ইমনের উন্মুক্ত হাঁটুর ছিলে যাওয়া অংশের রক্ত অনেকটা শুকিয়ে গেছে, অবশ্য তেমন রক্ত বের হয়নি তবে জায়গাটাতে জ্বালাপোড়া করছে।ইমনের আপাতত সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই।সে দ্রুত তার বাবার সাথে গ্রামের মেম্বারের বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটছে, হাঁটছে বললে ভুল হবে রীতিমত দৌড়াচ্ছে।মেম্বার সাহেব রাজপ্রাসাদের মতো বিশাল নতুন বাড়ি বানাচ্ছে। গ্রামে এরকম বাড়ি আর কারো নেই। এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষই হতদরিদ্র, দিন আনে দিন খায়। ইমনের বাবা মেম্বারের বাড়িতে রাজমিস্ত্রীর কাজ করে, এখন ইমনকেও তার বাবা কাজ করতে নিয়ে যায়। সেখানে সে ইট টানে, ছোটখাটো কাজ করে দেয়। এর বদলে অবশ্য প্রতিদিন ১০০ টাকা করে পায়, এই বা তাদের মতো হতদরিদ্র পরিবারের কাছে কম কিসে।সেন্টো গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট পরিহিত ইমন অবশ্য কাজ করতে চায় না।সে পড়ালেখা করে বড় ডাক্তার হতে আবার আগের মতো স্কুলে যেতে চায়। মেম্বারের বাড়িতে সে কাজ একটু ভুল করলে তাকে সবাই গালিগালাজ করে, অকারণে গায়ে হাত তোলে। তার এসব ভালো লাগে না।এই যে একটু আগে সে রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে গেলে তার বাবা তাকে না বাঁচিয়ে, তার পিঠে আরো কয়েকটা কিল বসিয়ে দিয়েছে, এসব ভাবতে ভাবতেই তার চোখে পানি চলে আসে।
রাতে ইমনের পরিবার যখন খেতে বসে, তখন ইমনের সামনেই ছোট ছোট ৩টা শিং মাছ ভাগ হয়ে গেল। ইমনের প্লেটে শিং মাছ আসেনি, ডাল এসেছে। ইমন চুপচাপ ডাল দিয়ে ভাত খাচ্ছে। ইমনের সৎমা ইমনের সৎবোনকে শিং মাছ দিয়ে ভাতের লোকমা মুখে তুলে দিয়ে, নিজেও তার ভাগের শিং মাছ দিয়ে ভাত খাচ্ছে। অনেকদিন পরে তাদের বাড়িতে ইমনের প্রিয় শিং মাছ রান্না হয়েছে,যদিও তা ইমনের ভাগ্যে নেই। ইমনের বাবা আয়েশ করে খেতে খেতে ইমনকে বলল- \"তাড়াতাড়ি ভাত খাইয়া ঘুমা, আজকে মেম্বার বাড়িত যাইতে দেরি হইছে বইল্লা মেম্বার আমারে ঝাড়ছে, কালকে সকাল সকাল যাইতে অইব...\" ইমনের চোখ ছলছল করে উঠল, তার গলা দিয়ে আর ভাত নামছে না, সে মিনমিন করে বলল- \"আব্বা আমি আর এই কাম করতাম না, আমি ও ইস্কুলে যামু...\" তখনি তার সৎমা গালি দিয়ে গর্জন করতে লাগল- \"হারামির বাচ্চা হারামি, গোলামের পুত, মায় লাং লইয়া ভাগছে আর পোলা এহানে হাউশ করে ইস্কুলে পড়ব। অই পোলা অই, তোর বাপে সারাদিন কাম কইরা মরব আর তুই সাহেব সাইজ্যা ইস্কুলে যাবি, তোর খাওন কি আসমান থেইকা পড়ব।\" তার সৎমা গুনগুনিয়ে তাকে আরেকটা গালি দেয়। ইমনের মাকে নিয়ে কথা বলায় ইমনের খারাপ লাগে, সে এবার কিছুটা জোরেই বলল - \"আমার ভালো লাগে না, কাম করতে\", তখনি তার সৎমা তার উপরে ঝাপিয়ে পড়ে এলোপাথারি মারতে থাকে। তবু ইমন চিৎকার করে না, কাদে না। সে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আগে পাশের বাড়ির ওরা ইমনকে বাচাত, এখন তারাও আর বাচাতে আসে না। ইমনের বাবা তার সৎমার থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গালাগালি করতে করতে আরো মারতে লাগল। ইমন ফাক পেয়ে তার দুর্বল শরীর নিয়ে দৌড়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। দৌড়াতে দৌড়াতে সে গ্রামের আধা-পাকা রাস্তায় এসে ওঠে হাপাতে লাগল, তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে কিছুদিন আগের স্মৃতি মনে করল।যখন তার মা ছিল, ইমন তখন কতই না আদুরে ছিল।তার মা, বাবা সবাই তাকে আদর করত। তার মা তাকে পড়ালেখা করে বড় ডাক্তার হতে বলত। কিন্তু একদিন যখন তার বাবা বাড়িতে ছিল না তখন ইমনের মা ব্যাগ গুছিয়ে কোথায় যে চলে গেছে। যাওয়ার আগে সে ইমনকে মন দিয়ে পড়ালেখা করে ডাক্তার হতে বলেছিল। ইমন তার মার সাথে যেতে অনেক কান্না করে কিন্তু তার মা তাকে ফাকি দিয়ে চলে যায়। ইমনের বাবা বাড়ি এসে সব জানতে পেরে চুপ হয়ে বসে থাকে। পাড়া-প্রতিবেশী গুঞ্জন তুলে ইমনের মা প্রেমিকের সাথে পালিয়ে গেছে। এখন ইমন বুঝতে পারে গুঞ্জনটা সত্যি ছিল কিন্তু তার মন এখনো মানতে চায় না।সে অপেক্ষায় থাকে তার মায়ের।তার মা আসবে তাকে আদর করবে। তার কিছুদিন পর তার বাবা আবার বিয়ে করে। আর সেই থেকে ইমনের উপর নিয়মিত অত্যাচার চলত। ইমন তার গ্রামের পাশের বড় জঙ্গলার ধারে একটা পাথরে বসে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদতে থাকে। এখানে তেমন মানুষ আসে না।অনেকে বলে এখানে জ্বীন - ভূত আছে। ইমন উঠে চোখ মুছে ধীরে ধীরে জঙ্গলার গভীরে যায়। কিছুদুর যেতেই সে কয়েকজন যুবক ছেলেকে দেখে, মেম্বারের ছেলেও সেখানে আছে। সে ধীরে ধীরে তাদের কাছের একটা গাছের পেছনে লুকিয়ে তাদেরকে দেখতে থাকে। এই অন্ধকারে কেউই ছোট ইমনকে দেখতে পায় না।সে দেখে কিছু ছেলে প্যাকেট থেকে সাদা পাউডার বের করে নাক দিয়ে টেনে নিচ্ছে, আর কেউবা সিগারেট টানছে। যদিও এই সিগারেটের গন্ধ অন্যরকম। সিগারেটের গন্ধে ইমনের বমি আসছে। সে দ্রুত যেখান থেকে চলে যেতে চাইলে শব্দ হয়ে যায়। ছেলেগুলো টের পেয়ে তাকে ধরে এনে তাদের কাছে বসায়। সে দৌড়ে পালিয়ে যেতে চাইলেও বিশেষ সুবিধা করতে পারল না। ছেলেগুলো তাকে নিঃশব্দে হাসছে।তাদের মধ্য থেকে কেউ একজন বলল- \"তুই রাজমিস্ত্রী আকবইরার পোলা না?\" ইমন ইতিবাচক উত্তর দিতেই তার বিচ্ছিরিভাবে হাসতে শুরু করল। হাসতে হাসতে একজন বলল - \"তুই কি জানস তোর মা কই?\" ইমন না বলে, মেম্বারের বখাটে ছেলে তাদের ওখান থেকে কিছুটা দূরে ইশারা করে বলে - \"ঐ যে অইহানে তোর মারে আড়াইবছর আগে মাটির নিছে পুতছি, তোর বাপে তোর মারে আমগোর কাছে বেচছিল। তোর মারে পিরিতির জালে ফাসাইয়া এদিকে আনছি...\" ইমনের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে আর অজান্তেই ওর আশেপাশের বখাটে ছেলেগুলো আরো বিচ্ছিরিভাবে হাসছে।
দুইদিন পর ভোরে রাজমিস্ত্রী আকবরের বাড়িতে খবর গেল তার ছেলের মৃতদেহ জঙ্গলার পাশের পুকুরে ভাসছে। আকবর কিছুটা চমকাল, তারপর কাফনের কাপড় কেনার টাকার হিসাব করতে লাগল। তার পাশেই তার দ্বিতীয় স্ত্রী হাফ ছেড়ে বাচল, এতদিনে তার সমস্যাটা দূর হলো...
কেউ জানবে না ইমন আর তার মায়ের পরিনতি, কেউ অবশ্য জানতে চাইবে ও না।
.