আসি।\"\"কেন?\"লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে বলল, \"তোমার নাম কী?\"\"অরিন্দম।\"লোকটির মুখে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন এলো। সে আস্তে করে বলল, \"তোমার বাবার নাম সুমিত তাই না।\"অরিন্দম চমকে উঠল। \"আপনি আমার বাবাকে চেনেন?\"লোকটি মাথা নাড়ালো। তার চোখ ভিজে এলো। বলল, \"চিনি। আমি তোমার বাবা কে অনেক দিন ধরে চিনি।\"পর্ব তিন,,, অসমাপ্ত গল্পট্রেন চলছে। বাইরে অন্ধকার। অরিন্দমের বুক ধড়ফড় করছে।লোকটি বলল, \"তোমার বাবা আর আমি একসাথে কাজ করতাম। তোমার বয়স তখন দুই বছর। তোমার বাবা ছিলেন সৎ, সোজা, আর সাহসী একজন মানুষ ছিলেন। কিন্তু সেই সাহসই তার কাল হলো।\"অরিন্দম জিজ্ঞেস করল, \"কী হয়েছিল?\"লোকটি বলল, \"তোমার বাবা একটা দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই সময় গ্রামে একটা বড় চুক্তি হচ্ছিল। কিছু প্রভাবশালী মানুষ সরকারি টাকা মেরে দিচ্ছিল। তোমার বাবা তার প্রমাণ পেয়ে গিয়েছিলেন। তিনি একটা চিঠি লিখেছিলেন, যেখানে সব নাম ছিল।\"\"সেই চিঠি কোথায়?\"লোকটি তার ব্যাগ থেকে একটা পুরনো খাম বের করল। বলল, \"এই চিঠিটাই তোমার বাবা আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, \'যদি আমার কিছু হয়, তুমি আমার ছেলেকে এই চিঠি দেবে।\'\"অরিন্দমের হাত কেঁপে উঠল। \"তাহলে বাবা মারা গেলেন কীভাবে?\"লোকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। \"দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমি জানতাম, এটা দুর্ঘটনা ছিল না। তোমার বাবা মারা গেছেন কারণ তিনি সত্যিটা জানতেন।\"পর্ব চার,,, ভয় আর সত্যের মাঝেঅরিন্দম বলল, \"আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন? কেন এত বছর পর এলেন?\"লোকটি বলল, \"আমি ভয় পেয়েছিলাম। তোমার বাবার মৃত্যুর পর আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম। পরিবার ছেড়ে, গ্রাম ছেড়ে, সব ছেড়ে। আমি জানতাম, আমার নামও সেই তালিকায় আছে।\"\"কিন্তু এখন?\"লোকটি বলল, \"এখন আমার বয়স হয়েছে। আমি আর ভয় পাই না। কারণ আমি জানি, আমি বেশি দিন বাঁচব না। বাঁচার লোভে আমি অনেক দিন সত্যিটা চেপে রেখেছি। কিন্তু এখন আর পারছি না।\"অরিন্দম বলল, \"আপনি কেন ঠিক আমার ট্রেনেই উঠলেন?\"লোকটি বলল, \"কারণ আমি তোমাকে খুঁজছিলাম। অনেক বছর ধরে। তোমার ঠিকানা পেতে আমার অনেক কষ্ট হয়েছে। তারপর জানতে পারলাম তুমি এই ট্রেনে যাতায়াত করো। তাই আমি প্রতিদিন এসে বসে থাকতাম, সাহস করে তোমার সাথে কথা বলতে পারি কি না।\"অরিন্দম কিছু বলতে পারল না।পর্ব পাঁচ,,, চিঠির সত্যলোকটি খামটা অরিন্দমের হাতে দিল। অরিন্দম খুলে দেখল, ভেতরে হলদে হয়ে আসা একটা চিঠি, আর কিছু ছবি। চিঠিতে তার বাবার হাতের লেখা….\"যে পড়ছো, সে যদি আমার ছেলে হয়, তাহলে জেনে রাখো তোমার বাবা ভয় পায়নি। সে শুধু চেয়েছিল, সত্যিটা যেন কখনো চাপা না পড়ে।\"অরিন্দমের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। লোকটি বলল, \"তোমার বাবা একজন ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি আমাকে বাঁচিয়েছিলেন। এখন আমার পালা, তাকে বাঁচানোর।\"\"মানে?\"লোকটি বলল, \"আমি থানায় যেতে চাই। সত্যিটা বলতে চাই। কিন্তু তার আগে তোমার বাবা চেয়েছিলেন, তুমি সত্যিটা জানো।\"পর্ব ছয়,,, সিদ্ধান্তঅরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, \"আমি আপনাকে থানায় নিয়ে যাব।\"লোকটি হাসল, \"তুমি রাগ করছো না?\"অরিন্দম বলল, \"রাগ করার মতো সময় নেই। আমার বাবা সত্যের জন্য মরেছেন। এখন আমার দায়িত্ব সত্যিটা সামনে আনা।\"ট্রেন পরের স্টেশনে থামল। দুজন নামল। রাত তখন একটা। স্টেশন প্রায় ফাঁকা। লোকটি বলল, \"তোমার বাবা ঠিক তোমার মতোই ছিলেন। সাহসী।\"অরিন্দম লোকটির দিকে তাকাল। তারপর বলল, \"চলুন।\"পর্ব সাত,,, সত্যের আলোপরদিন সকালে থানায় গেল দুজন। লোকটি সব confess করলেন। সেই পুরনো চুক্তি, টাকার হিসাব, নাম সব। পুলিশ কেস খুলল। কয়েকদিন পর কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষ গ্রেফতার হলো।গ্রামের মানুষ অবাক। কেউ বিশ্বাস করতে পারল না, এত বছরের পুরনো রহস্য আবার আলোচনায় এলো। অরিন্দমের মায়ের চোখে পানি, কিন্তু সেটা কষ্টের নয়, শান্তির।অরিন্দম তার বাবার কবরের কাছে গেল। হাতজোড় করে বলল, \"বাবা, আমি সত্যিটা জেনেছি। আর সত্যিটা আজ আলোতে এসেছে।\"বাতাসে পাতাগুলো কাঁপছে। যেন কেউ হাসছে।পর্ব আট,,, শেষ ট্রেনের যাত্রীকয়েকদিন পর অরিন্দম আবার সেই ট্রেনে উঠল। সিটটা খালি। সেই লোকটি নেই। অরিন্দম জানালার দিকে তাকাল। ট্রেন চলছে। শহরের আলো পিছনে সরে যাচ্ছে।তার মনে হলো, এই ট্রেনটা আসলে একটা সেতু ছিল। যে সেতু দিয়ে এক অচেনা মানুষ এসে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটা নিয়ে এলো।সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, \"ধন্যবাদ, দাদা।\"কিছু সত্য অনেক দিন চাপা থাকে। কিন্তু একটা মানুষ যদি সাহস করে সেটা বলে দেয়, তাহলে সেই সত্য আর কখনো হারায় না। আর কিছু সাক্ষাৎ ঘটে শুধু সত্য বলার জন্য, একেবারে শেষ ট্রেনে।
প্রতিদিন রাতের শেষ ট্রেনে একজন অচেনা মানুষ একই সিটে বসে। কেউ তাকে চেনে না, কেউ তার নাম জানে না। অরিন্দম প্রথম দিন তাকে দেখে ভাবে সাধারণ যাত্রী। কিন্তু কয়েকদিন পর সে লক্ষ্য করে, লোকটি প্রতিদিন একই সময়ে, একই সিটে, একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। একদিন সাহস করে কথা বলতেই অরিন্দম জানতে পারে, লোকটি তার পরিবারের বহু বছরের পুরোনো এক রহস্যের সঙ্গে জড়িত। সেই রহস্য তার বাবার মৃত্যু, একটা হারিয়ে যাওয়া চিঠি, আর এক অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির গল্প। শেষ পর্যন্ত জানা যায়, লোকটির ট্রেনে ওঠার একটাই কারণ ছিল অরিন্দমকে একটি সত্য জানানো। যে সত্য অনেক বছর ধরে চাপা পড়ে ছিল।
সবাই আমার লিখা গল্প পড়ে বলবেন কেমন হয়েছে আর কি ধরনের গল্প আপনারা চান এটাও বলেন পরবর্তী গল্প পোস্ট করব।❤️