সব ই-বুক দেখুন
তৃতীয় লিঙ্গের ঈশ্বর
General

তৃতীয় লিঙ্গের ঈশ্বর

পার্থসারথি
120 পৃষ্ঠা 12 বার পড়া হয়েছে
৳ 45.00 ৳ 60.00 25% OFF

সকল ট্যাক্স অন্তর্ভুক্ত

কেনার পরে তাৎক্ষণিক ডাউনলোড লাইব্রেরিতে আজীবন অ্যাক্সেস
সর্বমোট বারোটি গল্প নিয়ে ˝তৃতীয় লিঙ্গের ঈশ্বর˝- গল্পগ্রন্থটি সমৃদ্ধ। প্রত্যেকটি গল্প ভিন্ন প্রেক্ষাপট ও ভিন্ন স্বাদে পূর্ণ। ˝তৃতীয় লিঙ্গের ঈশ্বর˝- শিরোনামের গল্পটি মূলতঃ মনুষ্য সমাজে অবহেলিত তৃতীয় লিঙ্গের এক নবজাতককে নতুনভাবে সমাজে টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম। মা-বাবার ভালোবাসায় তৃতীয় লিঙ্গের সন্তানটি সমাজের ভেতরেই কীভাবে স্বাভাবিক অন্য দশটা মানবশিশুর মতোই অংকুরিত হলো তার উপাখ্যান এই গল্পটি। তৃতীয় লিঙ্গের সন্তান মানেই উচ্ছিষ্ট এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার প্রাণান্তকর লড়াই এক মায়ের। ভালোবাসা কী, কেমন তার প্রতিচ্ছবি, কেমনতর ভালোবাসার বেদনা বা অনুভব অথবা ভালোবাসায় হেঁটে চলা মানুষজনের প্রতিচ্ছবি হলো; তোমার জন্যে প্রিয়তমা, ভালোবাসা, ভালোবাসার উল্টোটান। প্রতিটি গল্পই ভালোবাসাকে ঘিরে কিন্তু গল্পের স্বাদ ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আছে বর্তমান সময়ের বিশ্বকে উল্টে দেওয়া করোনা তাণ্ডবের চিত্র; চিৎকার এবং টানাপোড়েন গল্প দুটি পড়লেই কিছুটা হলেও ছোঁয়া পাওয়া যাবে করোনাকালীন বাস্তব প্রেক্ষাপট। যা সত্যিই হৃদয়গ্রাহী। ˝অনাদি কন্যার গল্প˝ ও ˝খসড়া জীবন˝- গল্প দুটিতে রয়েছে মানুষের ভেতরকার কুৎসিৎ দিকের চিত্র। মেয়েরা কীভাবে শিকার হচ্ছে মনুষ্য সমাজের তথাকথিত ভদ্রসমাজের পুরুষ মানুষের লালসার শিকার। আবার এই আধুনিক সমাজেও মানুষ ধর্মের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে কেমন উচ্ছিষ্ট জীবনযাপন করে তারই বহিঃপ্রকাশ চোরাস্রোত ও অতল গহীনের সৈনিক গল্পদ্বয়। বন্ধু মনোভাব সম্পন্ন দুটি শিশুর একে অপরের প্রভু হয়ে ওঠার গল্পই হলো প্রভু-ভৃত্য। মোট কথা, এই গল্পগ্রন্থটি ছুঁয়েছে ভালোবাসা, ঘৃণা, অবহেলিত মানুষের প্রতিচ্ছবি এবং অচলায়তন ভেঙে বেরিয়ে আসার এক মহান যুদ্ধ। ধন্যবাদান্তে- লেখক

বিস্তারিত বিবরণ

মহামায়া দেবী জননীর বেশে আবির্ভূত হয়েই বউমাকে কোলে টেনে নিলেন পরমযত্নে। তীব্র ব্যথায় কাতর অনুরাধা প্রতি সেকেণ্ডে ব্যথার মাত্রাকে অতিক্রম করে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন শ্বাশুড়ীমার দিকে। বউমার এমন অবস্থা দেখে মহামায়া দেবী কিছুটা হতবিহ্বল। দীর্ঘদিন ছেলের সাথে ঢাকা শহরে থাকেন ঠিকই কিন্তু কোনকিছুই জানা নেই। তাছাড়া এই গভীর রাতে কার কাছে যাবেন, কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন; একটা থমকে যাওয়া সময়ে ঘূর্ণায়মান মহামায়া দেবীর মুহূর্ত। নিজেকে সামলে নিয়ে বউমাকে সান্ত্বনা দেন- মা অনুরাধা, খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝি?- এই বলে মাথায় পরমস্নেহের হাতে বিনুনি কাটেন।

অনুরাধা তীব্র ব্যথায় ক্রমশঃ কুঁকড়ে যাচ্ছেন। কোন কথাই এখন আর উচ্চারণ করতে পারছেন না। এমন কী কষ্টের পরিসীমাটাও ব্যক্ত করতে পারছেন না। শুধু দাঁতে ঠোঁট কামড়ে মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দিলেন।

ঝড়বৃষ্টির তীব্রতা মনে হয় প্রসব ব্যথার তীব্রতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। যতই বাড়ুক, মনকে ইস্পাত সমান শক্ত করে মহামায়া দেবী নিজেকে মুহূর্তেই অভিজ্ঞতার আলোকে স্থির ও ধৈর্যশীল করে নেন। প্রসবের খুঁটিনাটি তো সবই জানা আছে। থাকবে না কেন? এগারোটি সন্তানের মা হয়েছেন। কখনও হাসপাতালে যেতে হয়নি। এলাকায় দাইমার হাতেই সব সন্তানের পৃথিবীর আলো দেখা। দাইমার প্রতিটি কথাই মগজের ভেতর গেঁথে আছে; কখন কী করতে হবে। মহামায়া দেবী  সাহসে বলীয়ান হয়ে বলেন- কোন চিন্তা করো না মা। আমি আছি। অগত্যা আমিই হাত চালাবো।

এই সাহসী উচ্চারণ মনে হয় অনুরাধাকে স্পর্শ করেছে। যার প্রকাশ চোখের তারায় তারায় প্রস্ফুটিত হলো। কিছুটা খুশীর  ঝলক যেন দু'গাল বেয়ে সারা অঙ্গে ছড়িয়ে পড়লো।

দুই সাহসী নারীর বলয়ে সময় লুটোপুটি খাচ্ছে। অনুরাধা ভীষণ রকমের টের পাচ্ছেন অনাগতসন্তানের হামাগুড়ি। নাড়ির ভাঁজে ভাঁজে সন্তানের স্পর্শে ব্যথার তীব্রতা যেন সাত আসমান পেরিয়ে দূর কোথাও জানান দিচ্ছে। এই অনুভূতিটুকু অদ্ভুত রকমের মিশেল; দুঃখ-কষ্ট, জ্বালা-যন্ত্রণা, সুখ-শান্তি, স্নিগ্ধতা সবকিছুর সংমিশ্রণের অমৃতধারার ফসল। অনুভূতিটুকু সারা অঙ্গে প্রতিটি মুহূর্তে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। আর এই স্পর্শের অনুভবে আলোড়িত হচ্ছেন মহামায়া দেবী। একবার বউমার কপালে হাত রাখছেন, পায়ের পাতা দেখছেন, হাতের তাপমাত্রা দেখছেন, চোখের ভাষা পরখ করছেন আবার তাকিয়ে দেখছেন প্রসব ব্যথার স্থান। পরিস্থিতি অবলোকন করে মহামায়া দেবী মুখমণ্ডলে হাসির প্রলেপ ছড়িয়ে বলেন- বউমা চিন্তা করো না। মনে হয় ভগবান সহায় হয়েছেন। আর একটু সহ্য করো মা!

সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথে দুই জননীর মুখমণ্ডলে উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়লো।পৃথিবীর আলোয় এসেই সদ্যভূমিষ্ঠ মনুষ্য সন্তান ঠা ঠা শব্দে চারদিক প্রকম্পিত করে তুলল। আর এই কান্নার খুশীর বন্যায় ভেসে চলল মা অনুরাধা আর ঠাকুরমা মহামায়া দেবী। কে বলবে এই অনুরাধা কষ্টের লক্ষ সিঁড়ি বেয়ে রণক্লান্ত। সন্তানের মুখটা দেখেই স্বর্গীয় হাসিতে সব কষ্ট এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন।

মহামায়া দেবী হঠাৎ করেই চুপসে গেলেন। মুহূর্তেই সকল হাসির আর আনন্দের আঙিনায় এসে ভর করলো একরাশ দুঃখ আর কষ্ট। এতক্ষণ সন্তান প্রসবের আনুষঙ্গিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন আর আনন্দের আতিশয্যে ডুবে ছিলেন অন্য-এক ভুবনে।

পরম আনন্দে আর তৃপ্তিতে অনুরাধা চোখ বন্ধ করেই উপভোগ করছিলেন আগত সন্তানের সুখ। শ্বাশুড়ীর নীরবতায় চোখ মেলে তাকালেন। মলিন মুখে দৃষ্টি পড়তেই অজানা আশংকায় ডুবে গিয়ে বললেন- মা, মন খারাপ করে চুপচাপ বসে আছেন কেন!

মহামায়া দেবীর দৃষ্টযুগল ছলছল। সদ্যভূমিষ্ঠ নাতি অথবা নাতনি অথবা অন্যকিছু দু'হাতের কোলে পরম শান্তিতে শুয়ে আছে। কিন্তু এখন যত কষ্টের লুটোপুটি মহামায়া দেবীর দৃষ্টিযুগলে। তিনি নির্বাক বসে আছেন। কোন কথাই বলতে পারছেন না।

দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে অনুরাধা আবার জিজ্ঞাসা করেন- মা, আপনি কোন কথা বলছেন না কেন?

চুপচাপ। নীরবতার মহাসমুদ্র মহামায়া দেবীর দৃষ্টিসীমায়। ফ্যালফ্যাল চোখে শুধু তাকিয়ে আছেন সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর দিকে। 

কয়েকবার ডাকাডাকির পরও কোন সাড়া না পেয়ে অনুরাধা নিজেকে টেনে হেঁচড়ে বসালেন। শ্বাশুড়ী মায়ের দৃষ্টিতে হেঁটে হেঁটে সন্তানের দিকে তাকালেন।

হঠাৎ বিদ্যুৎ চমক সঙ্গে মেঘের গর্জনে নির্বাক থেমে আছে দুই নারীর দুঃখভরা মনের দৃষ্টি যুগল। আর ভয় পেয়ে পৃথিবীর নবাগত যাত্রী আবারও ঠা ঠা শব্দে কেঁদেই চলছে।...

 

ট্যাগ