মানুষের জীবনে কিছু কিছু মানুষ আসে, যারা পরিচয় না দিয়েই স্মৃতির গভীরে স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে নেয়। আমার জীবনের তেমনই এক অদ্ভুত নাম— রহস্যময়ী।
ঘটনাটা আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগের।
সেদিন বাজার থেকে রিকশায় করে বাসায় ফিরেছি। গন্তব্যে পৌঁছে পকেটে হাত দিতেই বুকটা ধক করে উঠল। মানিব্যাগ নেই!
রিকশাওয়ালা ভাড়ার জন্য অপেক্ষা করছে। আশপাশে পরিচিত কেউ নেই। লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে গেল। কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না।
ঠিক তখনই একটি রিকশা এসে আমার পাশেই থামল।
রিকশা থেকে নামল এক তরুণী। সাদা শাড়ি, কাঁধে কালো ব্যাগ, মুখে কোনো প্রসাধন নেই। তবুও তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সন্ধ্যার আকাশ থেকে যেন কোনো তারা নেমে এসেছে।
সে সরাসরি রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করল,
— \"ভাড়া কত?\"
রিকশাওয়ালা ভাড়া বলতেই সে নিজের ব্যাগ থেকে টাকা বের করে দিয়ে দিল।
আমি কিছু বলার আগেই মেয়েটি আবার রিকশায় উঠে চলে গেল।
ধন্যবাদ পর্যন্ত দিতে পারলাম না।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তার মুখে কোনো হাসি ছিল না, কোনো প্রশ্ন ছিল না। যেন সে শুধু একটি কাজ সম্পন্ন করতেই এসেছিল।
সেদিনের পর অনেক দিন তাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি।
মাঝে মাঝে শহরের ভিড়ে হঠাৎ মনে হতো, কোথাও যেন তাকে দেখেছি। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতাম অন্য কেউ।
এর প্রায় এক মাস পরে আরেকটি ঘটনা ঘটল।
একদিন অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজ নিয়ে বাসে ফিরছিলাম। বাসের ভিড়ে কখন যে ফাইলটি হারিয়ে গেছে, টেরই পাইনি।
ফাইলের ভেতরে ছিল কয়েক মাসের হিসাব-নিকাশ।
আমি প্রায় পাগলের মতো হয়ে গেলাম।
পরদিন সকালে অফিসে গিয়ে দেখি আমার টেবিলের ওপর সেই হারানো ফাইল।
সব কাগজ অক্ষত।
ভেতরে একটি ছোট কাগজ।
তাতে লেখা—
\"যা হারিয়ে যায়, সবসময় তা হারিয়ে থাকে না।\"
নিচে আঁকা একটি ছোট নীল ফুল।
আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সেই নীল ফুল!
এর কিছুদিন পর মায়ের অসুস্থতা ধরা পড়ল।
হঠাৎ এক রাতে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হলো।
ডাক্তার বললেন, জরুরি রক্ত প্রয়োজন।
রাত তখন প্রায় দুইটা।
অনেক চেষ্টা করেও কাউকে পাওয়া গেল না।
হতাশ হয়ে হাসপাতালের করিডোরে বসে ছিলাম।
হঠাৎ একজন নার্স এসে বললেন,
— \"চিন্তা করবেন না। একজন মহিলা রক্ত দিয়ে গেছেন।\"
আমি বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলাম,
— \"কোথায় তিনি?\"
নার্স বললেন,
— \"চলে গেছেন।\"
দৌড়ে হাসপাতালের বাইরে এলাম।
দূরে একটি সিএনজি অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছিল।
জানালার পাশে বসা মেয়েটির মুখ এক ঝলক দেখলাম।
হৃদয় বলে উঠল— সে-ই।
এরপর থেকে যেন অদৃশ্যভাবে সে আমার জীবনের চারপাশে ঘুরতে লাগল।
কিন্তু কখনো সামনে এসে দাঁড়াত না।
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে কিছু ছিনতাইকারী আমাকে ঘিরে ধরল।
মোবাইল আর টাকা নিয়ে পালিয়ে গেল।
আমি আহত অবস্থায় রাস্তার পাশে বসে ছিলাম।
ঠিক তখন একটি প্রাইভেট কার এসে থামল।
ড্রাইভার নেমে এসে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
ভর্তি করিয়ে চলে যাওয়ার সময় একটি খাম দিয়ে গেল।
খামের ভেতরে হাসপাতালের বিলের টাকা।
আর একটি চিরকুট—
\"সব মানুষ খারাপ নয়। বিশ্বাস হারিও না।\"
নিচে সেই নীল ফুল।
ধীরে ধীরে আমার কৌতূহল আসক্তিতে পরিণত হলো।
আমি তাকে খুঁজতে শুরু করলাম।
শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরলাম।
হাসপাতাল, লাইব্রেরি, বাসস্ট্যান্ড— যেখানে যেখানে তাকে দেখার সম্ভাবনা আছে।
কিন্তু সে যেন সবসময় আমার এক ধাপ সামনে থাকে।
একদিন সন্ধ্যায় পুরোনো একটি লাইব্রেরিতে বই খুঁজছিলাম।
হঠাৎ তাকের ফাঁকে একটি বই দেখতে পেলাম।
বইয়ের ভেতরে একটি বুকমার্ক।
তাতে লেখা—
\"সব প্রশ্নের উত্তর জানা সুখের নয়। কিছু প্রশ্ন জীবন্ত থাকলেই সুন্দর।\"
নিচে সেই নীল ফুল।
আমি লাইব্রেরিয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম,
— \"এটা কে রেখে গেছে?\"
তিনি বললেন,
— \"একজন ভদ্রমহিলা। প্রায়ই আসতেন। কিন্তু অনেক দিন হলো আর আসেন না।\"
বছর ঘুরে গেল।
এদিকে আমার জীবনেও পরিবর্তন এলো।
চাকরিতে পদোন্নতি পেলাম।
নিজের একটি ছোট বাড়ি করলাম।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে কোনো না কোনোভাবে তার উপস্থিতির ছাপ থেকে যেত।
আমার বাবার মৃত্যুর পর যখন আমি একেবারে ভেঙে পড়েছিলাম, তখন ডাকবাক্সে একটি চিঠি পেলাম।
চিঠিতে লেখা—
\"মানুষ চলে যায়, কিন্তু ভালোবাসা চলে যায় না। শক্ত থাকুন।\"
প্রথমবার \"আপনি\" শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছিল।
মনে হলো, সে হয়তো আমাকে অনেক কাছ থেকে জানে।
এরপর এক বর্ষার দিনে আমি একটি বড় দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে গেলাম।
যে বাসে ওঠার কথা ছিল, শেষ মুহূর্তে একটি অচেনা ফোন আসে।
ফোনের ওপাশে একজন নারী।
শুধু বললেন,
— \"আজ ওই বাসে উঠবেন না।\"
তারপর লাইন কেটে গেল।
আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
কয়েক ঘণ্টা পরে খবর পেলাম, বাসটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।
সেদিন রাতে আমার ঘুম আসেনি।
প্রথমবার মনে হলো, সে শুধু রহস্যময় নয়, আমার জীবনের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে আছে।
এরপর বহু বছর কেটে গেল।
চুলে পাক ধরল।
মুখে বয়সের রেখা ফুটে উঠল।
তবুও রহস্যময়ীর পরিচয় আর জানা হলো না।
একদিন শীতের সকালে পুরোনো বইয়ের দোকানে একটি ডায়েরি পেলাম।
দোকানদার বললেন,
— \"একজন মহিলা রেখে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, একদিন কেউ এসে এটা খুঁজবে।\"
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা ছিল—
\"কিছু মানুষকে দূর থেকেই ভালো রাখতে হয়। কাছে গেলে গল্প শেষ হয়ে যায়।\"
আমার হাত কাঁপতে লাগল।
একের পর এক পৃষ্ঠা উল্টালাম।
সেখানে আমার জীবনের বিভিন্ন ঘটনার ইঙ্গিত ছিল, কিন্তু কোথাও তার নাম নেই।
শেষ পাতায় লেখা—
\"তোমার জীবনের গল্পে আমি একটি ছায়া মাত্র। ছায়ার কাজ পথ দেখানো, পাশে হাঁটা নয়।\"
আর তার নিচে—
\"আমাদের দেখা হয়েছিল, পরিচয় হয়নি; পরিচয় হলে হয়তো আর দেখা হতো না।\"
নিচে সেই পরিচিত নীল ফুল।
সেদিন ডায়েরি বুকে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে ছিলাম।
প্রথমবার উপলব্ধি করলাম, আমি তাকে খুঁজছিলাম ভুল কারণে।
আমি তার পরিচয় জানতে চাইছিলাম।
কিন্তু হয়তো তার পরিচয় নয়, তার অস্তিত্বই ছিল আসল বিস্ময়।
আজও কখনো রিকশায় বসে শহরের ভিড় দেখি।
কখনো কোনো সাদা শাড়ি পরা নারীকে দূরে হাঁটতে দেখলে বুকের ভেতর হালকা কাঁপন জাগে।
আমি আর তাকে খুঁজতে যাই না।
কারণ কিছু মানুষকে পাওয়া যায় না, তবু তারা হারিয়েও যায় না।
জীবনের গভীরতম স্মৃতিতে, নীরবতম অনুভূতিতে তারা চিরকাল বেঁচে থাকে।
আর আমার জীবনের সেই অমীমাংসিত, অপূর্ণ, অথচ সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়ের নাম—
রহস্যময়ী।
মানুষের জীবনে কিছু কিছু মানুষ আসে, যারা পরিচয় না দিয়েই স্মৃতির গভীরে স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে নেয়। আমার জীবনের তেমনই এক অদ্ভুত নাম— রহস্যময়ী।
ঘটনাটা আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগের।
সেদিন বাজার থেকে রিকশায় করে বাসায় ফিরেছি। গন্তব্যে পৌঁছে পকেটে হাত দিতেই বুকটা ধক করে উঠল। মানিব্যাগ নেই!
রিকশাওয়ালা ভাড়ার জন্য অপেক্ষা করছে। আশপাশে পরিচিত কেউ নেই। লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে গেল। কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না।
ঠিক তখনই একটি রিকশা এসে আমার পাশেই থামল।
রিকশা থেকে নামল এক তরুণী। সাদা শাড়ি, কাঁধে কালো ব্যাগ, মুখে কোনো প্র
0 Comments